আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তলেবান
তলেবান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৬ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে শাসনক্ষমতা দখলের পর সে দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে কী বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল এটা সুবিদিত। এই তালেবানরা ইসলামের নাম নিয়ে রাজনীতি করলেও এরা হল আফগানিস্তানের চরম রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল মোল্লাতন্ত্রের স্বার্থরক্ষক ও প্রতিনিধি।

এদের নেতা মোল্লা ওমর ক্ষমতা দখল করার পর আফগানিস্তানে এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় ছিল এবং সেই সময়ে তারা আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ওপরও বেপরোয়া আক্রমণ করেছিল। বামিয়ানে তারা পৃথিবীর উচ্চতম দুটি বুদ্ধমূর্তি পর্যন্ত ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করেছিল, যা তখন সারা দুনিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল।

আধুনিকতা বলতে যা কিছু বোঝায়, তালেবানরা হল তারই শত্রু। আমেরিকানরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করার জন্য তালেবানদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু পরে আমেরিকানদের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

আমেরিকা মধ্য এশিয়া থেকে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে তেলের পাইপলাইন নিয়ে পাকিস্তানের করাচি বন্দরে আনার বিষয়ে যে প্রস্তাব করে, তালেবানরা তাতে সম্মত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমেরিকানরা আফগানিস্তানে তালেবান শাসন উচ্ছেদ করে সেখানে তাদের ওপর একের পর এক হামলা চালায় এবং সেখানে তাদের অনুগত সরকারকে ক্ষমতাসীন রেখেছে। কিন্তু আফগানিস্তানের বিস্তৃত গ্রাম অঞ্চলে তালেবানদের শক্তি নিহিত থাকায় এখন তালেবানরা যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে।

সরকার এতদিন আমেরিকার সামরিক শক্তির জোরে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রেখেছে। কিন্তু তাদের অবস্থা এখন খারাপ। তালেবানরা সেখানকার সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি অংশ নিজেদের অধীন করেছে এবং অতি শিগগির তারা কাবুল অধিকারের মতো শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে আসছে।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিনিদের নিজেদের দালাল সরকারকে টিকিয়ে রাখার মতো সামর্থ্য আর নেই এবং সেখান থেকে তারা সরে আসার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় তাদের দালাল সরকার উচ্ছেদ হলেও আফগানিস্তানের ওপর নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য তারা তাদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য উদগ্রীব হয়েছে।

এ জন্য তারা দফায় দফায় তালেবানদের সঙ্গে বৈঠক করে একটা সমঝোতার যে চেষ্টা করছে তার জন্য তারা আলোচনায় বসছে। কয়েক দিন আগে এ উদ্দেশ্যে তারা কাতারের দোহায় দীর্ঘ আলোচনায় সাড়ে ১৮ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করার জন্য এক সমঝোতায় উপনীত হয়েছে।

লক্ষ করার বিষয়, এ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না এবং তাদেরকে বাদ দিয়েই আমেরিকানরা এই সমঝোতায় উপনীত হয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায়, বর্তমান আফগান সরকারের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই। তারা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে আমেরিকানদের ওপর সব বিষয়েই নির্ভরশীল।

রাশিয়াও এ অবস্থায় বসে নেই। তারাও মস্কোতে তালেবান এবং সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের অবস্থান কিছুটা তৈরির চেষ্টা করছে। এদিক দিয়ে বলা চলে, সব ধরনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই এখন এটা উপলব্ধি করছে যে, বর্তমান আফগান সরকার সেখানকার শাসন পরিচালনার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে এবং কাবুলে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন এখন নিশ্চিত।

আফগানিস্তান একদিক দিয়ে খুব ব্যতিক্রমী দেশ। রাজধানী কাবুল এবং সে দেশের বিস্তৃত গ্রামাঞ্চলের সংস্কৃতির মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায় সেটা প্রায় বিচ্ছিন্নতার সমান। গ্রামাঞ্চলে মোল্লাতন্ত্রের এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির যে প্রবল আধিপত্য ও প্রতাপ, সেটা কাবুলে নেই। এদিক দিয়ে কাবুল একটা দ্বীপসদৃশ আধুনিক শহর। এই আধুনিকতার একটা বড় নিদর্শন সেখানে নারীদের স্বাধীনতা। এটা কোনো নতুন কথা নয়।

গ্রামাঞ্চলের নারীদের কোনো শিক্ষাব্যবস্থা বা সামান্য স্বাধীনতা পর্যন্ত না থাকলেও অনেক আগে রাজা আমানুল্লাহ সেখানে আধুনিকতার প্রবর্তনের একটা চেষ্টা করেন। তিনি মেয়েদের জন্য স্কুল-কলেজ করেন, কাবুলে বোরকা পরা নিষিদ্ধ করেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বিদেশে পাঠান, মেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা করেন এবং এ ধরনের আরও অনেক কিছু করেন। তার স্ত্রী রানী সুরাইয়া ছিলেন একজন আধুনিক নারী। তিনি নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতার জন্য নানা উদ্যোগ নিজেও গ্রহণ করেন।

এখানে আফগানিস্তানে নারীদের অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানকার নারীদের মধ্যে এক মহা ত্রাসের সঞ্চার হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানদের সমঝোতার ফলে তাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তারা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়ার পর ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, আফগানিস্তানে তারা নারীদের স্কুল-কলেজ সব বন্ধ করবে।

তাদেরকে কোনো চাকরি করতে দেয়া হবে না এবং তাদের বাইরে ঘোরাফেরাও বন্ধ করতে হবে। কোনো প্রয়োজনে তাদের বাইরে যেতে হলে সঙ্গে তাদের পরিবারের পুরুষ কোনো সদস্যকে থাকতে হবে। একাকী তাদের কাউকেই বাইরে বের হতে দেয়া যাবে না। মোল্লা ওমরের সময়েও মেয়েদের বাইরে কাজ করা নিষিদ্ধ ছিল। বর্তমানে পার্লামেন্টের সদস্য এক নারী তখন ছিলেন এক স্কুলের প্রধান শিক্ষয়েত্রী।

তালেবানরা হুকুম করে, তিনি আর সেই চাকরি করতে পারবেন না। কিন্তু তিনি অনুমতি চান যে বোরকা পরেই তিনি তার কাজ করে যেতে চান। এতে তারা সম্মত হয়। কিন্তু একদিন এক বাজারে তার পায়ের কাপড় কিছুটা আলগা হয়ে তার পা দেখা গেলে বাজারে উপস্থিত একজন তালেবান পুলিশ তাকে এমনভাবে চাবুক মারতে থাকে যে এতে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। এই ছিল তখনকার অবস্থা।

পরে নারীদের সব স্কুল-কলেজ বন্ধ করা হয়। নারীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত শুরু হয় এবং কোনো আত্মীয়-স্বজন সঙ্গে না নিয়ে তাদের বাইরে আসা নিষিদ্ধ হয়। ২০০১ সালে তালেবানদের উৎখাতের পর বিগত ১৮ বছরে নারীরা এ দুরবস্থা থেকে উদ্ধার লাভ করে এখন শিক্ষাদীক্ষা, চাকরি ইত্যাদিতে অনেক উন্নতি করেছেন। সমাজের অনেক ধরনের কাজের সঙ্গে তারা সম্পর্কিত।

কিন্তু তালেবানরা প্রত্যাবর্তন করলে আবার তাদেরকে জোর করে ২০০১ সালের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যেতে হবে। এই চিন্তায় তারা এখন অস্থির আছেন। তাদের মধ্যে এক ত্রাসের সঞ্চার হয়েছে এবং তারা নানাভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন এবং দাবি জানাচ্ছেন যাতে তাদের অর্জিত অধিকার কোনোমতেই নতুন করে খর্ব করা না হয়। তাদের কথা হল, তাদেরকে কোনোমতেই যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা না হয়।

‘আফগান উইমেন্স নেটওয়ার্ক’ নামে আফগানিস্তানের একটি প্রভাবশালী নারী সংগঠন এরই মধ্যে এক বিবৃতিতে বলেছে, বর্তমানে তালেবানদের শাসনক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের যে আলোচনা হচ্ছে, সেই আলোচনায় যেন নারীদের রাজনৈতিক স্বার্থে বলি দেয়া না হয়, এদিকে আলোচনাকারীরা যেন খেয়াল রাখেন।

বিশেষত মস্কোয় তালেবান এবং অন্য বিরোধী আফগানদের সঙ্গে রাশিয়ার যে আলোচনা হচ্ছে, সেখানে তারা এ বিষয়ে খেয়াল রাখার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। মস্কোয় তালেবানদের সঙ্গে যে আলোচনা হচ্ছে, সেটা দোহায় আমেরিকানদের সঙ্গে তালেবানদের যে আলোচনা হচ্ছে তার থেকে পৃথক।

মস্কোর এ আলোচনায়ও আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারের কোনো উপস্থিতি নেই। এ জন্য তাদের পক্ষ থেকে এসব সমঝোতা বৈঠকের বিরুদ্ধে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু অক্ষমের প্রতিবাদের কি-ই বা মূল্য আছে?

যদি আমেরিকা বা রাশিয়া তার সরকারকে গণনাযোগ্য কোনো শক্তি মনে করত তাহলে তারা নিশ্চয়ই তাদেরকে আলোচনায় শরিক করত। এ অবস্থায় তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকান ও রাশিয়ানরা যে সমঝোতা আলোচনা করছে, সেটাই আফগানিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

এদিক দিয়ে বলা চলে যে, অল্পদিনের মধ্যেই কাবুলে আশরাফ গনির সরকারের পতন নিশ্চিত এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের নতুন করে প্রত্যাবর্তন ও শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া অবধারিত।

১১.০২.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×