দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানটা যেন বহাল থাকে

  বিমল সরকার ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার নতুন করে দায়িত্বভার গ্রহণের পর শুরু হয়েছে জাতির নতুন করে পথচলা। এটি গৌরব-গরিমার বিষয় যে, শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করলেন। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি।

সরকার পরিচালনায় যথেষ্ট অভিজ্ঞ। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কর্মস্থলে শেখ হাসিনা প্রদত্ত প্রথম বক্তৃতাটি শুনে সাধারণ মানুষ নতুন করে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছে।

গোটা জাতির মনেই নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী ‘দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদককে’ প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এসবের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গিয়েও তিনি একই ভাষায় কথা বলেছেন। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনমনে আলোচনা-সমালোচনা ও তর্কবিতর্ক আছে এটা সত্য। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এহেন অবস্থানের ব্যাপারে কারও মনে সংশয় থাকার কথা নয়। তবে আমরা চাই কথা ও কাজের মিল।

বলতে বাধা নেই, দুর্নীতি এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। দিন দিন তা দুরারোগ্য ব্যাধির রূপ নিয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির ধারণা সূচকে আমাদের দেশকে আর আগের মতো ‘চ্যাম্পিয়ন’ বা ‘রানার্স-আপ’ অভিধায় অভিহিত হতে হয়নি। উপরন্তু গত বছর এ ক্ষেত্রে আমাদের দুই ধাপ অগ্রগতি হয়েছে।

একজন শাসক যত সহৃদয়, সৎ, দক্ষ ও কৌশলীই হোন না কেন, তার একার পক্ষে সুষ্ঠুভাবে দেশ শাসন করা সম্ভব নয়। প্রাচীনকালের কূটনীতিবিশারদ কৌটিল্য পণ্ডিত যথার্থই বলেছেন- ‘এক চাকায় যেমন রথ চলে না, সেরূপ রাজ্য পরিচালনা রাজার একার দ্বারা সম্ভব হয় না। তার জন্য প্রয়োজন মন্ত্রী, সেনাপতি, সৈন্য-সামন্ত ও পারিষদবর্গের। সবাই মিলে রাজাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে বলেই রাজার পক্ষে সম্ভব হয় সুষ্ঠুভাবে রাজ্য পরিচালনা করা।’

দুগ্ধপোষ্য শিশুও কিন্তু নিজের ভালো-মন্দ কিছুটা হলেও বোঝে, আঁচ করতে পারে। বোধকরি এ-ও স্রষ্টারই এক মহিমা। আর তাই লক্ষ করলে দেখা যাবে, দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ও অপার স্নেহের আধার মায়ের কোল থেকেও সে কখনও কখনও অবলীলায় অন্য কারও কোলে যাচ্ছে, আবার নানা প্রলোভনেও একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কোলে সহজে যাচ্ছে না, যেতে চাচ্ছে না। কে বেশি আদর আর কে কম আদরের সঙ্গে আহ্বান করছে, কিছুটা হলেও টের পায় সে। ছোট ও বড়, বিষয়টি সবার জন্য বোধকরি অবশ্যই শিক্ষণীয় এবং গভীরভাবে উপলব্ধি করার।

মানুষের বোঝার ক্ষমতার আর কোনো উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। শুধু হাওর-বাঁওড় আর চরাঞ্চল নয়, দেশের সর্বত্রই অনগ্রসর এলাকাগুলোয় কমবেশি একটি চিত্র নজরে পড়ে : রাস্তা, ডোবা-নালা, খেত-খামার, নদীর ধার এবং এমন সব স্থানের আশপাশে প্রকৃতির ডাকে বসে পড়েছে অনেকে। পথচারী বা অন্য কোনো লোক কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় মাথাটি হঠাৎ নিচু করে ফেলে তারা। তাদের ধারণা, তারা নিজেরা যেমন দেখতে পাচ্ছে না, তেমনি পথচারী বা আর কারোরই দেখার সুযোগ নেই তাদের!

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন স্বার্থান্ধ, মতলববাজ ও লোভী ব্যক্তিদের আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ড দেখলে আমার এই চরিত্রগুলোর কথা মনে পড়ে। স্যুট-টাই-কোট আর দামি পরিষ্কার জামাকাপড় যা-ই পরা থাক না কেন, কেন জানি তাদের আলাদা করে দেখতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়, সামান্য কিছু বাদ দিলে সবাই একাকার। একেবারে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত।

শৈশবকালে যা বোঝা যায়, কৈশোর-যৌবন-প্রৌঢ়-বার্ধক্যে তা বোঝা যাবে না, এমন ভাবাটাও বোধকরি অবান্তর। তলে তলে কাজ করে কিংবা মাথা নিচু করে ‘কাজ’ সেরে যারা মনে করে, কেউই কিছু বোঝেনি বা বোঝে না কিংবা কেউই কিছু দেখেনি বা দেখে না, বলতে হবে তারা আসলেই বোকার স্বর্গে বাস করে।

সময় সময় পশুও আশ্চর্য বুদ্ধির কাজ করে। মানুষের পক্ষে যা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব বা সহজ হয় না, পশু তা সহজে করে দেয়। হাতি, ঘোড়া ও কুকুরের চমকপ্রদ বুদ্ধির অনেক গল্পের কথাই শুনতে পাওয়া যায়। এরূপ হাতির বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনেক পুরনো একটি গল্প : একবার আফ্রিকাবাসী এক ইংরেজ ভদ্রলোক কিছুদিনের জন্য স্বদেশে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেন। যাওয়ার আগে তার এক বন্ধুর স্ত্রীর কাছে তিনি নিজের হাতিটা রেখে গেলেন। অনেকেরই হয়তো জানা নেই, হাতির মাহুতেরা অনেক সময় হাতির খাবারদানা চুরি করে বিক্রি করে।

এমনকি তারা এমন করে হাতিকে শিখিয়ে নেয় যে খাবার সময় হাতি নিজেই মাহুতের জন্য দানা চুরি করে রেখে দেয়। যা হোক, সাহেব চলে যাওয়ার কিছুদিন পর তার বন্ধুর নজরে পড়ে হাতিটা যেন দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছে। তখন তার মনে হল মাহুত নিশ্চয়ই দানা চুরি করে। একদিন হাতিকে দানা খাওয়ানোর সময় মেম সেখানে এলেন এবং হাতি ক্রমশ রোগা হয়ে যাচ্ছে বলে মাহুতকে অনেক তিরস্কার করতে লাগলেন।

মাহুত বলতে লাগল, ‘না মেম, আমি কি উহার দানা চুরি করতে পারি; ও আমার বেটি হয়।’ এই বলে সে হাতিকে আদর করতে গেল। এমন সময় হাতি শুঁড় দিয়ে খস করে তার গায়ের কম্বলখানা কেড়ে নিল। মেম দেখতে পেলেন মাহুতের বগলে চুরি করা দানার পুঁটলি রয়েছে। সেয়ানা ও বুদ্ধিমান এ হাতিটির প্রশংসা করতেই হয়।

কে বোঝে না কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ কাজ? শিশুরা বোঝে, পশুরা বোঝে; কম আর বেশি মানুষেরও তো সবকিছু বোঝারই কথা। দুর্নীতি দিন দিন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, এটা ঠিক। কিন্তু সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রদীপটি একেবারে নিভিয়ে ফেলতে পারেনি। সরকারের পঞ্চাশটি মন্ত্রণালয় থাকলে সব কটিকে মানুষ একই দৃষ্টিতে দেখে না।

একেকটি মন্ত্রণালয়ে আনুমানিক পঞ্চাশজন কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি থেকে থাকেন, খোঁজ নিলে তাদের মাঝ থেকেও নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের দিক থেকে জনাকতককে আলাদা করে ফেলা যাবে। বিভাগ, অধিদফতর, পরিদফতর ও এসবের শাখা-প্রশাখা, জেলা-উপজেলার অফিস এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের খোঁজখবর তো যার যার প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকেরই জানা।

প্রধানমন্ত্রী ও কোনো কোনো মন্ত্রীর প্রকাশিত মনোভাব ও আহ্বানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, শতভাগ সততা-দক্ষতার আগে অন্তত যার যার লজ্জাবোধের প্রতি আমরা সবাই যেন মনোযোগী হই।

বিমল সরকার : কলেজশিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×