তৃতীয় মত

পঞ্চাশের অবশিষ্ট নক্ষত্রের একজন চলে গেলেন

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চাশের অবশিষ্ট নক্ষত্রের একজন চলে গেলেন
কবি আল মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত

কবি আল মাহমুদ আর নেই। লন্ডনের বাড়িতে শনিবার যখন খবরটা পেলাম, তখন আমি লিখতে বসেছি, ভাষা আন্দোলন নিয়ে। প্রথমে ভেবেছি, ভাষা নিয়ে লেখাটা বন্ধ করি। আল মাহমুদকে শ্রদ্ধা জানাই। পরে মনে হল আল মাহমুদ যে ভাষার একজন প্রধান কবি, সেই ভাষার আন্দোলন নিয়ে লেখাটা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। আল মাহমুদকে নিয়ে লিখব, তবে শোকটা একটু থিতু হোক।

শোকটা থিতু হয়নি। দীর্ঘদিনের অদর্শনে আল মাহমুদ স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুতে আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। ৮২ বছর বয়সে মৃত্যু অবশ্যই পরিণত বয়সের মৃত্যু। কিন্তু প্রকৃত কবিরা কখনও মনের বার্ধক্যে পৌঁছেন না। আল মাহমুদও পৌঁছেননি। তার সাম্প্রতিককালের কবিতা, উপন্যাস পড়েও মনে হতো না কবি বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। তিনি নিজে বলতেন তার অসুস্থতার কথা, বার্ধক্যের কথা। কিন্তু তার কলমে তার পরিচয় পাওয়া যেত না। সেজন্যই তার মৃত্যুতে শোকাভিভূত হয়েছি। এতটা শোক পাওয়ার আরও বড় কারণ, রাজনৈতিক মতানৈক্য সত্ত্বেও আল মাহমুদ ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠজন, প্রিয় কবি।

আল মাহমুদ ছিলেন পঞ্চাশের নক্ষত্র। এই নক্ষত্রগুলোর অধিকাংশই ধীরে ধীরে কালের অতলে হারিয়ে গেছেন। হারায়নি তাদের মেধা ও প্রতিভার প্রখর দ্যুতি। তাদের শেষ দু’জনের মধ্যে শহীদ কাদরী কিছুদিন আগে চলে গেছেন। এখন গেলেন আল মাহমুদ। আমি নিজেও পঞ্চাশের দশকের লেখক। নিজের চোখের সামনেই একটা সবচেয়ে সৃষ্টিশীল যুগের অবসান প্রত্যক্ষ করছি।

যুগের অবসান হয়। কিন্তু অবসান হয় না সেই সৃষ্টিশীল যুগের সৃষ্টি ও কীর্তির। তাই অবিভক্ত বাংলার ত্রিশের দশক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি পালাবদলের যুগ হিসেবে এখনও ইতিহাসে জাগ্রত। কবি বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, গোলাম কুদ্দুস, জীবনানন্দ দাশ- এই নামগুলো বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও কি কেউ ভুলে যাবে?

ত্রিশের দশকের প্রভাব চল্লিশের দশককে ছুঁয়ে দেশভাগ সত্ত্বেও পদ্মা পাড়ি দিয়ে এপার বাংলায় উজ্জ্বলতম পঞ্চাশের দশকটি সৃষ্টি করেছিল সে কথা কি আমরা অস্বীকার করব? রবীন্দ্র-নজরুল যুগের সীমানা ডিঙিয়ে ঢাকার বাংলা কবিতায় আধুনিকতার নতুন বাতি জ্বেলেছিলেন কবি ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন এবং তাদের স্পর্শে আরও উজ্জ্বল পঞ্চাশের দশক তৈরি হয়েছিল- এ কথা চিরকাল আমাদের স্মরণে থাকবে।

এই পঞ্চাশের দশকেরই কবি চূড়ামণি ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। এই দশকের আকাশজুড়ে আছে আরও নক্ষত্র। আলাউদ্দীন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, ওমর আলী, আল মাহমুদ প্রমুখ। তবে প্রধান কবি হিসেবে শামসুর রাহমানের নামটি উচ্চারিত হওয়ার পরই যে দ্বিতীয় নামটি মনে অবশ্যই আসবে তা আল মাহমুদের। শামসুর রাহমানের মতো আল মাহমুদও দুই বাংলাতেই পরিচিত ও পঠিত।

কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদের মধ্যে পার্থক্য, শামসুর রাহমান ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কবি। এই চেতনার বিরোধীরা তাকে ঘাতক পাঠিয়ে হত্যা করতে চেয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে। জাতি তার মাথায় প্রধান কবির শিরোপা পরিয়েছে। আল মাহমুদ প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কবি ছিলেন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগরে চলে গেলেও দেশের স্বাধীনতার পর কী করে ধীরে ধীরে জামায়াত ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভিড়ে গেলেন, তা আমার কাছে এক বিস্ময়। মানুষ হিসেবে তার এই বিচ্যুতির জন্য কবি হিসেবে তার যে বিরাট কাব্যকৃতি, তার যথোচিত সরকারি স্বীকৃতি হয়তো মৃত্যুর সময় পেলেন না। এটা পাওয়ার তার অধিকার ছিল।

আল মাহমুদ অসাধারণ শক্তিশালী কবি ছিলেন, ‘সোনালী কাবিন’ তার প্রমাণ। আমি আজ তার কাব্যকৃতির মূল্যায়ন করতে কলম ধরিনি। সেটা তার অনুরাগী সমালোচকরা করবেন। আমার আজ কলম ধরার উদ্দেশ্য তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং তার সম্পর্কে নিজের কিছুটা স্মৃতিচারণ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় সম্ভবত পঞ্চাশের দশকের শেষের অথবা ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। আমি তখন মাসিক সওগাত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। রোজ বিকালে সওগাত অফিসে তখনকার তরুণদের আড্ডা বসে। আমরা আড্ডায় বসে রাজা-উজির মারি।

একদিন সওগাতের আড্ডায় বসে কবি শামসুর রাহমান ও কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে জোর আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ দু’জন তরুণ এসে হাজির। বয়সে আমার চেয়ে তিন-চার বছরের ছোট হবে। মলিন বেশভুষা। একজনের নাম ওমর আলী, পাবনা থেকে এসেছেন। আরেকজনের নাম আল মাহমুদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন। দু’জনেই দুটি কবিতা বের করলেন। সওগাতে ছাপাতে চান। ওমর আলীর কবিতাটি মুনীর চৌধুরীকে এবং আল মাহমুদের কবিতাটি অধ্যাপক অজিত গুহকে নিবেদিত। তখনকার দিনের দারুণ প্রগতিশীল কবিতা।

তারা দু’জনেই দু’জনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সদ্য ঢাকায় এসেছেন। ইচ্ছা, স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাসের। হাসান ও শামসুর রাহমানের সঙ্গে দু’জনের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। শামসুর রাহমান দু’জনের কবিতারই প্রশংসা করলেন। দু’জনের কবিতা সে মাসেই সওগাতে ছেপে দিয়েছিলাম। সেই থেকে দুই কবি বন্ধু- বিশেষ করে আল মাহমুদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার শুরু। হাসান হাফিজুর রহমান নিজে ছিলেন আধুনিক কবি এবং কবিতার ক্রিটিক। সওগাতের ওই আড্ডায় বসেই তিনি বলেছিলেন, আল মাহমুদ বড় মাপের কবি হবেন। তার মধ্যে রয়েছে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার সমন্বয়।

হাসান হাফিজুর রহমানের কথা সত্য হয়েছে। আল মাহমুদ কিছুদিনের মধ্যেই পাঠকদের নজরকাড়া কবি হয়ে ওঠেন। তার কবিতায় রয়েছে আধুনিকতার সঙ্গে সারল্য। এই সারল্য কবিতার বক্তব্যের গভীরতাকে ক্ষুণ্ণ করেনি। একশ্রেণীর আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতা তার কবিতাকে আচ্ছন্ন করেনি। অতীতের ঐতিহ্য ও বর্তমানের প্রগতিশীল চেতনার মধ্যে তিনি একটা মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিলেন। ছিলেন তৎকালীন ঢাকার প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।

আল মাহমুদ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। একাত্তর সালেই কলকাতায় তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন তার কবিতা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে অগ্নিবর্ষী। এই কবিতাগুলোর কোনো সংকলন আমি দেখিনি। কলকাতায় পৌঁছার কিছুদিনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক কবিকুলের কাছে আল মাহমুদ পরম সমাদৃত হন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাকে ‘বাংলা ভাষার একজন শক্তিমান কবি’ বলে কলকাতার পত্রপত্রিকায় মন্তব্য করেন।

ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকের গোড়ার দিকেও আল মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া রাজনীতির সঙ্গে কোনো সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল না। সেই আল মাহমুদ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কী করে উগ্র বাম জাসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এবং তাদের দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক হন, তা আমার জানা ছিল না। উগ্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য শিগগিরই জাসদ (অবিভক্ত) সরকারের রোষে পড়ে এবং জাসদের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আল মাহমুদ গ্রেফতার হন।

আল মাহমুদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা জানতেন। তিনি জেলে বসে আমাকে ১৮ পৃষ্ঠার এক চিঠি লেখেন। তাতে তিনি জেলে থাকায় তার পরিবারের দুঃখ-কষ্টের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমি চিঠিটা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই। বঙ্গবন্ধু চিঠিটা পড়ে ব্যথিত হন। আল মাহমুদ কারাগার থেকে মুক্তি পান।

এরপর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বিলাতে চলে আসি। আল মাহমুদের সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না। ইত্যবসরে তিনি কেমন করে চরম বাম থেকে চরম ডানে মোড় নিয়েছেন, জামায়াতিদের খপ্পরে পড়েছেন তা আমার জানা ছিল না। তার কবিতায় কবি ফররুখ আহমদের কবিতার মতো ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের প্রতি আকর্ষণ ও আনুগত্য পরবর্তীকালে ছাপ ফেলেছিল, যা কখনও কবিতার শিল্পরস ও আবেদনকে ক্ষুণœ করেনি। জামায়াতিরা তাকে তাদের কালচারাল ফ্রন্টের নেতা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে, তাতে কবি আল মাহমুদের কোনো লাভ হয়নি, বরং ক্ষতি হয়েছে।

ইউরোপের ফ্যাসিবাদ এবং হিটলার-মুসোলিনির অভ্যুত্থানকালে বিখ্যাত কবি এজরা পাউন্ড এবং বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ন্যুট হামসুন ফ্যাসিবাদকে সমর্থনদানের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এজন্য তৎকালীন ইউরোপীয় সরকারগুলো তাদের যথেষ্ট হেনস্থা করেছে, কিন্তু বিরাট প্রতিভাশালী কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে তাদের অবদান অস্বীকার করেনি, তাদের মর্যাদা কেড়ে নেয়নি। বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত আল মাহমুদের শেষ বয়সের রাজনীতিকে নয়, তার অসাধারণ কাব্য প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেয়া এবং সম্মান জানানো। আল মাহমুদ আমার বয়সে ছোট। তবু তাকে আমার শেষ শ্রদ্ধা জানাই।

লন্ডন, ১৭ ফেব্রুয়ারি, রোববার, ২০১৯

ঘটনাপ্রবাহ : ক‌বি আল মাহমু‌দ আর নেই

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×