শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাগবণ্টন ও সভাপতির সভা-ভাতা!

  বিমল সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি
ছবি-যুগান্তর

টাকা আর টাকা। এ যেন কেবল টাকারই খেলা। টাকার জন্য একশ্রেণীর মানুষ যেন একেবারে উন্মাদ হয়ে পড়েছেন; স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। টাকা ছাড়া আর কিছুই বুঝতে চান না তারা। টাকার পেছনে হন্যে হয়ে ছুটে চলেছেন তো চলেছেন।

টাকার নেশার ঘোরে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন। ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ চুলোয় যাক! কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি-বেসরকারি আমলা, শিক্ষক- সব যেন একাকার? ঠিক বোঝা যায় না এ প্রশ্নে কয়জনকে আলাদা করা যাবে।

সমাজের বিভিন্ন স্তরে, বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম ও অব্যবস্থার মাত্রাটা এত দ্রুত এমন পর্যায়ে এসে যাবে তা দুই-তিন দশক আগেও ছিল ভাবনার অতীত। আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতা এবং নানা দৈন্যের মাঝেও যার যার কর্মক্ষেত্রে কম-বেশি সবাই মোটামুটি একটি কমিটমেন্ট বজায় রেখে চলতেন। আর এখন? স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা; সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়- এ ব্যাপারে সবাই যেন ‘ভদ্রলোক’। মানে এক কথার লোক।

২.

ফেসবুক টাইমলাইনে চোখ রাখলে পর্দায় হঠাৎ হঠাৎ কত কিছুই না ভেসে উঠতে দেখা যায়। এসবের কোনো কোনোটি বিশ্বাসযোগ্য, আবার কোনো কোনোটিকে একেবারেই অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। ২০১৮ সালে উপজেলা পর্যায়ে একটি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর ওই কেন্দ্রের বাজেট অনুযায়ী পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানী বাবদ টাকা ভাগবণ্টন বিষয়ক একটি পোস্ট যে কাউকেই ভাবিয়ে তুলবে বলে মনে হয়।

ডিসি ১০ হাজার টাকা।

এসপি ১০ হাজার টাকা।

সিভিল সার্জন ৭ হাজার টাকা।

কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত চিকিৎসক ৫ হাজার টাকা।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ৫ হাজার টাকা।

ম্যাজিস্ট্রেট ৫ হাজার টাকা।

ট্যাগ কর্মকর্তা ৫ হাজার টাকা।

কেন্দ্র সচিব ৮ হাজার টাকা।

সহ কেন্দ্র সচিব সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

হল সুপার সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

বিশেষ কর্মকর্তা (তিনজন) সাড়ে ৭ হাজার টাকা।

অফিস সহায়ক (তিনজন) ৬ হাজার টাকা।

প্রতিটি ডিউটি বাবদ প্রত্যেক কক্ষ পরিদর্শক ১২০ টাকা করে।

৩.

এমন পরিস্থিতি বা ‘পাকাপাকি বন্দোবস্ত’ কেবল বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠান বা অঞ্চল নয়, বলতে গেলে গোটা দেশেরই চিত্র। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়- সবখানে এবং সর্বস্তরে। আর এমন ভাগবণ্টনের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে সময় সময় যে কী অবাঞ্ছিত ও অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে অনুমান করাটাও বোধকরি কঠিন কাজ।

মান-অভিমান তো রয়েছেই, কখনও কখনও ভীষণ টানাপোড়েন- শিক্ষকে শিক্ষকে, প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে, সরকারি কর্মকর্তা বা পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে। অনেক ক্ষেত্রে পানি ঘোলা হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত দফারফা। সংশ্লিষ্টদের কাছে পরীক্ষার ফরম পূরণ বাবদ আদায়ের টাকাটা একটি বড় আকর্ষণ।

যেহেতু পরীক্ষা অনুষ্ঠানে খরচাদির পর ওই টাকাটারই অবশিষ্টাংশ ভাগ-বিলি-বণ্টনের রেওয়াজ রয়েছে। এ কারণেই বোধকরি ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ওপর উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নির্লজ্জ ও বেপরোয়া অনেকেই তা লঙ্ঘন করে চলেছেন। এ নিয়ে কত হইচই, কতসব কাণ্ডকারখানা! টাকা অসৎ ও লোভাতুরকে কী না করতে পারে? অযোগ্য, অসৎ ও লোভাতুরকে পরীক্ষা কমিটির অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। দু’জনের কাজে অবলীলায় পাঁচ বা সাতজনকে লাগাতে পারে।

পাঠ্যবিষয় বা পত্র-কোর্স, সিলেবাস, সেশন এবং পরীক্ষাসংক্রান্ত বিধি-বিধান ও রীতি-নীতি সম্পর্কে সামান্য ধারণা না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত করতে পারে। একেকটি পাবলিক পরীক্ষায় স্থানে স্থানে সকালের পরীক্ষা বিকালে, নতুন সিলেবাসের স্থলে পুরনো সিলেবাসের প্রশ্ন, সময় বিভ্রাট, ওএমআর সিট ছেঁড়া নিয়ে সংকট- এই বিপত্তিগুলো সৃষ্টিই হয় মূলত এসব কারণে। মগজ ও হৃদয়ের কাজ কি সবসময় গা-গতর দিয়ে হয়, হতে পারে?

৪.

কিছুদিন আগে আমার প্রিয়ভাজন একজনের সঙ্গে আলাপ হল। তিনি উপজেলা নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। প্রসঙ্গক্রমে ওই অধ্যক্ষ মহোদয়ের কাছ থেকে জানা যায়, তার কলেজটিতে নিয়মিত কমিটি না থাকায় ২০১৮ সালে এডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

তিন মাসের মধ্যে এডহক কমিটির মোট ছয়টি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সভাপতি মহোদয়ের আহ্বানে মোটামুটিভাবে পনের দিন পরপর সবক’টি সভাই অনুষ্ঠিত হয়েছে জেলা সদরে ওই কর্মকর্তার চেম্বারে। একেকটি সভার দিনে অধ্যক্ষ অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ট্যাক্সি বা অন্য কোনো যানবাহনে চড়ে কলেজ থেকে ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরবর্তী জেলা সদরে যাওয়া-আসা করেছেন।

যার যার বাড়িঘর থেকে তৈরি হয়ে কলেজে এসে জড়ো হলে সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে সময়মতো সভার উদ্দেশে রওনা দেয়া, যাতায়াত খরচ, রাস্তায় ও জেলা শহরে সামান্য কিছু হলেও নিজেদের খানাপিনা খরচ (সরকারি অফিসে সভা চলাকালীন চা-নাস্তা খরচসহ)- এ সবকিছুর প্রতিই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রধান হিসেবে অধ্যক্ষকেই খেয়াল রাখতে হয়।

এসব খরচপাতি এবং পদে পদে বিড়ম্বনা তো রয়েছেই। উল্লিখিত অধ্যক্ষ মহোদয়ের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে ওই সরকারি কর্মকর্তা প্রতিটি সভার পর তার কাছ থেকে ‘সভাপতির সভা-ভাতা’ হিসেবে তিন হাজার টাকা করে গ্রহণ করেছেন।

তিন মাস সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এডহক কমিটির মোট ছয়টি সভা বাবদ তার নিজ হাতে গ্রহণ করা ‘সভাপতির সভা-ভাতার’ মোট পরিমাণ ঠিক ১৮ হাজার টাকা।

সময় বদলেছে। দু-দশটি নয়, দেশে এখন শত শত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে, এমনকি মফস্বল এলাকা থেকেও। ডজন ডজন টেলিভিশন চ্যানেল। আরও রয়েছে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ সবকিছু সত্ত্বেও সব খবর বা অনেক খবরই সাধারণের গোচরে আসে না।

লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। আশি ও নব্বইয়ের দশকে কখনও কখনও পরীক্ষা কমিটির হয়ে বা গভর্নিং বডিতে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে আমারও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। পরীক্ষার টাকা ভাগবণ্টন বা ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে আজকাল যা দেখি ও শুনি তা আমার মাথায় ধরে না।

খরচের পর অবশিষ্ট সামান্য পরিমাণ টাকা পরীক্ষার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী ছাড়া কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে আর কাউকে দেয়া হয়েছে বা হতো বলেও আমার জানা নেই। জেলা প্রশাসক বা জাঁদরেল আমলা, সভাপতি হিসেবে জেলা সদর নয়, ঢাকা শহরেও নয়; অধ্যক্ষের আগ্রহে ডাকা গভর্নিং বডির সভায় কলেজে এসেই তারা যোগদান করেছেন। এখানে টাকাকড়ির কোনো সম্পর্কই নেই। আর ‘সভাপতির সভা-ভাতা’...!

বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×