নতুন বছরের নতুন অর্থনীতি

  মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন বছরের নতুন অর্থনীতি
ফাইল ছবি

বেশি ভোক্তা ঋণ বেশি ব্যয় উৎসাহিত করে। বেশি ব্যয় বেশি বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবসা গঠন উৎসাহিত করে। শিল্প সক্ষমতা বাড়ে; যা উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায় এবং আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ায়। কিন্তু ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এ ধারা পরিবর্তন হয়ে গেছে।

সুদের হার কমানোর ঘোষণা এসেছে ব্যাংক মালিকদের থেকে, কিন্তু তা বাস্তবায়নযোগ্য পাওয়া যায়নি। সহজ অর্থের দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। এতে অর্থনীতির চাহিদা ও সরবরাহ নিচের দিকে নেমে যেতে পারে।

সুদের হার বাড়ায় ভোক্তারা এখন আর বেশি ঋণ নিতে পারবে না। এতে কম মুনাফার ব্যবসাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে সহজ মানির দিন শেষ মানে প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখিতার কবলে পড়া। কম ভোক্তা ঋণ মানে কম ব্যয় এবং কম ব্যয় একের পর এক ব্যবসায়িক ব্যর্থতা তৈরি করতে পারে।

এমন ঘটনাই ঘটেছিল ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমেরিকায়। সেখানে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক ব্যর্থতা প্রতি প্রান্তিকে ছয় হাজারে উন্নীত হয় এবং ব্যাংক ব্যর্থতা ১৫৭-তে পৌঁছে। এ বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে তো বটেই বাংলাদেশে সেই সংকট তৈরির আগাম বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নতুন বছরে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। দেশের অর্থনীতির স্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে নতুন বছর শুরু হচ্ছে। রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে, প্রবাসী আয় বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ খুবই ভালো অবস্থায়। বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় স্বস্তি পেতে পারে ব্যবসায়ীরা।

নতুন বছর ও নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে বেশি। প্রত্যাশাগুলো অবশ্য বেশিরভাগই পুরনো ব্যবসা সহজ করা, ব্যবসার খরচ কমানো, করব্যবস্থা সহজ করা, অবকাঠামো উন্নতি, জ্বালানির ব্যবস্থা করা, সুদের হার সহনীয় রাখা। এর সঙ্গে নতুন একটি প্রত্যাশা যোগ হয়েছে আওয়ামী লীগের ইশতেহার থেকে।

ব্যবসায়ীরা চান, নতুন বছরে নতুন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান শুরু করুক। ব্যবসা সহজ করা, সময়ের কাজ সময় অনুযায়ী শেষ না করলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, হয়রানিমুক্ত করব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগে উৎসাহ, বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এফবিসিসিআই থেকে বলা হয়েছে, নতুন সরকার অনেক উন্নয়ন কাজ হাতে নেবে। এ জন্য প্রচুর পয়সার প্রয়োজন হবে। ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানিমুক্ত পরিবেশে কর দিতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারের চলতি মেয়াদে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের কাছাকাছিতে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে। এফবিসিসিআই-এর মতে কর্মসংস্থানের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

গ্যাস-বিদ্যুতের দামের ক্ষেত্রেও মধ্যমেয়াদি একটি প্রক্ষেপণ থাকা দরকার। যদি জ্বালানির দামের একটি প্রক্ষেপণ থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সহজ হয়। ব্যবসায়ীদের জন্য এক দরজায় সেবা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালু করা দরকার। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ওএসএস চালুর ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে গেছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান চান ওএসএস দ্রুত চালু হোক। পাশাপাশি সেটির সুফল নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হতে পারে।

বড় ব্যবসায়ীরা নানাভাবে অর্থের জোগান নিশ্চিত করলেও বিপাকে থাকেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে তারা সহজে ঋণ পান। ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবিটি আবারও তুলে ধরেন তিনি।

চলতি অর্থবছরে প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। নতুন বছরে রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে জাতীয় রাজস্ব কৌশল চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে।

এ কৌশলের মধ্যে পুরনো যেসব পদক্ষেপে সুফল পাওয়া গেছে, তা চলমান রাখা হয়েছে। যেসব কৌশলে রাজস্ব আদায়ে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায়নি তা সংশোধন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর বলে প্রমাণিত পদক্ষেপ বাদ দেয়া হয়েছে। এসবের সঙ্গে নতুন পদক্ষেপ যোগ হয়েছে। এগুলো যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে নতুন বছরের আর্থিক খাতের সুস্থতা। তেমনি প্রয়োজন হবে আর্থিক খাত তথা ব্যাংকিং খাতের দিকে ন্যায্য নজর।

প্রসঙ্গত, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৮৪ হাজার কোটি টাকা, স্থানীয় পর্যায়ে মূসক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর এক লাখ দুই হাজার ২০১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ এক হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।

এ সময় পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৭৯ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময় পর্যন্ত আদায় হয় ৭৪ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ৭.১৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আদায় হয় ২৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। স্থানীয় পর্যায়ে মূসক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। আদায় হয় ৩১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। আয়কর ও ভ্রমণ কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয় ২১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এনবিআরের সাময়িক হিসাবে ঘাটতি ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

নতুন বছরের শুরুতেই অন্তত দুটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হয়। হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ বেকারত্ব মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। দেশে যত কর্মের সুযোগই তৈরি হোক না কেন, সেসব পদের চাহিদা পূরণের মতো দক্ষতা ও যোগ্যতা এ শিক্ষিত তরুণদের নেই। আর সে কারণেই বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উচ্চবেতন দিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে হচ্ছে।

অতএব, শিক্ষার সঠিক মান রক্ষার স্বার্থে তো বটেই, অহেতুক বদনামের হাত থেকে বাঁচার জন্য হলেও উচিত হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহীন শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা। এ কাজটি এখনই শুরু হওয়ার দাবি রাখে।

নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি গ্রামকে শহরের মতো করে তোলার প্রত্যয় রয়েছে, যা একুশ শতকের বাস্তব চাহিদা, শহরমুখী অভিগমন প্রবণতার অন্যতম প্রতিরোধক এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। গ্রামকে শহর বানানোর ক্ষেত্রে গ্রামের প্রকৃতি ও নিসর্গকে অক্ষুণ্ণ রেখে সেখানে আধুনিক জীবনযাপনের সব বস্তুগত উপকরণ সন্নিবেশের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অতি উৎসাহী অন্য স্বার্থান্বেষী মহল গ্রামকে শহর বানানোর কথা বলে পুরো গ্রামকেই উজাড় করে দেয়ার প্রয়াসে যেন পরিণত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখার দরকার হবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০১৮ সালে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ। এতে বিশ্বায়ন ভেঙে পড়ার উদ্বেগ তৈরি হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি অনেকগুলো সুরক্ষিত জাতীয় বাজারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু আশা করা যায়, বিবদমান দুই পক্ষ নতুন বছরে আবারও আলোচনার টেবিলে বসবে এবং সমস্যার সমাধান হবে; যেভাবে কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো নাফটা সমস্যার সমাধান করেছে।

ফলে ২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে বিপুল ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, যা উদীয়মান বাজারের ব্যাংক খাতেও বড় ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে। উচ্চ জীবনমান রক্ষা করতে গিয়ে বিদেশি পুঁজিতে নির্ভরতার পথ ধরে ব্যাংক খাতে এ ব্যর্থতা আসবে। এর বড় কারণ সুদের হার বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ইজি মানি নীতির পরিবর্তন।

সহজ মুদ্রানীতি গত কয়েক বছরে বিশ্বে সুনামি হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহ বাড়িয়ে এটিকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। চাহিদার দিক থেকে এ মুদ্রানীতির ফলে ভোক্তারা বেশি ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জিডিপি অনুপাতে চীনের ঋণ ২০০৮ সালের ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে হয় ৫০ শতাংশ। এর পাশাপাশি চীনের করপোরেট খাতে যে ঋণ কত বড় তা অজানাই রয়ে গেছে।

সরবরাহের দিক বিবেচনায়, এটি করপোরেশন ও উদ্যোক্তাদের কম মুনাফার ব্যবসায় উৎসাহিত করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সেইন্ট লুইসের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সক্ষমতার মোট ব্যবহার ২০০৯ সালের ৬৭ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে বেড়ে হয়েছে ৮০ শতাংশ। মূলত সহজ মুদ্রানীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির আবর্তে নিয়ে গেছে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×