কিছুমিছু

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আবেদন বিফলে গেছে...

  মোকাম্মেল হোসেন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আবেদন বিফলে গেছে...
ফাইল ছবি

খুবই জরুরি একটা কাজে বাজারে যাচ্ছিলেন মন্তাজ আলী। এসময় ইদ্রিসের বউ দরিয়া বেগম রাস্তা আগলে দাঁড়াল। দরিয়া বেগমের কোলে দুই-আড়াই বছরের পুইচ্ছা এক শিশুসন্তান। পুইচ্ছার বামকানের ভেতর থেকে পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধে কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দায়।

মন্তাজ আলী নাক-মুখ চেপে এ দুর্গন্ধ সহ্য করার প্রয়াস চালাতেই দেখতে পেলেন- পুইচ্ছা মিয়ার শরীরে এটাই একমাত্র গড়াগড়ির বস্তু নয়; তার নাকের দুই ছিদ্র দিয়েও মাশআল্লাহ জিগারের আঠার মতো সর্দির অবিরল ধারা নিুমুখী হচ্ছে।

নাসারন্ধ্র থেকে গড়িয়ে পড়া সর্দিধারা নিয়ে পুইচ্ছা জবর একটা খেলা দেখাল। সর্দিধারা তার ঠোটের ওপর পৌঁছামাত্র পোকাখেকো টিকটিকির ন্যয় জিহ্বা দিয়ে সে তা মুখের ভেতরে টেনে নিল।

মন্তাজ আলীর বিরক্ত হওয়া উচিত। তিনি বিরক্ত হলেন না। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে তিনি ডাব্বা মেরেছেন।

পরের নির্বাচনে ডাব্বা এড়াতে হলে এখন থেকেই বাগানের ফলদ বৃক্ষের পরিচর্যার মতোই ভোটের বাক্সে ফলদায়িনী এ নারী ভোটারের মন জুগিয়ে চলা অবশ্য কর্তব্য। পরিবেশ-পরিস্থিতির ভয়াবহতা নীরবে হজম করে দরিয়া বেগমের কাছে মন্তাজ আলী জানতে চাইলেন-

: কী হইছে!

: ইস্রাফিলের আব্বারে পুলিশ ধইরা লইয়া গেছে।

ইস্রাফিলের আব্বা; তার মানে স্বয়ং ইদ্রিস মিয়া। মন্তাজ আলী খানিকটা অবাক হলেন। ইদ্রিস আলী সহজ-সরল খেটে খাওয়া মানুষ; পুলিশ বাহিনীর সালাম পাওয়ার মতো কোনো যোগ্যতা তার আছে বলে জানা নেই মন্তাজ আলীর। দরিয়া বেগম আচমকা বিলাপ জুড়ে দিল-

: আল্লাহর দোহাই লাগে; আপনে ইস্রাফিলের আব্বারে ছাড়াইয়া আইন্যা দেন।

কাঁদতে কাঁদতেই শাড়ির আঁচল থেকে কিছু টাকা বের করে দরিয়া বেগম মন্তাজ আলীর হাতে গুঁজে দিল। মন্তাজ আলী অভিভূত হলেন। বিদ্যাহীন এ নারীর জ্ঞানের জগৎ সীমাবদ্ধ হওয়ার কথা। দেশ-বিদেশের বিস্ময়কর পরিবর্তন, আলোড়ন সম্পর্কে সে হয়তো কোনো খোঁজ-খবরই রাখে না। অথচ কারও শরীরের ওপর পুলিশ বাহাদুরের ছায়া পড়লে যে টাকা খরচ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই, এ জ্ঞান সে ঠিকই আয়ত্ত্ব করে ফেলেছে। মন্তাজ আলী মনে মনে বললেন-

: আশ্চর্য হইলাম!

টাকাগুলো পকেটে রেখে দরিয়া বেগমের কাছে মন্তাজ আলী জানতে চাইলেন-

: ইদ্রিসরে পুলিশ কীজন্য ধরছে?

কান্নাজড়িত কণ্ঠে দরিয়া বেগম বলল-

: এইটা তো আমারও জিজ্ঞাসা!

অভ্যাসবশত বারকয়েক মাথা ঝাঁকালেন মন্তাজ আলী। তারপর দরিয়া বেগমের উদ্দেশে বললেন-

: ঘটনার বর্ণনা দেও।

: সকালবেলা ঘুম থেইকা উইঠা ইস্রাফিলের বাপ কইল-

: শইলডার মধ্যে জুৎ পাইতেছি না; আইজ আর কামে যামু না।

আমি কইলাম-

: আইচ্ছা।

হেরপর নায়-নাস্তা খাইয়া কইল-

: উত্তরপাড়ার নেকবইরা টেকা কর্জ নিছিল; আইজ দেওনের তারিখ। যাইয়া দেহি, দেয় কিনা? আমি কইলাম-

: আইচ্ছা। এর দুই-আড়াই ঘন্টা বাদে আচমকা খবর পাইলাম, পুলিশ তারে ধইরা থানায় লইয়া গেছে।

দরিয়া বেগম যেটাকে থানা বলে অভিহিত করল, সেটি আদতে থানা নয়; পুলিশ ফাঁড়ি। ময়মনসিংহ শহর থেকে বত্রিশ কিলোমিটার দূরে বসবাসরত মানুষজনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বিপরীতে অষ্টধার বাজারে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করেছেন কর্তৃপক্ষ। মন্তাজ আলী নিজের কাজ শেষ করে ফাঁড়িতে গেলেন। ফাঁড়ির বারান্দায় একটা খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে ইদ্রিস মিয়াকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ইদ্রিস মিয়ার কাছে প্রকৃত ঘটনা জানার পর ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন মন্তাজ আলী। এরপর বিনয়ের সঙ্গে বললেন-

: ছার, এই লোক তো নির্দোষ!

: কে?

: ওই যে, যারে খুঁটির সঙ্গে মুড়ন দিয়া বাইন্ধা রাখছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা মন্তাজ আলীর দিকে তেরছা চোখে তাকালেন। বললেন-

: নির্দোষ হওয়ার সার্টিফিকেট তারে কে দিল? আমেরিকা, না ইংল্যান্ড?

মন্তাজ আলী জবাব না দিয়ে নিশ্চুপ রইলেন। আগের কথার সূত্র ধরে পুলিশ কর্মকর্তা বললেন-

: আপনে জানেন, আমার ফোর্স জুয়ার আসর থেইকা তারে অ্যারেস্ট করছে!

: জুয়া না ছার; কাজ-কাম নাই, তাই কয়েকজন মিইলা তাস খেলতেছিল...

: কাজ-কাম নাই মানে? দেশে কি কাজের অভাব পড়ছে? ভিশন টু থাউজেন্ড টুয়েন্টি ওয়ানের ঘোষণা দিয়া আপাটে-ঘোপাটে কর্মসৃজন করা হইছে। দেশে-বিদেশে হাজার হাজার কাজের সুযোগ সৃষ্টি হইছে। সেদিকে মনোযোগ না দিয়া ওপেন পরিবেশে সড়কের পাশে তাসের আসর বসানো- এইটা তো ভয়ংকরতম অপরাধ।

কাচুমাচু করে মন্তাজ আলী বললেন-

: ছার! ইদ্রিস আলী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতেছিল। ওই পথ দিয়া গমন করার সময় তামাশা দেখার জন্য সে সাইডে দাঁড়ায়াছিল শুধু।

পুলিশ কর্মকর্তার জবরদস্ত গোফ। তিনি কিছুক্ষণ সেগুলো মুচড়ামুচড়ি করে বললেন-

: ক্রাইম যে করে আর ক্রাইম দেখে- দুইজনই সমান অপরাধী বটে! কোনো নছুফছু ব্যাটা এই কথা বলে নাই। এই কথা বলে গেছেন স্বয়ং রবীন্দ নাথ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় আছে?

: জি না ছার!

: গ্রেট রাইটার ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে মন্তাজ আলীর মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। তিনি মাখনের মতো গলে যেতে যেতে পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলেন-

: এখন করণীয় কী ছার!

: করণীয় একটাই। আগামীকাইল ভোরের ট্রেনে আসামীকে কোর্টে চালান কইরা দিব।

চালান শব্দটা মন্তাজ আলীর খুবই মনে ধরল। তিনি সময় নষ্ট না করে দরিয়া বেগমের দেয়া টাকাগুলো পুলিশ বাহাদুরের পকেটে চালান করে দিলেন। বাড়ি ফেরার সময় মন্তাজ আলীর মনমরা ভাব লক্ষ্য করে ইদ্রিস মিয়া জানতে চাইল-

: চাচা! কী ভাবতেছেন?

উত্তরে মন্তাজ আলী বললেন-

: অনেক কিছুই ভাবতেছি; কিন্তু কুনু তল খুঁইজ্যা পাইতেছি না! কয়েক দিন আগে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীর দাবি-দাওয়া পূরণ করার কথা উল্লেখ কইরা তাদের কাছে আবেদন রাখছিলেন- তারা যেন দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত না হয়। বড়ই আফসোসের বিষয়; আইজ দেখতে পাইলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আবেদন বিফলে গেছে...

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×