ইয়েমেনে সৌদি-মার্কিন যুদ্ধ জোটের ধ্বংসযজ্ঞ

  বদরুদ্দীন উমর ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৌদি-মার্কিন
সৌদি-মার্কিন। ফাইল ছবি

তিন বছর ধরে সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইয়েমেনের ওপর তাদের সামরিক হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের এই সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে পরে সরাসরি শরিক হয়েছে ইউনাইটেড আরব আমিরাত (ইউএই)।

তিন কোটি লোকের বসবাস এই ছোট দেশটির ওপর এ হামলা চালিয়ে এই সাম্রাজ্যবাদীরা সেখানে লাখ লাখ লোককে হতাহত করেছে, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা হল এক লাখের বেশি। শুধু খাদ্যাভাব ও পুষ্টির অভাবেই সেখানে মৃত্যু হয়েছে ৮৫ হাজার শিশুর। এসব হিসাব জাতিসংঘের।

সৌদি আরবের তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং তাদের প্রেসিডেন্টকে দেশ ছেড়ে সৌদিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে হুথিরা সেখানে ক্ষমতা দখল করেছে। হুথিদের নেতা আবদুল মালেক হুথি সেখানে সরকারপ্রধান হিসেবে রাজধানী সানায় নিজেদের অবস্থান খুব দৃঢ়ভাবে রক্ষা করছেন।

লক্ষ করার বিষয় যে, ইয়েমেনে যৌথভাবে সামরিক আক্রমণ চালিয়ে বছরের পর বছর সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ করে যাওয়া সত্ত্বেও হুথিদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। শুধু তা-ই নয়, এই দীর্ঘদিন সামরিক হামলা চালানোর পর সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা এখন উপলব্ধি করেছে যে, ইয়েমেন সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান সম্ভব নয়। এ কারণে তারা রাজনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব করেছে।

গত ডিসেম্বরে সেই আলোচনা হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। উপরন্তু সৌদি আরব বর্তমানে ইয়েমেনের সব থেকে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হোদায়দায় আক্রমণ করে সেটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

সাম্রাজ্যবাদীরা যেমন করে থাকে, ইয়েমেনে তা-ই করছে। তারা সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে আথবা হামলা চালিয়ে একই সঙ্গে দেশের মধ্যে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় যাতে দেশের লোক প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যায়। তাদের এ তৎপরতার মূল লক্ষ্য দেশে খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি সৃষ্টি করা।

এ কাজটি যুক্তরাষ্ট্র এক প্রতিষ্ঠিত লাইন অনুযায়ী সব জায়গাতেই করে থাকে। এ কাজ তারা কিউবায় করে ব্যর্থ হয়েছিল, এখন তারা ভেনিজুয়েলায় করছে এবং ইয়েমেনেও তাদের এ ভূমিকা এখন জারি আছে। হোদায়দা এখন হল ইয়েমেনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর।

এ বন্দর দিয়ে ইয়েমেনের ৮০ শতাংশেরও বেশি পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। কয়েক মাস ধরে সৌদি বিমানবাহিনী হোদায়দা বন্দরের ওপর ক্রমাগত বোমাবর্ষণ করে সেটিকে অকেজো করার চেষ্টা করছে, যাতে ইয়েমেনে কোনো খাদ্যদ্রব্য প্রবেশ করতে না পারে। ইয়েমেন বরাবরই একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ।

সেখানে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হয়। এখন হোদায়দা বন্দর অকেজো করে তারা ইয়েমেনে খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বিপুল ঘাটতি সৃষ্টি করে সেখানে সরকারের জন্য সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, এসব সত্ত্বেও তারা ইয়েমেনে জয়ের কোনো সম্ভাবনা দেখছে না।

তারা একটা সমঝোতার চেষ্টা এখন করছে। এজন্য শুধু জাতিসংঘ নয়, সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র সরবরাহকারী ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইয়েমেনে বিমান হামলা বন্ধের জন্য সৌদি আরবকে বলছে।

জার্মানি ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, ইয়েমেনে তারা আর কোনো অস্ত্র বিক্রি করবে না। কিন্তু এটা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই যে, এসব সত্ত্বেও পাশ্চাত্য দেশগুলো সৌদি আরবের ওপর এমন কোনো চাপ সৃষ্টি করছে না যাতে তারা ইয়েমেনে বোমা হামলা বন্ধ করতে পারে।

হোদায়দা সমুদ্রবন্দরের ওপর সৌদি বিমান আক্রমণ যেভাবে চলছে, তা সত্ত্বেও এখনও বন্দরটি সরকারের হাতেই শক্তভাবে আছে। কিন্তু এ আক্রমণ ইয়েমেনকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সৌদিদের বক্তব্য হল, ইরানিরা এ বন্দর দিয়ে ইয়েমেনে অস্ত্র সাহায্য করছে।

প্রথম কথা হল, ইরানিরা ইয়েমেনকে তাদের নিজেদের দেশ রক্ষার জন্য যদি সাহায্য করে থাকে তাতে দোষ কী? ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, ইউএই যদি সৌদি আরবকে ইয়েমেনে হামলার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করলে দোষ না হয়, তাহলে ইরান ইয়েমেনে সাহায্য করলে তাতে দোষ কোথায়? কিন্তু এখানে অন্য প্রশ্ন আছে।

সৌদি আরব এই অজুহাতে হোদায়দা বন্দরে আক্রমণ চালাচ্ছে যে, ইরান এই বন্দর দিয়ে ইয়েমেনে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। কিন্তু আসল ব্যাপার এই যে, সৌদি, মার্কিন ও ফরাসি সামরিক বাহিনী ইয়েমেনের উপকূলে চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছে। তার ফাঁক দিয়ে কোনো ইরানি জাহাজের পক্ষে অস্ত্র কেন, খাদ্য অথবা কোনো পণ্য নিয়ে হোদায়দা বন্দরে ঢোকাই অসম্ভব।

তাছাড়া এখন পর্যন্ত এ কাজ করতে গিয়ে কোনো ইরানি জাহাজ বা ইরানি সামরিক অফিসারই সৌদি বা অন্যদের হাতে ধরা পড়েনি। এসব থেকেই প্রমাণিত হয়, সৌদি আরব এক সম্পূর্ণ মিথ্যা অজুহাতে ইয়েমেনের হোদায়দা সমুদ্রবন্দরের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সেটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এর মূল উদ্দেশ্য ইরানি সরবরাহ বন্ধ করা নয়, ইয়েমেনে অন্যসব দেশের সরবরাহ বন্ধ করা এবং দেশে খাদ্য থেকে নিয়ে সব ধরনের জরুরি জিনিসের ব্যাপক অভাব ঘটানো।

তিন কোটি লোকের ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের সব থেকে দরিদ্র দেশ। সৌদি আরব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে অবরোধ সৃষ্টি করে যে অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করেছে, তাতে সেখানে এক মানবিক সংকট অনেক দিন থেকেই তৈরি হয়েছে।

সেখানে প্রায় এক স্থায়ী খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ায় হাজার হাজার লোক নিয়মিতভাবে মারা যাচ্ছে এবং সাধারণ বয়স্ক লোকদের থেকে শিশুরাই হচ্ছে এর সব থেকে বড় শিকার। ভেনিজুয়েলায় যেমন ঘেরাও ও অবরোধের কারণে সেখানে পণ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়েছে ঠিক, তেমনি ইয়েমেনে প্রতিটি জিনিসের দাম শত শত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তা সত্ত্বেও এটা বলা দরকার যে, ইয়েমেনে এখনও আবদুল মালেক হুথির সরকার রাজধানী সানায় খুব দৃঢ় অবস্থানে আছে এবং হোদায়দা বন্দর বিপজ্জনক হামলার মুখেও তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এই পরিস্থিতি অগ্রাহ্য করার মতো নয়।

সৌদি আরবে এখন সব থেকে বড় বিতর্কিত ব্যক্তি হচ্ছেন সেখানকার ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ সালমান। তিনিই ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করেন এবং এখন পর্যন্ত এই হামলা অব্যাহত আছে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে সৌদি সাংবাদিক খাসোগিকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যেভাবে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে দুনিয়ায় তোলপাড় হচ্ছে।

এ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরাও তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। খাসোগি ছিলেন প্রিন্স সালমানের এক বড় সমালোচক। মত্যুর আগে ওয়াশিংটন পোস্টে তিনি এক প্রবন্ধ লিখেছিলেন সৌদি আরবের উচিত এ মুহূর্তে ইয়েমেনের ওপর সামরিক হামলা বন্ধ করা। যত বেশি এ হামলা চলবে, তত বেশি ইয়েমেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এজন্য তিনি বিশেষ করে প্রিন্স সালমানকে এই হামলা বন্ধের জন্য বলেন। ইয়েমেনে প্রিন্স সালমানের সামরিক হামলা চালানোর সমালোচনাই যে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের কারণ, এতে সন্দেহ নেই।

এই হত্যাকাণ্ড সারা দুনিয়ায় যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তাতে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতম মিত্র ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইয়েমেন আক্রমণ বন্ধ করার জন্য সৌদি আরবকে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, এ পরামর্শ দিলেও তারা সৌদি আরবকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেনি। একমাত্র জার্মানি জানিয়েছে, তারা এরপর আর সৌদি আরবে কোনো সামরিক অস্ত্র বিক্রি করবে না।

সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতম সহযোগী শুধু নয়, এক ধরনের প্রভু এতে সন্দেহ নেই। ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদিকে লেলিয়ে দিয়ে তারা এখন খুব স্বস্তিতে নেই। তারাও সৌদিকে পরমার্শ দিচ্ছে ইয়েমেনে, বিশেষ করে হোদায়দা বন্দরে হামলা বন্ধের জন্য।

এক্ষেত্রে নামমাত্র বিরোধিতা দেখিয়ে তারা আকাশ থেকে আকাশে সৌদি বিমান বাহিনীকে তেল সরবরাহ বন্ধ করেছে। কিন্তু তার ফলে বিশেষ কোনো কাজ হচ্ছে না। কারণ সৌদি আরবে কোনো সামরিক সরবরাহ তারা বন্ধ করেনি।

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ সালমান নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ করে যাওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হচ্ছেন তার একজন মহামূল্যবান পৃষ্ঠপোষক। সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ক্রাউন প্রিন্সের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিরোধীরা আছে জনগণের মধ্য তো বটেই, এমনকি রাজপরিবারের মধ্যেও।

এক্ষেত্রে ভাবী বাদশাহ হিসেবে তার টিকে থাকার পেছনে শক্তির জোগান দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্পের এ অবস্থানের বিরোধিতা করে খোদ মার্কিন সিনেটের বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন প্রিন্স সালমানকে পরিত্যাগ করার জন্য।

খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর রিপাবলিকানদের মধ্যে এই বিরোধিতা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো লক্ষণই ট্রাম্পের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

ইয়েমেনের পরিস্থিতির অন্য একটি দিকও এখানে উল্লেখ করা দরকার। হুথিরা রাজধানী সানা এবং হোদায়দা বন্দরের ওপর দখল রেখে ইয়েমেনে প্রধান অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবে থাকলেও উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যে সমস্যা আছে। দক্ষিণে এডেন বন্দর হল বড় শহর এবং এককালীন ইয়েমেনের সব থেকে বড় বন্দর।

এখন সে বন্দর দক্ষিণের নিয়ন্ত্রণে। ইয়েমেনে যদি সাম্রাজ্যবাদী হামলা বন্ধ হয়ে সেক্ষেত্রে একটা শান্তি স্থাপিত হয়, তাহলেও ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি আসার সম্ভাবনা কম। কারণ ইউএই এবং অন্যরা দক্ষিণ ইয়েমেনকে উত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ইতিমধ্যে নানা ধরনের সাহায্য দিয়ে আসছে।

কাজেই ইয়েমেন সাম্রাজ্যবাদী হামলার হাত থেকে মুক্ত হলেও গৃহযুদ্ধের হাত থেকে মুক্ত হবে না। সেখানে শুরু হবে দক্ষিণ কর্তৃক উত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আরেক পরিস্থিতি।

১৮.০২.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×