দুর্দশাই সত্যিকারের পরশপাথর

  জয়া ফারহানা ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্দশাই সত্যিকারের পরশপাথর
দুর্দশাই সত্যিকারের পরশপাথর

ফ্লেচারের মতে, ‘দুর্দশাই সত্যিকারের পরশপাথর’। তবে স্বাধীন ও পক্ষপাতহীনদের সংখ্যা যখন তলানিতে এসে ঠেকে তখন প্রশ্ন আসতে পারে ফ্লেচারের এ অমর বাণী ক’জন অন্তরে ধারণ করেন, ক’জনই বা মানেন? বেশিরভাগই চলতি হাওয়ার পন্থী।

যে কারণে অভিনন্দন ও আড়ম্বরের আতিশয্যে ভেসে যাচ্ছে সরকারি দল। চলছে ২৮ হাজার কোটি টাকার বহুমুখী পদ্মা সেতু প্রকল্প, ২২ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প।

কোনো প্রকল্পই হাজার কোটি টাকার নিচে নয়। ফলে সিনহুয়া এবং আনন্দবাজার গোষ্ঠীর মধ্যে কে কার আগে অভিনন্দন জানাবে চলেছে সে প্রতিযোগিতাও। ভালো হতো যদি এটা প্রকৃত শুভাকাক্সক্ষীর আন্তরিক অভিনন্দন হতো। কিন্তু বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর এই গুচ্ছ গুচ্ছ অভিনন্দনের নেপথ্যে নিঃস্বার্থ শুভকামনার চেয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের আগ্রহই যে বেশি থাকে জনগণ বোঝে। আবার এ অভিনন্দন নিয়েও একটি মহলের উৎসাহের আতিশয্য ছিল চোখে পড়ার মতো (আপনার মাঝে আপনি হারা, আপন সৌরভে সারা)। তবে আতিশয্যে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে নির্বাচন কমিশন। মাছ উৎসব, পিঠা উৎসব।

সন্দেহ নেই নির্বাচনে কোনো কোনো দলের সর্বনাশ হলেও নির্বাচন কমিশনের ছিল পৌষ মাস। তফসিল ঘোষণার পর থেকে একটি বিশেষ দলের প্রতি পুলিশ এবং প্রশাসনের বিশেষ পক্ষপাত তারা নেক নজরে দেখেছে। বিনিময়ে পুলিশও তাদের পিঠা ও মাছ উৎসবকে নির্বিঘ্ন করেছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিয়ে। বিপরীতে বিপন্ন বিরোধী দলকে চরম দুর্দশায় ফেলার পরও এখনও আশ মেটেনি অনেকের। বিরোধী দলের ওপর দিয়ে বয়ে যচ্ছে বিচিত্র উপদেশের স্রোত।

অথচ অন্ধও দেখেছে, কী মাত্রায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার সবগুলো ধাপে হামলা, মামলা, গ্রেফতার ও পুলিশি নির্যাতন চলেছে বিরোধীদের ওপর। নেতাকর্মীরা তো বটেই, প্রার্থীরা পর্যন্ত গুরুতর আক্রমণের শিকার হয়েছেন। কোনো কোনো প্রার্থী মার খেতে খেতে কোনো রকমে বেঁচেছেন। একটি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকলে বৈষম্যের শিকার দলটি যে দুর্দশার ধারাবাহিক ফাঁদে পড়বে এ আর আশ্চর্য কী।

দেশের সংবাদ মাধ্যমের হাজারও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নির্বাচনের শত অনিয়মের যে খবর প্রকাশ হয়েছে তা মোটেও হেলাফেলার নয়। ‘কেন্দ্র ফাঁকা, বাক্স ঠাসা’, ‘আওয়ামী লীগের দাপটে প্রতিপক্ষ অসহায়’, ‘আঙুলে অমোচনীয় কালি কিন্তু ব্যালট পেপার পাননি’ ‘নৌকায় সিল না দিলে ভোটকেন্দ্রে আসার দরকার নেই’- এমন শত শত শিরোনাম আমরা দেখেছি। অথচ নির্বাচন কমিশনের কাছে তা পাত্তাই পেল না। মানুষকে বিপন্ন দশায় পড়তে দেখলে যারা বিমলানন্দ অনুভব করেন, চিরদিনই তারা নিষ্ঠুর রুচির। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন সংকীর্ণতার সংস্কৃতি।

এর দৈন্যদশার কথা জানতাম; কিন্তু তা যে দৈন্যের পর্ব পেরিয়ে আরও শোচনীয় দশায় পতিত হয়েছে তা জানা গেল ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরই। একপক্ষের ভাষায় এ এক অভাবনীয় বিজয়। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি এ এক অভাবনীয় ঐক্য। র‌্যাব-বিজিবি-পুলিশ-প্রশাসন-বিজনেস কমিউনিটি এবং সেলিব্রেটিদের অভাবনীয় ঐক্য। যাকে বলা হচ্ছে ‘ঐক্যবদ্ধ জনগণ’। এ ‘ঐক্যবদ্ধ জনগণ’ মিলেমিশে এমন সব সৎ, স্বচ্ছ ও নির্লোভ প্রার্থীকে নির্বাচিত করে এনেছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অন্তত শত কোটি টাকার সুদই মওকুফ করে দিয়েছে ব্যাংক। ব্যাংক যদি কেবল শত কোটি টাকার সুদই মওকুফ করে তবে ঋণ দিয়েছিল কত?

ব্যাংকের টাকা জনগণের। জনগণের অর্থ যারা চুরি করল জনগণই আবার দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের নির্বাচিত করে আনল! তাও আবার কোথাও কোথাও ৯০ শতাংশ ভোট, কোথাও প্রায় শতভাগ। দিনকাল নাকি বদলে গেছে। জনগণ নাকি এখন কীসে নিজের উন্নতি হবে কীসে নিজের ভালো হবে এ চিন্তা বাদে ডানে-বামে তাকায় না। তো এই আত্মকেন্দ্রিক জনগণ কী কারণে তার আমানতের লুটেরাদের বিজয়ী করে আনল?

কেবল ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা, গত ১০ বছরে ৬ লাখ কোটি টাকা। নির্বাচিত এই ‘নিষ্কলুষ-নিষ্পাপ’ প্রতিনিধিরা কাদের স্বার্থ রক্ষা করবে? বাংলাদেশের করদাতা ষাট হাজার বৈধ কোটিপতির স্বার্থ? নাকি অবৈধ কোটিপতিদের স্বার্থও? যারা ইতিমধ্যে দেশের শ্রমবাজারকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের বাজারে পরিণত করেছেন, তাদেরও? বিবিএসের হিসাবও যদি আমলে নিই তাহলে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এখন ২৬ লাখ।

স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পাস এমন উচ্চ শিক্ষিতের ৯ শতাংশই বেকার। উচ্চ হারের এই উচ্চ শিক্ষিতের বেকারের দেশে বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে দুইশ’ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বছরে। ‘প্রপাগাণ্ডা সেলের’ কাছে কী ব্যাখ্যা আছে এর? বলা হচ্ছে ২ কোটি ৩৫ লাখ নতুন ভোটারের সবাই নাকি আওয়ামী জাদুতে মুগ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগে ভোট দিয়েছে। কী করে বিশ্বাস করব, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা জনপ্রিয় আন্দোলন দুটিকে যখন সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে? এত দ্রুত তরুণরা ভুলে যায় অপমান?

২.

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুর্দশা পরশপাথর নয়। এখানে দুর্দশাগ্রস্তকে পাথর ছুড়ে ছুড়ে রক্তাক্ত করে বিমলানন্দ অনুভব করার লোকের অভাব নেই। তা সে দুর্দশার কারণ যা-ই হোক। পালের হাওয়া যেদিকে অনুকূল সেদিকেই সবাই নাও ভাসাতে চান। সম্ভবত সে কারণে বিএনপিকে শুনতে হচ্ছে জনসম্পৃক্ততাহীন, সঠিক রাজনৈতিক দর্শনশূন্য, সাংগঠনিক দুর্বলতায় পরিপূর্ণ, ড্রইংরুম পলিটিশিয়ানের দল। হয়তো এর সব ক’টিই বিএনপির জন্য প্রযোজ্য।

কিন্তু কেন এই দলটি দুর্দশার মধ্যে পড়ল? সরকারি দলের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোবৃত্তি এবং সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে অন্যায় ব্যবহারের প্রবণতাই কি দেশকে বিরোধী দলশূন্য করে তুলল না? অবস্থা এমন যে, বিরোধী দল তৈরির ক্ষমতাও এখন সরকারি দলের হাতে। এর নাম গণতন্ত্র?

বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ না করলেও সত্যের খাতিরে বলতেই হবে, নির্বাচনী প্রচারণা পর্বে যখন বিএনপিসহ সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক প্রচারণায় বাধা দেয়া হয়েছে, যখন বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা সরকারি দলের ও প্রশাসনের ক্যাডার কর্তৃক আক্রমণের শিকার হয়েছেন, গণসংযোগের কাজে তুমুল বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন, যখন শেষ মুহূর্তে বিরোধী দলের প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশি অভিযান চলেছে, প্রতিশ্রুতি সত্ত্ব্ওে তফসিল ঘোষণার পর বিরোধী প্রার্থীদের মামলায় মামলায় জেরবার করা হয়েছে- এমন শত শত অন্যায়ের কোনো প্রতিকার নির্বাচন কমিশন করেনি। বরং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন সিইসি এবং একজন নির্বাচন কমিশনার।

৩.

শৈশবে আমরা পড়েছি রহিম ভালো ছেলে। সে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। মসজিদে ফজরের নামাজ পড়তে যায়। তারপর পড়ার টেবিলে মনোযোগ দিয়ে পড়তে বসে। ফলে সে সব পরীক্ষায় প্রথম হয়। দিনকাল হয়তো সত্যিই বদলে গেছে। এখন রহিমরা ফজরের পর পড়ার টেবিলে একনিষ্ঠ ধ্যানে অধ্যয়ন করলেও পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার কোনো সুযোগই আর নেই। এখন পরীক্ষায় প্রথম হতে গেলে উঠতে হবে তাহাজ্জদের সময়। নয়তো ব্যবসায়িক অ্যাসোসিয়েশন থেকে শুরু করে বাজার সমিতি, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ থেকে আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির নির্বাচনেও ভালো ফল করার কোনো সম্ভাবনাই আর নাই রহিমদের।

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×