মুক্ত জীবন-রুদ্ধ প্রাণ

জনগণ নিজেরাই নিজেদের মুক্ত করে

  মাহফুজ উল্লাহ ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাতায়ন

লেখাটি আরও অনেক আগেই লেখা উচিত ছিল; কিন্তু তাই বলে বিলম্বের কারণে বক্তব্যের গুরুত্ব কোনোভাবেই কমে যায়নি। সে কারণেই এ লেখা।

এ বছর অনেকেই ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছেন। কিছু কিছু গণমাধ্যমে বিষয়টি উপেক্ষিত থাকেনি; কিন্তু যেভাবে উদযাপিত হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে হয়নি।

যে আন্দোলনের কারণে গণতন্ত্র হরণকারী ও উন্নয়নের ফেরিওয়ালা আইয়ুব সরকারের পতন ঘটেছিল ১৯৬৯ সালে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তার সূত্রপাত ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মওলানা ভাসানী আহূত প্রতিবাদ সভা ও হরতালের মাধ্যমে। আন্দোলন তীব্রতা লাভ করে মূলত তিনটি কারণে : প্রথমত, ১৯৬৮ সালে বছরব্যাপী সারা পৃথিবীজুড়ে অব্যাহত ছিল তরুণদের বিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, এ আন্দোলন পাকিস্তানের উভয় অংশ, বিশেষত পশ্চিম পাকিস্তানে প্রথম বিস্ফোরিত হয়। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সন্তানরা যখন লান্ডিকোটাল থেকে কালোবাজারে কেনা পণ্য নিয়ে ঘরে ফিরছিল, তখনই তারা পুলিশি আক্রমণের শিকার হয়। এরপরই ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জুলফিকার আলী ভুট্টোর আইয়ুববিরোধী আন্দোলন। রাওয়ালপিন্ডিতে ছাত্রদের ওপর পুলিশি হামলার ঘটনা কিছুটা হাস্যকর মনে হতে পারে। ফ্রান্সেও একই ছাত্রাবাসে ছাত্রছাত্রীদের থাকার অনুমতি চেয়ে সোবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, তাই পরবর্তী পর্যায়ে গ্রাস করে ইউরোপকে। তৃতীয়টি হচ্ছে, ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচির উত্থাপন।

সে সময় বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সামনে এগোতে পারছিলেন না। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবাস এবং পরবর্তী সময়ে বিচার। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতি আওয়ামী লীগকে যেভাবে পর্যুদস্ত করেছিল, সে কথা বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব খুব একটা স্মরণ করতে চান না। কারণ ১৯৭১ সালে অর্জিত সাফল্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে এক ধরনের ‘প্রভু মানসিকতায় আচ্ছন্ন’ করেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনায় সেই ঘোর কেটে যায় এবং ১৯৮১ পর্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এগিয়ে গেছে। দলের ভেতরে সন্দেহ, অবিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা, সরকারের সঙ্গে হাত মেলানো কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। আজকে যখন আওয়ামী লীগ অতীতের এসব কথা ভুলে বিএনপির সমালোচনা করে তখন কিছুটা হলেও হাস্যরসের উদ্রেক হয়।

ঊনসত্তরের ১১ দফা আন্দোলন গোটা পূর্ব পাকিস্তানকে উত্তাল করে দিয়েছিল। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যে আইয়ুব খান তার দশ বছরের শাসনকে আরও দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিলেন, তা তিন মাসের আন্দোলনে ভেঙে পড়ে। ১৯৬৮ সালের অক্টোবর মাসে আইয়ুব খান উন্নয়ন দশক উদযাপনের যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, সে কর্মসূচির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায় ছাত্রদের কারণে। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ক’টি নন্দিত নির্মাণের কাজ হয়েছিল, তা দৃষ্টিনন্দন হলেও ছাত্রদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। উপরিকাঠামোর উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে ছাত্ররা আইয়ুবের পতনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং সফলও হয়েছিল। আইয়ুবের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরার জন্য তখন বিভিন্ন পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। দশকপূর্তি উপলক্ষে ১৯৬৮ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত ডন পত্রিকা একই সংখ্যায় আইয়ুব খানের ৬৮টি ছবি প্রকাশ করেছিল। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে উঠেছিল বিলবোর্ড ও ব্যানার। কিন্তু উন্নয়নের ফেরিওয়ালা স্বৈরশাসকের আত্মপ্রচার ও অনুগতদের তেল মর্দন যে শেষ রক্ষা করতে পারে না এ দেশে আইয়ুবি শাসন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আইয়ুবি শাসনামলে কনফিউসিয়াসের বাণী- একটি বাঘের চেয়েও একটি অত্যাচারী সরকার ভয়ংকর- এ কথা প্রমাণিত হয়েছিল।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় স্বৈরাচারের আবির্ভাব ঘটেছে। আবার এসব স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তরুণরাই রুখে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে বুদ্ধিজীবী সমাজের সংঘটিত ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছাত্ররাই পারে গণবিরোধী শাসনের অবসান ঘটাতে।

দীর্ঘ দশ বছর ধরে সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, পুঁজিবাদী ও সামন্ত স্বার্থের প্রত্যক্ষ সমর্থনে আইয়ুব খান রাষ্ট্রপরিচালনা করেন। এ শাসনের প্রয়োজনেই সেদিন ছাত্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনকে বিভিন্ন সময়ে চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে দমন করা হয়। ভূলুণ্ঠিত হয় সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। দলীয় ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী লাভ করে প্রশাসনিক আনুকূল্য। উলঙ্গ সরকারের প্রচারণার পরিণতি ছিল আইয়ুব খানের চিন্তাসংবলিত সবুজ বইয়ের প্রকাশ। শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতি শাসকশ্রেণীকে এক ধরনের আত্মসন্তুষ্টি এনে দিয়েছিল।

সুবর্ণজয়ন্তীর এসময়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে ১১ দফা আন্দোলনের প্রাপ্তি কী? প্রাপ্তির তালিকাটা স্বল্পমেয়াদে খুবই ছোট। আন্দোলনের পরিণতিতে আইয়ুব খান ক্ষমতা থেকে সরে গিয়েছিলেন আরেকজন সেনাশাসকের হাতে ক্ষমতা দিয়ে। এছাড়া আগরতলা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন শেখ মুজিব এবং ছাত্রলীগের একক সিদ্ধান্তে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ভূষিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু উপাধিতে। সেই আন্দোলনের একটি মধ্যবর্তী বিষয় ছিল ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় হলেও গণতন্ত্র আবারও পতিত হয়েছিল অন্ধকারে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে যুদ্ধে যেতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে; কিন্তু যুদ্ধের শেষে দেখা গেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল না।

এসব ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ যে পরিবর্তন আসেনি আজকের বাংলাদেশের মানুষ তা উপলব্ধি করেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে না দেয়া। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে এখন এটা পরিষ্কার যে, আগের রাতেই ব্যালট বাক্স পরিপূর্ণ হয়েছে। ক্ষমতাসীন ১৪ দলের অঙ্গ দল জাসদ পর্যন্ত এখন এ বিষয়টিকে স্বীকার করে দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে। দলটি বলছে, কিছু উৎসাহী ব্যক্তিই এ কাণ্ড ঘটিয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অথচ ক’দিন আগেও জাসদ নেতারা আস্ফালনের সঙ্গে অন্যের সমালোচনা করেছেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারি দলের সদস্যরাও ভোটাধিকার প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন। শাসকরা বুঝতে পারছেন না তারা এর ফলে দেশকে কনফ্রন্টেশন ও বিভাজনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে গোটা দেশজুড়ে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে ভীতির পর্দা। এ নির্বাচনে একটি দল নয়, গোটা বাংলাদেশের মানুষ পরাজিত হয়েছে। আজকে যারা বিশ ঊর্ধ্ব বয়সের মানুষ তারা চোখের সামনে দেখেছেন কীভাবে ভোটাধিকার লুণ্ঠিত হয়, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের প্রত্যাশাকে পদদলিত করা হয়।

আইয়ুবি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের সময় যে বিষয়টি জরুরিভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, তা হচ্ছে মানুষের মনের মধ্যে যে ক্ষোভ থাকে শাসকরা তা দেখতে পায় না বা তার তীব্রতা উপলব্ধি করতে পারে না। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত আইয়ুব খান নিজেও বুঝতে পারেননি এত দ্রুত তার শাসনের অবসান ঘটবে। রাজনীতিতে অনেক ঘটনা আচম্বিতে ঘটে যায়। যেমন এখন ঘটছে ভেনিজুয়েলায়। সেখানে এখন দু’জন প্রেসিডেন্ট, একজন সরকারদলীয় অন্যজন বিরোধীদলীয়। এক সময় মনে করা হতো ভেনিজুয়েলায় নতুন সমাজতন্ত্র তৈরি হবে; কিন্তু হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে।

বর্তমান পৃথিবীতে অনেক রাজনীতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন নতুন নতুন চেহারা নিয়ে সামনে আসছে। এর আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে কম্বোডিয়া। যেখানে হুন সেনের দল বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সংসদে একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। হুন সেন অবশ্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম।

ভাষা আন্দোলনের এ মাসে এ বিষয়টি উপলদ্ধি করা প্রয়োজন। অবশ্য সেটা অনেকেই উপলব্ধি করতে চান না। ভাষা আন্দোলনও ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, কথা বলার স্বাধীনতার আন্দোলন। অথচ এ ফেব্রুয়ারির বইমেলায় পুলিশ যখন সেন্সরের ভূমিকা পালন করে, ভিন্নমতের লেখকদের বই প্রকাশের দায়ে কোনো কোনো প্রকাশককে কালো তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা চলে, তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। এতকিছু বলার কারণ হচ্ছে, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়ে সাফল্য অর্জন করেছে। মানুষের মন যখন কোনো সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়, তখন জনগণ নিজেরাই নিজেদের মুক্ত করে।

মাহফুজ উল্লাহ : শিক্ষক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×