বড় জয় বড় দায়

  কাজী শওকত হোসেন ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বড় জয় বড় দায়
একাদশ জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: যুগান্তর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলেও কিছু জায়গায় সহিংসতার কারণে ১৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বেশকিছু মানুষ আহত হয়েছেন, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

এ উপমহাদেশে ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই নির্বাচনী সহিংসতায় কমবেশি প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটে। এই অনাকাক্সিক্ষত দুঃখজনক ঘটনা না ঘটলে নির্বাচনে প্রকৃত অর্থেই উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকত।

যেসব পরিবারের সদস্য আহত বা নিহত হয়েছেন, সেসব পরিবার কী কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। যারা আহত বা নিহত হয়েছেন, এ শোকের বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং কর্মী-সমর্থকরা উল্লিখিত ঘটনা কতদিন মনে রাখবেন অথবা পরিবারগুলোর ক্ষতি পূরণে কতটা ভূমিকা রাখবেন- সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

যাদের সমর্থন করার কারণে কর্মী-সমর্থকদের এ পরিণতি হল- আশা করি তারা তাদের প্রতিশ্র“তি ভুলে যাবেন না।

এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা কারণে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। এটা ছিল তাদের বড় ভুল। সেই উপলব্ধি থেকে তারা এবার আর আগের মতো ভুল করেননি। নির্বাচন থেকে বিরত থাকলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যেত, পরপর দুই বার সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে। তারা নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেয়ার নানাবিধ চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি।

তাদের আন্দোলনের হুমকিও কোনো কাজে আসেনি। ২০১৪ সালে আন্দোলন করে নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করে বিএনপি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করতে পারলে সরকার সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করত। তাদের লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন ঘটানো, না হলে অন্তত সরকারের নৈতিক পরাজয় ঘটানো। বিএনপি সেই আন্দোলনে জয়ী হতে পারলে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সফল হতো অনায়াসে।

বিএনপিকে সমর্থনকারী কিছু এনজিওর কর্মকর্তা, সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ নানাভাবে সরকারের সমালোচনা করেছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাদের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের সব উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে খুবই শক্ত অবস্থান নেয়ার ফলে তাদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেশের উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে পেরেছে।

খালেদা জিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার বেশ আগে থেকেই সহায়ক সরকারের ধুয়া তুলে আন্দোলন সংঘটিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এ দলটির আসা না আসার বিষয়ে দলের ভেতরও ভিন্ন মত ছিল।

এরই মধ্যে ড. কামাল- এক সময়ের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা যিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর øেহধন্য ছিলেন, ’৭২-এর সংবিধান রচয়িতা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রখ্যাত আইনজীবী হিসেবে দেশে-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন, ’৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনের ফল নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে দল থেকে বেরিয়ে যান।

তিনি গণফোরাম গঠন করেন। প্রথমে বেশ কয়েকজন চেনা মুখ তার সঙ্গে ছিলেন। এখনও দুই-একজন আছেন। এদের মধ্যে ন্যাপের পঙ্কজ ভট্টাচার্য, জাসদের শাহজাহান সিরাজ, আওয়ামী লীগের মফিজুল ইসলাম কামাল, মোস্তফা মহসিন মন্টু, সদ্য যোগদানকারী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর (৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মৌলভীবাজার-২ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন) ও মোকাব্বির হোসেনের (৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সিলেট-২ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন) নাম উল্লেখযোগ্য।

ড. কামাল প্রথমে জামায়াতবিরোধী ছিলেন। বিএনপি জামায়াতের ২২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন দেয় যা কামাল হোসেন জানতেন না বলে জানিয়েছেন। বিএনপি কখনোই জামায়াতের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। ড. কামাল প্রথম দিকে বলেছিলেন, জামায়াত তাদের জোটে থাকলে তিনি থাকবেন না।

তিনি যাই বলুন, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-বিএনপির তিনিই শীর্ষ নেতার ভূমিকা পালন করেছেন। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেছেন দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত হয়তো। আ স ম রবও (এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা, ডাকসুর ভিপি, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী, ’৯৬-২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন) - জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন।

কাদের সিদ্দিকী ঋণখেলাপি হওয়ায় এবার নির্বাচন করতে পারেননি, তার মেয়েকে দাঁড় করেছিলেন, নির্বাচনে জিততে পারেননি। তিনি বড় বড় কথা বলেন, আদর্শের বুলি আওড়ান। তিনিও মত বদলেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ কী বলেন না বলেন- অসুস্থ মানুষ। বঙ্গবন্ধুর øেহভাজন হওয়ায় তিনি গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা হতে পেরেছেন।

এখন সব ভুলে জীবনের শেষ প্রান্তে তিনিও বদলে গেলেন। পরন্ত বেলায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান-মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দিলেন, জামায়াতের পক্ষে তিনি কথা বলেন।

মোস্তাফা মহসিন মন্টু ’৭৫-পরবর্তী দুঃসময়ে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। অনেক সাহসী কর্মীবাহিনী ছিল আপনার, এখন সব হারিয়ে আপনিও বদলে গেলেন।

মান্না বরাবরই বিভ্রান্তির রাজনীতি করে এসেছেন। মাঝে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও বিভ্রান্তির রাজনীতে যুক্ত হয়েছেন। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ছাত্রলীগের সভাপতি, ডাকসুর ভিপি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনিও বিভ্রান্ত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকের এমন অধঃপতন কল্পনাও করা যায় না। আপনার কাছে তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু আশা করা যায় না। আপনি হয়তো ভ্রান্তি বিলাসে ডুবে আছেন; হঠকারী রাজনীতি কোনো মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।

বিএনপি-জামায়াত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বাংলাদেশকে আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার বার্তা তরুণ প্রজন্মকে দিতে না পারলে অচিরেই তারা হারিয়ে যাবেন। নির্বাচনে গণরায়কে তারা মেনে না নিয়ে দেশি এবং বিদেশিদের সমর্থন হারালেন। তারা আন্দোলনের চিন্তা-ভাবনা করছেন, যেখানে তাদের নিজেদেরই পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন; নিজেদের ভুল সংশোধন করা প্রয়োজন। সময়োপযোগী দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেই তারা টিকে থাকতে পারবেন। তাদের মনে রাখা দরকার, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী ইশতেহারে দেশবাসীর সাহায্য-সহযোগিতা চেয়েছেন।

দেশের মানুষ তার কথাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। তার ফলে নির্বাচনে তার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এখন এত বড় বিজয়কে ধারণ করা, দেশ শাসন করা, সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে যাওয়া, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, দুর্নীতিমুক্ত থাকা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি রোধ করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা- এমন অনেক খাতে দ্রুত সাফল্য অর্জন করা খুবই জরুরি।

কাজী শওকত হোসেন : কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×