তৃতীয় মত

মার্চ বাঙালি জীবনে হাসি এবং কান্নার মাস

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ০৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ বাঙালি জীবনে হাসি এবং কান্নার মাস

মার্চ মাস এলেই আমরা বাঙালিরা হাসি এবং কাঁদি। এটা আমাদের জন্য সুখের মাস, শোকের মাস এবং আনন্দেরও মাস। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ; যে ভাষণে স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ডাক দেয়া হয়েছিল। এ মাস আমাদের গর্বেরও মাস। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষ ফাগুনের খেলা’। ইংরেজি মার্চ মাস সম্পর্কে এ কথাটি অতীব সত্য। আমাদের গর্ব ও আনন্দের এ মাসের ২৬ তারিখেই বাংলাদেশজুড়ে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম গণহত্যা শুরু হয়। মধ্যরাতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস পালনের আনন্দ-উদ্বেল দিনেও বাংলার মানুষ শহীদ বুদ্ধিজীবী, ত্রিশ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের স্মরণে চোখের অশ্রু মোছে।

অনেক দেশের মতো আমাদের উপমহাদেশেও অতীতে বহু দিবস পালিত হয়ে কালের গর্ভে চলে গেছে। আবার নতুন দিবস এসেছে। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় আমরা পলাশী দিবস পালন করতাম প্রতিবছর ৩ জুলাই তারিখে। এই তারিখে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পলাশীর যুদ্ধের পর বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয়।

এ দিবসটি পালন ছিল উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ। উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর ৩ জুলাইয়ের গুরুত্ব কমে যায়। এখন আগের মতো গুরুত্বসহ সর্বত্র এ দিবসটি পালিত হয় না।

ব্রিটিশ ভারতে কংগ্রেস ৯ আগস্টকে পালন করত স্বাধীনতা দিবস হিসেবে। কারণ ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসের এই দিনে মহাত্মা গান্ধী কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। মহাসমারোহে এ দিবসটি পালিত হতো।

অনুরূপভাবে অবিভক্ত ভারতজুড়ে পালিত হতো জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম হত্যাকাণ্ড স্মরণে জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবস। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এই দুটি দিবস বিস্মৃত প্রায় হয়ে গেছে। ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। এখন তাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ১৫ আগস্ট পালিত হয়। জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবসটি উত্তর ভারতে এখনও পালিত হয়, তবে আগেকার দিনের ব্যাপক শোক ও ক্ষোভ তাতে নেই। আছে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

অবিভক্ত মুসলিম লীগ ২৩ মার্চকে পালন করত ‘পাকিস্তান দিবস’ হিসেবে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল।

সেই থেকে প্রতি বছর ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস হিসেবে পালন করা হতো। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখন ১৪ মার্চ স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু ২৩ মার্চ গুরুত্ব হারায়নি।

১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে দেশটির প্রথম সংবিধান গৃহীত হয় এবং দেশটিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। এখন ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস।

বাংলাদেশে মার্চ মাসের গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে অন্যান্য দেশের জাতীয় দিবসগুলো সম্পর্কে আলোচনা করলাম এ জন্যই যে, এই দিবসগুলোর মধ্যে কিছু দিবস চির অমর। জাতি তার প্রয়োজনেই এ দিবসগুলো ধরে রাখে।

কখনও ভুলতে চায় না এবং পারে না। যেমন বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস, ভাষা শহীদ দিবস, জাতির পিতার জন্ম ও মৃত্যু দিবস। মহামানবতুল্য কারও স্মরণ দিবস যেমন রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, ইংল্যান্ডে আমেরিকায় যেমন শেক্সপিয়র স্মরণ দিবস ইত্যাদি।

কোনো কোনো দিবস জাতীয়তার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত হয়। যেমন মে দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদ দিবস। বহুকাল আগে শিকাগো শহরে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে ১ মে শ্রমিকরা বিশাল সমাবেশ করে।

এ প্রতিবাদ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিবছর সব দেশে মে দিবস পালিত হতে শুরু করে। এ দিবসটি দেশে দেশে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়।

বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপর্যয়ের পর পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশগুলো এই মে দিবস পালন তুলে দেয়ার চেষ্টা চালায়। অনেক দেশে ১ মে’র সরকারি ছুটির দিন বাতিল করা হয়। কিন্তু মে দিবস এখনও আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন বাতিল করা যায়নি।

মে দিবস এখনও আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। মে দিবসের পর বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা দিবস এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দেশে দেশে ঢাকার ভাষা শহীদ মিনারের অনুকরণে শহীদ মিনার গড়ে উঠেছে। একুশের গানটি আন্তর্জাতিক সংগীতে পরিণত হয়েছে।

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের বারোটি মাসের মধ্যে বাঙালি জীবনে অধিকাংশ মাসেরই কোনো না কোনো গুরুত্ব রয়েছে। ফেব্রুয়ারি, আগস্ট ও ডিসেম্বর মাসের তো রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। এ ক্ষেত্রে মার্চ মাসের রয়েছে নানা বৈচিত্র্য।

এই বৈচিত্র্য কান্না হাসির দোলা মেশানো। মার্চ মাস যেমন ভাষা আন্দোলন শুরু করার মাস, তেমনি স্বাধীনতা সংগ্রামও শুরু করার মাস। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয়ের পর কথা ছিল একাত্তরের মার্চ মাসের গোড়ায় ঢাকায় নবনির্বাচিত সংসদের সভা হবে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এক ঘোষণায় সংসদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেন। ঘোষণা শুনে ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলায় অগুনতি দর্শক খেলা ভেঙে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

৩ মার্চের বিক্ষোভ মিছিলে সারা শহর যোগ দেয়। বিক্ষোভ সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিক্ষোভ থেকেই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন এবং তা থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের শুরু। তার পরের ঘটনা ইতিহাস।

মার্চের আরেকটি ঘটনাও আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের অংশ। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। এই দিন সরকারি উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠান হয়। ঘরে ঘরে পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলিত হয়।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের পতাকার বদলে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র নেতৃবৃন্দ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। সারা ঢাকা শহরের ঘরে ঘরে এ পতাকা উত্তোলিত হয়। কোথাও পাকিস্তানি পতাকা দেখা যায়নি; একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া।

পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল আসগর খান এ সময় ঢাকায় ছিলেন। তিনি লাহোরে ফিরে গিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশ কার্যত স্বাধীন হয়ে গেছে।

আমি ২৩ মার্চ সারা ঢাকা শহরে একটিও পাকিস্তানি পতাকা দেখিনি; কেবল পাকিস্তানি পতাকা ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। মনে হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তান বলতে এখন বুঝি মাত্র ঢাকা ক্যান্টনমেন্টকে বোঝায়। করাচির ইংরেজি সান্ধ্য দৈনিক ‘দি লিডারে’ লেখা হল- ‘শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৩ মার্চ নিজের হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন স্পষ্টভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা। ইয়াহিয়া-ভুট্টো এখন কী করবেন?’

এরপর ইয়াহিয়া-ভুট্টো যা করেছেন, তা ইতিহাস। নতুন করে তা এখানে আলোচনায় দরকার নেই। আমার কথা- মার্চ মাস বাঙালির জীবনে সুখের মাস, শোকের মাসও; কিন্তু বৈচিত্র্য ‘ভরা’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এ মাসটি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লন্ডন, ৩ মার্চ, রবিবার, ২০১৯

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×