মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবনতির নির্দেশক সুবর্ণচর

  একে এম শামসুদ্দিন ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণধর্ষণ

৩০ ডিসেম্বর রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক অসহায় নারীর ওপর যে বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়, সেই লোমহর্ষক কাহিনী ১৯৭১ সালের পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বাঙালি নারী ধর্ষণের ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়। ওরা তখন একই কায়দায় স্বামী সন্তানদের বেঁধে রেখে আমাদের মা-বোনদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছিল।

পাকিস্তানি হায়নাদের সেই লোলুপদৃষ্টিতে পড়ে এদেশের দু’লাখ মা-বোন হারিয়েছিল তাদের সর্বস্ব। বাঙালি নারীর সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং মান-সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আজকের বাংলাদেশের চরজুবলী ইউনিয়নের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তারই যেন একটি মহড়া হয়ে গেল সেদিন।

এ ঘটনায় অত্যাচারিতের চরিত্রে সেই বাঙালি নারী, শুধু অত্যাচারীর চরিত্রটির পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র। ভাবতে অবাক লাগে, যে দলটির নেতৃত্বে এদেশ স্বাধীন হয়েছে সে দলের কিছু সদস্য এ ঘটনাটির জন্ম দিল। সুবর্ণচরের সেই কালরাতের অন্ধকার ভেদ করে এক নারীর আর্তচিৎকার আজ যেন শত সহস্রগুণে বেড়ে গিয়ে সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

নির্যাতনের ঘটনাটি যেমন মারাত্মক বেদনাদায়ক, ঘটনার পেছনের কারণটি আরও আশঙ্কাজনক। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা দাবি করে আমাদের মা-বোনেরা যেভাবে ইজ্জত হারিয়েছিল, আজ সেই স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হিসেবে নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে একইভাবে সম্ভ্রম হারিয়েছে একজন বোন, একজন মা এবং একজন গৃহবধূ।

কারণ প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যে সজ্জিত সুবর্ণচরের সেই নারী আমাদেরই কারও ভগিনী, কারও জননী কিংবা গৃহবধূ। তার অপরাধ তিনি একটি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী কর্মীদের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে নিজ পছন্দের ব্যক্তির পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন।

এর জন্য যে তাকে এত বেশি মাশুল দিতে হবে তা হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি। হয়তো ভেবেছিলেন এ ঘটনার সেখানেই সমাপ্তি ঘটেছে। অতঃপর তিনি তাদের তাৎক্ষণিক বাঁকামুখের ধমক ও ভবিষ্যৎ পরিণতির হুমকি হজম করে বাড়ি ফিরেছিলেন।

নির্বাচনের দিনের আলো কাটতে না কাটতেই নেমে এলো সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত। ১০-১২ জন পুরুষের একটি দল সেদিন মধ্যরাতে অসুস্থ অটোরিকশা চালক স্বামী ও সন্তানদের রশি দিয়ে বেঁধে রেখে, হায়েনার মতো অসহায় গৃহবধূকে ঘিরে ধরে একে একে লালসা মিটিয়েছিল তাদের হুকুম অমান্য করার প্রতিশোধ নিতে।

এ জঘন্য ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। চারদিকে আলোচনাও হচ্ছে ব্যাপক। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে যে সন্দেহের আলোচনা-সমালোচনা চলছে, সুবর্ণচরের এ পৈশাচিক ঘটনা যেন তারই স্বাক্ষর বহন করে।

এবারের জাতীয় নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের একচেটিয়া দৌরাত্ম্যের যে অভিযোগ সাধারণ ভোটারদের, সুবর্ণচরের এই ঘটনাই যেন সে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠা করেছে। অনেকে এ ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও ‘সুবর্ণচরের গণধর্ষণ’ দেশব্যাপী অশুভ শক্তির দৌরাত্ম্যই প্রমাণ করেছে।

বিগত বছরগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের এসব সদস্যের সব ধরনের অপকর্মকে ছাড় দিতে দিতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত অনেক সময় যথাযথ আইন প্রয়োগে অসহায় অনুভব করে। অবাঞ্ছিত শক্তির এসব অপকর্ম সমাজের স্বাভাবিক জীবনকে করছে ব্যাহত এবং সাধারণ মানুষ দিন দিন এ অপশক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে।

নারী কন্যা, নারী ভগিনী, নারী জননী বলে তাদের সবার প্রতি সমভাবে সম্মান প্রদর্শনের যে উপদেশ বাক্য আমরা এতদিন শুনে এসেছি, তা বোধহয় এখন আর সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে আমাদের নারী সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ভাগ্যবতীই বলতে হয়।

কারণ এদেশের একজন প্রথিতযশা ব্যক্তি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন মাসুদা ভাট্টির সাংবাদিকতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এদেশের নারীসমাজ যেভাবে প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন, সুবর্ণচরের এ অসহায় নারীর চরমতম সম্ভ্রমহানির পর সেই নারীসমাজকে সেরকম প্রতিবাদী হতে দেখা গেল না। সে সময় সুলতানা কামাল, খুশী কবিরসহ ২০১ জন সমাজে পরিচিত বিশিষ্ট নারীর প্রতিবাদলিপি বিভিন্ন মিডিয়ায় আমরা দেখেছিলাম।

এসব বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্ব মইনুল হোসেনকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। এখন প্রশ্ন হল, সুবর্ণচরের সেই সম্ভ্রমহানির জন্য এখন তারা কাকে ক্ষমা চাইতে বলবেন? তাদের এ নির্লিপ্ততা হাজারও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নারীসমাজের পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদেরও তখন সোচ্চার হতে দেশবাসী দেখেছে। অথচ অসহায় গরিব গৃহবধূর এ সংকটে এদের কাউকেই তার পাশে এসে দাঁড়াতে না দেখে দেশের মানুষ হতাশ হয়েছে। তাদের এই মূক ও বধির অবস্থানের জন্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে।

দেশে এবং প্রবাসের অনেক বাংলাদেশি সেদিনের প্রতিবাদকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সুবর্ণচরের ঘটনায় আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকার জন্য তাদের আপসকামী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করছে।

যদিও সুবর্ণচরের ঘটনার পর জাতীয় মহিলা সংস্থার পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মমতাজ বেগম, একই সংস্থার কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াদিয়া জামান, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের লুবনা মরিয়ম নোয়াখালী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গৃহবধূ ও তার স্বামী-সন্তানদের খোঁজখবর নিয়েছেন।

তবে সুবর্ণচরের এ নিষ্ঠুর ঘটনার প্রতিবাদে আগের মতো সম্মিলিত কোনো উদ্যোগ আজও চোখে পড়েনি। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় এর মূল কারণ কিনা সে প্রশ্ন যদি কেউ তাদের করে, এর উত্তর কী হবে আমাদের জানা নেই।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সুবর্ণচরের অভাগা নারীর সেই আর্তচিৎকার জাতীয় নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী দলের হাইকমান্ডের বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। দুশ্চরিত্র দলীয় কিছু সদস্যের অপরিণামদর্শী আচরণ তাদের এ বিজয়কে কালিমালেপন করেছে সন্দেহ নেই। অতীতে দেখেছি দলীয় কর্মীর অনেক অন্যায় আচরণ রহস্যময় কারণে উপেক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। দলের বদনাম হবে ভেবে ধামাচাপা দেয়ার একধরনের অসুস্থ মনোভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে।

অবশ্য বহুবিধ চাপের মুখে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিতেও দেখা গেছে। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড এর প্রকৃত উদাহরণ। শুধু দল থেকে কর্মীদের বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। অভিজ্ঞতা বলে, বহিষ্কারের পর এসব অপরাধী দলের কারও না কারও ছত্রছায়ায় থেকে অপকর্ম চালিয়ে গেছে। সুবর্ণচরের ঘটনার অপরাধীদেরও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রেও যদি একই মনোভাব পোষণ করা হয় তাহলে ভুল হবে।

অপরদিকে উল্লিখিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন এদের দেশের প্রচলিত আইনের ধারায় বিচারের ব্যবস্থা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অতীতের মতো হস্তক্ষেপ না করে আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। শুধু তাই নয়, বিগত দিনে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অনিয়ন্ত্রিত এসব কর্মীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, ‘কোটা আন্দোলন’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময় হাতুড়ি ও হেলমেট বাহিনীর অত্যাচারের ক্ষতচিহ্ন যুবসমাজের মনের ভেতর আজও দগদগে হয়ে জ্বলছে। নতুন যাত্রায় একটি ভয়হীন মুক্তসমাজ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সাধারণ মানুষ কথিত উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে না। কারণ মানুষ প্রথমেই চায় তার নিজের জীবনের নিরাপত্তা ও মুক্তমনে কথা বলার সুযোগ।

এসব যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে মানুষ একদিন একযোগে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেই। অনিয়ন্ত্রিত দলীয় কর্মীদের অবর্ণনীয় অপরাধগুলোর সমষ্টিগত প্রভাব এদেশের মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে ফেলে। আগামীতে এদের বিরুদ্ধে দলের শক্ত অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে না পারলে মানুষের হতাশা আরও বেড়ে যাবে এবং এসব অপশক্তিই হয়ে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের আগামীদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রধানতম প্রতিবন্ধক।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×