আত্মহত্যা নয় আত্মকর্মসংস্থান

  শুভেন্দু সাহা ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আত্মহত্যা নয় আত্মকর্মসংস্থান

সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীক আত্মহত্যা করেছেন।

প্রতীকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, তবে প্রতীক আমার পরিচিত! কথাটি দ্ব্যর্থবোধক হলেও সত্য এই যে, প্রতীকের বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শান্তা তাওহিদা আমার বিভাগের বড় আপু। এককথায় সাহসী ও প্রখর কর্মযোগী বলতে যা বোঝায় তিনি ঠিক তা-ই।

সাম্প্রতিক সময়ে ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করলে শান্তা তাওহিদা বেশ সরব ছিলেন আত্মহত্যাবিরোধী প্রচারণায়। যে কোনো আত্মহত্যাই দুঃখের; কিন্তু পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আলোর পথ দেখানোতে বিশ্বাসী মেধাবী শিক্ষক শান্তা তাওহিদার ভাই প্রতীক যখন আত্মহত্যা করেন, তখন তা শুধু দুঃখেরই নয়, বরং তা হয়ে যায় ভীষণ যন্ত্রণার।

শান্তা তাওহিদা তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষকদের। দাবি করেছেন, তার ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। সেই স্বপ্নই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্নাতকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া একটি ছেলে এমন স্বপ্ন দেখবে সেটাই স্বাভাবিক, তবে অস্বাভাবিক বিষয় হল, স্নাতকোত্তরে সেই ছেলেটির সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতে কোনো শিক্ষকই রাজি হননি এবং এ কথা শুনে শিক্ষকরা তো বটেই যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ স্তম্ভিত ও লজ্জিত হবেন। চিন্তা করতে শুরু করবেন শিক্ষকরা আলোর দিশারি নাকি অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা কোনো দানব! আমি জানি না প্রতীকের কী দোষ-গুণ ছিল, কিন্তু শিক্ষকতার তো এটাই মাহাত্ম্য যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভুল শুধরে দিয়ে তাদের সমৃদ্ধির পথ দেখাবেন, উৎস হয়ে উঠবেন অজস্র প্রেরণার। তবেই না শিক্ষা প্রাসঙ্গিক হবে, শিক্ষার্থীদের অন্তরাত্মায় প্রতিষ্ঠা পাবে শিক্ষাগুরুর মর্যাদা।

মুদ্রার ওপিঠের কথাও একটু বলা দরকার। যে কোনো জীবনই অসীম সম্ভাবনার ক্ষেত্রভূমি। প্রতিটি জীবনকে বুঝতে হয় জীবনের মাহাত্ম্য। কেননা একটি জীবনের নেপথ্যে রয়েছে অসংখ্য জীবনের স্বপ্ন ও ভালোবাসাময় আর্তি। যারা জীবনের ভালোবাসার আর্তিগুলোকে ভক্তিসহকারে কর্মে রূপদানের চেষ্টা করেন, তাদের বারবারই পড়তে হয় জীবন থেকে পাওয়া নানারকম চ্যালেঞ্জের সামনে। যাপিত জীবনে এসব বাস্তব ও পরাবাস্তব চ্যালেঞ্জ তাকে আরও শানিত করে, সমৃদ্ধ করে। সেই সমৃদ্ধির পথে কখনও কখনও প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে জন্ম নেয় বিস্তর ফারাক। তাই বলে কি জীবনকে ছুটি দিতে হবে? জীবনের থেকে পালিয়ে যে জীবন খোঁজার চেষ্টা মানুষ করে, তাকে কাপুরুষতা ছাড়া কিইবা বলা যেতে পারে! সুতরাং জীবন থেকে পাওয়া শতরকম চ্যালেঞ্জকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নতুন উদ্যমের ছন্দে জীবনকেই জানিয়ে দিতে হয় লোকসঙ্গীতের সেই বিখ্যাত লাইনটি- ‘ও জীবন, জীবনরে, ছাড়িয়া যাস না মোরে/ তুই জীবন ছাড়িয়া গেলে, লোকে বলবে মরা জীবনরে...।’

আজ এটা পাইনি বলে জীবন থমকে যাবে বিষয়টি এমন নয়, বরং আগামীকাল পৃথিবীকে নতুন কিছু উপহার দেব; এই চিন্তা ও কর্মই জীবনকে উপভোগ্য করে গড়ে তোলে। যারা ব্যক্তিজীবনের হতাশার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তাদের সামনে আত্মহত্যার হাজারটা কারণ ও পথ থাকতে পারে। প্রয়াত অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ তার ‘আত্মহত্যার অস্ত্রাবলি’ নামক কবিতায় বলেছিলেন- ‘স্লিপিং ট্যাবলেট খেয়ে অনায়াসে মরে যেতে পারি/ বক্ষে ঢোকানো যায় ঝকঝকে উজ্জ্বল তরবারি/ কপাল লক্ষ্য করে টানা যায় অব্যর্থ ট্রিগার/ ছুঁয়ে ফেলা যায় প্রাণবান বৈদ্যুতিক তার/ ছাদ থেকে লাফ দেয়া যায়/ ধরা যায় ভোরবেলাকার রেলগাড়ি/ অজস্র অস্ত্র আছে যে কোনো একটি দিয়ে আত্মহত্যা করে যেতে পারি।’ বহু উপায়ে যেমন আত্মহত্যা করা যায়, ঠিক তেমনি বহু উপায়ে জীবনকে সুন্দর করে সাজানোও যায়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মকর্মসংস্থান। অন্যের ওপর ভরসা না করে স্বীয় মেধা, মননশীলতা, প্রজ্ঞা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নত আত্মকর্মসংস্থান করা ব্যক্তির সংখ্যা বর্তমানে প্রচুর। সুতরাং তরুণ প্রজন্মের উচিত তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা, যারা নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিশ্বকে জানান দিয়েছেন তার অবস্থান। আর শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের সেই পথই দেখানো যেখানে আত্মহত্যার গ্লানি নেই, বরং আত্মকর্মসংস্থানের গর্ব আছে।

শুভেন্দু সাহা : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×