চ্যালেঞ্জের মুখে রাজস্ব শৃঙ্খলা

  সাজ্জাদ আলম খান ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

নির্বাচনের বছরে রাজস্ব আহরণ কমেছে। চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে নভেম্বর, এ পাঁচ মাসে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এর আগের অর্থবছরে যা ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পাঁচ মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭৮ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা।

এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল এক লাখ এক হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।

বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতিকে ‘জঙ্গল পদ্ধতি’ বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার মতে, কোথায় কর ছাড় দেয়া হচ্ছে; সেটা সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশেও করের একক হার হওয়া উচিত।

একেক বছর একেক ধরনের হার হওয়ায় এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ এ হারের ওপর বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। আদায়ে কঠোর হলেই বেশি কর আদায় সম্ভব নয়। চলতি অর্থবছরে ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

ভোট টানতে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক খাতে বড় ছাড় দিতে হয়েছে। শুধু বাজেট পরবর্তী ছাড়ের কারণেই ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ কমে যেতে পারে। নির্বাচনকালীন অর্থবছর বিবেচনায় নতুন করে কোনো খাতে শুল্ক, কর ও মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়নি। আয়ের খাত না বাড়ালেও রাজস্ব আহরণে প্রায় ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়।

তিন মাসে তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেক্ট্রনিকস ও ওষুধ শিল্প, ট্রাভেল এজেন্টস, সিম ট্যাক্স, ইন্টারনেট সেবা এবং এলএনজি ও এলপিজিসহ অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হয়েছে। এতে বড় অংকের রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ খুব একটা সুফল পাবে না। শুধু এলএনজি ও এলপিজিতে ছাড় দেয়ার কারণে ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কমে যাবে।

ইন্টারনেট সেবায় ভ্যাট অব্যাহতির কারণে কমবে ১ হাজার কোটি টাকা। পোশাক শিল্পে ছাড় দেয়ায় কমবে ১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ। রাজস্ব আহরণের গতি খুবই হতাশাজনক। রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধির ধারাকে পরিকল্পনায় নিয়েই বাজেট তৈরি করা হয়। এনবিআরের উচিত ছাড়ের পরিবর্তে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর গতি ত্বরান্বিত করা। এটি না হলে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।

প্রায় এক যুগ পর মিলছে বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা, যার পরিমাণ ৭৫ কোটি ডলার; বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় হাজার ২২৫ কোটি টাকা। তিন ধাপে মিলবে এ ঋণ। প্রথম ধাপে দেয়া হবে ২৫ কোটি বা দুই হাজার ৭৫ কোটি টাকা; পরের দুই ধাপে দেয়া হবে ৫০ কোটি ডলার। এ ঋণ সরকার স্বাধীনভাবে অগ্রাধিকার খাতে খরচ করতে পারবে এবং এতে কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না বিশ্বব্যাংকের। তবে এ টাকা পেতে বেশকিছু শর্ত পূরণ করতে হবে সরকারকে।

এর আগে ২০০৬-৭ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা বাবদ ৩০ কোটি ডলার পেয়েছিল বাংলাদেশ। এজন্য অবশ্য শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু, কর্মক্ষেত্রে নারীর কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, শ্রম আইন ও কাস্টমস আইন সংশোধন, জলবায়ু তহবিলে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা ও ন্যাশনাল স্কিলড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট চালু করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের এ ঋণের সুদের হার হবে ২ শতাংশ। পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩০ বছরে বাংলাদেশ এ ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। সরকার বলছে, দেশে এখন ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। এরা কর্মক্ষম। কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতে খরচ হবে বিশ্বব্যাংকের এ ঋণ।

এদিকে উৎসে করে নির্ভরতা বাড়ছে সরকারের। যদিও আয় হবে কিনা, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তাতে কী, উৎসে কর কেটে রাখা হবে। প্রত্যক্ষ কর বলা হলেও চরিত্রগত অবস্থা বিবেচনায় এটা পরোক্ষ কর। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ব্যবস্থায় উৎসে কর পরিশোধ করে থাকে, তা তার সেবা বা পণ্যমূল্যে যোগ করে দেয়; যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতা-ভোক্তাকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। রাজস্ব বোর্ড আবারও এ ধরনের উৎসে কর আদায়ে বেশ উৎসাহী। ফলে বাড়ছে ব্যাপ্তি ও পরিমাণ।

প্রায় দেড়শ’ বছর আগে করবর্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে; এক অর্থবছর শেষ হলে পরের অর্থবছরে কর আদায় করা হবে। প্রত্যক্ষ আয়কর ব্যবস্থাপনায় এটা মেনে নেয়া হয়। কিন্তু উৎসে করের বিধানে আছে জটিলতা। এখানে বছরের হিসাব তো দূরের কথা, তাৎক্ষণিকভাবে কর কেটে নেয়া হয়। এ ধরনের খাতের সংখ্যাও বেশ। আয়কর খাতে আসা রাজস্বের ৬৭ শতাংশই এসেছে উৎসে কর থেকে।

সাধারণত বছর শেষে কর দেয়ার রীতি থাকলেও বাস্তবে সারা বছরই তা কেটে নেয়া হয়। করদাতাদের আয় থেকে প্রতি মাসে ও বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে এ কর কর্তন করে এনবিআর। পরে বছর শেষে এটি সমন্বয় করা হয়। ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট খাতে উৎসে কর কর্তন ও সংগ্রহ করার বিধান রয়েছে। এ কর আদায়ে করদাতাদের পাশাপাশি কর কর্তৃপক্ষকে সচেষ্ট হতে হয়।

বিশেষ করে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল প্রদানের সময় এবং অন্য সেবা প্রদানের সময়ই কর কেটে রাখে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি উৎসে কর প্রদান না করে, তবে তাকে আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

রাজস্ব কর্মকর্তা এ কর আহরণে ব্যর্থ হন, তবে তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে তার কাছ থেকে সুদসহ কর আদায় করা হবে। বর্তমানে ৫৬টি খাত থেকে উৎসে কর আদায় করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয়কর থেকে এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতের উৎস থেকে কেটে নেয়া কর বাবদই এসেছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব প্রদানের পরিবেশ সহজ করার দাবি অনেক দিনের। কর প্রদানে সচেতনতা বৃদ্ধির তোড়জোড় চলছে। আয়কর মূলত সামাজিক সমতার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে থাকে। তবে পরোক্ষ কর আদায়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রবণতা রয়েছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬১, যা ২০০৮ সালে ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯। গড়ে প্রতিবছর কোটিপতি বেড়েছে ১০ হাজারের বেশি। অনেকের ধারণা, কর ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত ত্রুটিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

আন্তরিক রাজস্ব কর্মকর্তার সহযোগিতা ছাড়া বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্বৃত্ত থাকতে পারে না। এক দশকে জিডিপির আকার বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। অনেকে সম্পদশালী হয়েছেন। মাথাপিছু আয় বাড়ানোর মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। দারিদ্র্য হ্রাসের কথা বলা হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দারিদ্র্য হ্রাস হচ্ছে আর দেশও মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। তবে কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া ভঙ্গুর অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না।

পরিবেশ দূষণ রোধে রাজস্ব নীতি খুব একটা সহায়ক নয়। প্রণোদনা, কর কাঠামো, ভর্তুকি কিংবা সরকারি ব্যয়ে পরিবেশ ভাবনা দুর্বল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবেশকে একেবারেই চিন্তার মধ্যে রাখা হয়নি। পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সেবা ও পণ্যে অতিরিক্ত করারোপ করা হচ্ছে।

পরিবেশ বিপর্যয়ের সূচকে বাংলাদেশ উচ্চ ঝুঁকির দেশ। জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচু সারির। তারপরও দূষণরোধে সরকারের রাজস্ব নীতি সহায়ক নয়। দূষণের জন্য ৮০ শতাংশ দায়ী বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি খাত। কোনো পরিণাম চিন্তা ছাড়াই এ দুই খাতে ব্যাপক হারে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। ভর্তুকির তেল প্রাকৃতিক পরিবেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।

পরিবেশ রক্ষায় এনভায়রনমেন্ট ফিসক্যাল রিফর্ম প্রয়োজন। এর আওতায় পরিবেশ সহায়ক কর কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। সব ধরনের জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ হওয়া উচিত। যেসব প্রাকৃতিক সম্পদের অতি ব্যবহারের কারণে পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে, সেসব পণ্য ও সেবায় উল্লেখযোগ্য হারে করারোপ প্রয়োজন।

জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি ভালো- এমন দেশে পরিবেশ দূষণ বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশ এখন সেই কাতারে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহনে দূষণের পরিমাণ বেশি। বিভিন্ন ধরনের রাজস্ব উদ্যোগ নিয়ে এগুলো কমাতে হবে। শুধু অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হলেই হবে না। এর সঙ্গে শিল্পায়নও পরিবেশবান্ধব হতে হবে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশকেও সেই পথে যেতে হবে।

সাজ্জাদ আলম খান : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×