মুক্ত জীবন-রুদ্ধ প্রাণ

ক্ষমতা বৈধ করার প্রয়োজনেই বিশ্বজুড়ে নির্বাচন!

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মাহফুজ উল্লাহ

আমাদের যৌবনে দুটি নাম- জামিলা বুপাশা ও জামিল বুহারিদ- বিশ্বজুড়ে ছিল উচ্চারিত। এদের সঙ্গে আরও অনেকেই ছিলেন; কিন্তু তাদের বীরত্ব কাহিনী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তারা আলজেরিয়ার ওপর চাপিয়ে দেয়া ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ফরাসিবিরোধী মুক্তি সংগ্রামে সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। এ সংগ্রামে জাঁ পল সার্ত্রেসহ বহু মানুষ সমর্থন জুগিয়েছিলেন।

আলজেরিয়ার মুক্তির পর কয়েক দশক অতিবাহিত হয়েছে। বিভিন্ন পন্থায় সরকার বদল হয়েছে; কিন্তু জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা পেয়েছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। এ সন্দেহের কারণ আগামীতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন, যেখানে বর্তমান অসুস্থ আবদুল আজিজ বুফেতলিকা পঞ্চমবারের মতো নির্বাচন দৌড়ে অংশগ্রহণ করতে চান; কিন্তু আলজেরিয়াবাসীর কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়।

ইতিমধ্যেই বুফেতলিকা পরপর চারবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরই মধ্যে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি হারিয়েছেন এবং তাকে হুইলচেয়ারে করে চলাচল করতে হয়। এ কারণে আলজেরিয়ানরা তার চেহারা প্রায় ভুলতে বসেছেন। চলতে-ফিরতে পারেন না তবুও ক্ষমতায় থাকতে হবে, ব্যবহার করতে হবে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে। এর আগেও আলজেরিয়ায় নির্বাচনী ব্যবস্থা ক্ষমতাসীন সরকারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুধু কি আলজেরিয়া? সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন দেশে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো আর যাই হোক নির্বাচনী সংজ্ঞায় পড়ে না। নাইজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন কৌশলকে ব্যবহার করে পুনরায় জয়ী হয়েছেন। ক্ষমতায় টিকে থেকে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার উদাহরণ এখন অসংখ্য। সুদানে নির্বাচন হলে পরাজয় নিশ্চিত জেনে প্রেসিডেন্ট বশির মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন এবং তার পছন্দের টেকনোক্র্যাট দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। আফ্রিকার প্রায় সবক’টি দেশের নির্বাচন আর নির্বাচন নেই।

গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য ইরানেও চলছে আন্দোলন। জর্ডান, কাজাখস্তান সর্বত্রই আজ অধিকারহারা মানুষ অধিকারের জন্য পথে নেমেছে। মিসরে ষাট হাজার বিরোধীকে কারাবন্দি করেও প্রেসিডেন্ট সিসি নিরাপদবোধ করছেন না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জয়লাভ করে গণবিরোধী নীতির কারণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ গদি হারাতে পারেন।

শাসনের কাজকে নির্বিঘ্নে পরিচালনা করার রেওয়াজ অনেকদিন থেকে চলে এসেছে। যে এথেন্সে গণতন্ত্রের সূত্রপাত সেখানে নাগরিকরা একসময় হাত তুলে তাদের সমর্থন প্রকাশ করতেন; কিন্তু হাত তোলার বিষয়টি ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণ হতে পারে বলে মনে করে গোপনে ভোট দেয়ার পদ্ধতি চালু হয়েছে। যাতে কোনো প্রার্থীর সমর্থকদের চেহারা দেখা যায়; কিন্তু মনটা বোঝা না যায়। নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক বাছাইয়ের যে পদ্ধতি তার অনেক সংস্কার হয়েছে। কোনটি ভালো নির্বাচন আর কোনটি খারাপ, সে বিষয়ে একটি মাপকাঠিও তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সংজ্ঞা দেয়া আছে; কিন্তু কে শোনে কার কথা!

গত শতাব্দীর শেষদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা থার্ডওয়ে বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ঢেউ কোথাও কোথাও জনগণকে গণতন্ত্রের স্বাদ দিয়েছে; কিন্তু তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কীভাবে পদ বিনিময় করতে হয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাশিয়ার পুতিন। প্রথমে প্রেসিডেন্ট, তারপর প্রধানমন্ত্রী এবং আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অনেকেই বলবেন, পুতিন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন; কিন্তু কেমন করে সেদেশের বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতাহীন করা যায় তা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে পৃথিবীর মানুষ জেনে গেছে।

নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার উদাহরণ অনেক। যারা ক্ষমতায় আছেন তারা তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়ার কথা বলেন। এসবের মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে বিজয়ী করার কৌশল, দেশের অভ্যন্তরে উন্নয়নের চমক দেখানোর চেষ্টা এবং বাইরের পৃথিবীতে মর্যাদা ও সমর্থন বাড়ানোর পদক্ষেপ। এর ভিত্তিতেই থাইল্যান্ডের সামরিক প্রশাসক ২৪ মার্চ অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে নিজেকে সবচেয়ে ভালো প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এ কারণে বিভিন্ন বিরোধিতাকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের সেনাশাসকের সমর্থনের অভাব নেই। সামরিক পুঁজি যেভাবে থাইল্যান্ডের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থাকে কব্জা করেছে, তাতে বিরোধী পক্ষের জয়ের সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।

ক্ষমতায় থাকার জন্য কীভাবে নির্বাচনকে ব্যবহার করতে হয় তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ বাংলাদেশ। একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন যে পদ্ধতিতে হয়েছে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অন্যান্য নির্বাচনেও। যারা বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিতবোধ করে, তাদের তো এ ধরনের নির্বাচন প্রয়োজন হয় না। বিরোধী পক্ষও নির্বাচনী কৌশলের এ প্রয়োগ আঁচ করতে পারেনি।

যারা জিতেছেন বলে দাবি করেন, তাদের অনেকের মনে দুঃখবোধ আছে নিজের ভোট নিজে দিতে না পারার জন্য। এ হতাশা থেকেই ভোটারবিহীন নির্বাচনের ঘটনা ঘটেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের সময়। নির্বাচনের দিন থেকেই শুরু হয়েছে অন্যায় ঢাকার চেষ্টা। এতে নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য একেক দিন একেক রকমভাবে প্রচারিত হচ্ছে।

আসলে যখন গোঁজামিল দেয়ার প্রশ্ন আসে তখন হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যায়। কমিশন যে হিসাব দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, হয় গণমাধ্যম নয়তো নির্বাচন কমিশন অসত্য কথা বলছে। সংবাদপত্র বলছে, নিরুত্তাপ ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আতিকুল। ভোটের যে হিসাব দেয়া হচ্ছে তাতে এমনও দেখা গেছে- কোনো কেন্দ্রে ৩ জন, কোনো কেন্দ্রে ৮ জন ভোট দিয়েছেন। আবার একইসঙ্গে বলা হচ্ছে, ৮০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন।

ভোটার না আসার কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোটেও বিচলিত নন। তিনি বলছেন, ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার দায় রাজনৈতিক দলগুলোর। তিনি যদি বলতেন, ভোটার কম উপস্থিতির দায় নির্বাচন কমিশনের, তাহলে বিষয়টি আরও গ্রহণযোগ্য হতো। যে কমিশন জনগণের ভোটদানের অধিকারকে নিশ্চয়তা দিতে পারে না সেই কমিশনের আদেশের কোনো প্রয়োজন নেই। যদি তর্কের খাতিরেও ধরে নেই নির্বাচন কমিশন দায়ী নয়, তাহলে সরকারদলীয় ভোটাররা গেল কোথায়? বাস্তবে বাংলাদেশিদের সবার জীবনে নির্বাচনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে।

একইসঙ্গে নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমও ঝামেলায় আছে। অভিযোগ আছে, একটি টেলিভিশন লোক ধরে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে তা প্রচার করছে। অধিকাংশ গণমাধ্যমেই এখন কথা বলতে ভয় পায়। সব ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার ঝুঁকি। ইতিমধ্যে যুগান্তরের সাংবাদিকের বন্দি জীবনযাপন শুরু হয়েছে। তিনি যে অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন তার প্রযোজ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নবাবগঞ্জের একজন পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ সম্পর্কে রিপোর্ট করতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন যুগান্তরের প্রতিনিধি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন অনেক বড় বড় কথা বলে; কিন্তু দুর্নীতির রিপোর্ট করার দায়ে সাংবাদিকের কারাবরণ সম্পর্কে কিছু বলে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা আলিশান বাড়ি বানিয়েছেন- সেই রিপোর্টের দায়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ডিজিটাল আইনে কেন? এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই সবাই বলে- যাদের জোরে সরকার নির্বাচনে জিতেছে তাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা কারও নেই।

নাগরিকদের আজ প্রয়োজন সার্বভৌম নাগরিকত্ব অর্জন করা। প্রতিটি দেশের নাগরিকরা সহিংস ও অহিংস উভয় পন্থার সঙ্গেই পরিচিত। সংস্কার উল্টো পথে চললে, ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইলে নাগরিকরা সহিংস পথ বেছে নেয়; কিন্তু নাগরিকরা আজ অসহায়বোধ করে, কারণ পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে বিত্তবানরা, বিত্তহীনরা নয়। বিত্তবানরা বিত্ত ব্যবহার করেই অর্জন করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার আনুগত্য। সমস্যা দেখা দেয় সেখানেই।

মাহফুজ উল্লাহ : শিক্ষক ও সাংবাদিক