চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী

  একেএম শামসুদ্দিন ০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী
চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী। ফাইল ছবি

সেদিন যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি সংবাদ শিরোনাম দেখে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। শিরোনামটি ছিল- ‘এই অদক্ষ আমলাদের নিয়ে কী করব?’ গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর যে চারটি রিট করা হয়, সেই রিটের শুনানিকালে হাইকোর্টের বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

২৭ ফেব্রুয়ারি যুগান্তর উচ্চ আদালতের এই মন্তব্যটি শিরোনাম করে। ২০১০ সালে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটির ১৭ দফা সুপারিশ অদ্যাবধি বাস্তবায়ন না করায় উচ্চ আদালত সরকারের উচ্চপর্যায়ের আমলাদের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৩ জুনের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিমতলীর ১২৪ জন মানুষ প্রাণ হারান। আহত হন অর্ধশতাধিক। পুড়ে যায় ২৩টি বসতবাড়ি, দোকানপাট ও কারখানা। নিমতলী এলাকার একটি বাড়ির নিচতলায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কেমিক্যাল গোডাউন থেকে মূলত ছিল ওই আগুনের সূত্রপাত। মর্মান্তিক ওই ঘটনার পর শুরু হয় পুলিশ, ফায়ারব্রিগেড আর সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দৌড়ঝাঁপ। তদন্তও শুরু হয়।

ভবিষ্যতে এ ধরনের ট্র্যাজেডি রোধে ১৭ দফা সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। তার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে ফেলা, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ ও বাজারজাতকরণে লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে তদারকি জোরদার করার বিষয়টি ছিল অন্যতম। আর এসব বাস্তবায়নের কথা ছিল শিল্প মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশনের।

তোড়জোড়ও শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন নিমতলীসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেয়ার। কিন্তু কথা রাখেনি কর্তৃপক্ষ। নিমতলী এলাকা থেকে কেমিক্যালের সব ধরনের কারখানা ও বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি আজও।

২০১১ সালের ২০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ জন্য বিসিকের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে আরেকটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু ফলাফল শূন্য। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তাই হল।

নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত না শুকাতেই ঘটল চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড, পুড়ে অঙ্গার হল ৭৮টি তাজা প্রাণ এবং গুরুতর আহত হল ৪১ জন। নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স বা বিআইপি জানিয়েছে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সম্মিলিত ব্যর্থতার কারণেই চুড়িহাট্টার এ দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। অথচ নিমতলী দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে এ ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত। সাধারণ মানুষের কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার নয়, বাংলাদেশে কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা হলে রুটিন মাফিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কমিটি তদন্ত করে এবং যথাবিহিত তদন্ত রিপোর্টও জমা দেয়; কিন্তু সে তদন্তের রিপোর্ট আর আলোর মুখ দেখে না। খোঁজ নিলে জানা যাবে, তদন্ত রিপোর্টটি হয়তো বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে আছে মন্ত্রণালয়ে কিংবা দফতর-অধিদফতরে।

মজার ব্যাপার হল, এবার চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার পর জাতি একটি চমৎকার ‘কথার লড়াই’ উপভোগ করার সুযোগ পেল। সাবেক দুই শিল্পমন্ত্রী একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে দোষারোপ করেছেন গণমাধ্যমে। সরকারের এই দুই মন্ত্রী একে অপরকে দায়িত্বহীন, অথর্ব ও অযোগ্য বলে দোষারোপও করেছেন। এতে দেশের মানুষ খুব বেশি অবাক হয়েছে বলে মনে হয়নি। মানুষ ভেবেছে, এতদিন একই জোটভুক্ত হয়ে, একই রাজনৈতিক প্লাটফর্মে ঘনিষ্ঠ রাজনীতির চর্চা করে দেরিতে হলেও একে অপরকে হয়তো এতদিনে ভালো করে চিনেছেন!

এই দোষারোপের তালিকায় মন্ত্রী মহোদয়গণ ছাড়াও সিটি কর্পোরেশন দুষছে ব্যবসায়ীদের, ব্যবসায়ীরা দুষছেন শিল্প মন্ত্রণালয়কে। আবার বর্তমান শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দুষছেন সরকারি সংস্থাগুলোকে।

তারা বলেছেন, সরকারি সংস্থাগুলো তাদের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে এ পরিস্থিতি হতো না। বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রসঙ্গে তারা আরও বলেন, ‘তারা কি দেখে না? তারা কি জানে না? আমাদের সংস্থার তো অভাব নেই, বসে বসে শুধু লাইসেন্স দিয়েছে। তাদের লাইসেন্স দেয়ার আগে পরিদর্শন করা উচিত ছিল, দেখা উচিত ছিল। যাদের লাইসেন্স নেই তাদের ব্যবসা করতে কেন দেয়া হল?’

চুড়িহাট্টা ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে এক বৈঠকে শিল্পমন্ত্রী চমৎকার করে বলেছেন, ‘আমরা ব্লেমগেমে যেতে চাই না। ব্যর্থতা কারও একার না। আমাদের সবার। সমস্যাগুলো আমরা সবাই জানি। কিন্তু সবাই মিলে চাপা দিয়েছিলাম।

প্রতিবার মানুষ মারা যাবে, সভা করব, বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করব সেটা যেন আর না হয়।’ অপরদিকে শুনানিকালে হাইকোর্ট বেঞ্চও বলেছেন, ‘চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের দায় রাষ্ট্রের কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। দায়িত্বশীল ব্যক্তি হয়ে একজন আরেকজনের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়া ঠিক না।’ আদালত চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে আরও বলেছেন, ‘এটাকে দুর্ঘটনা বলা যাবে না, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত এক অবহেলা।’ আদালতের অসন্তোষ প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কি ধরে নিতে পারি, উল্লিখিত ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে আমলাদের অদক্ষতাই শুধু দায়ী? নাকি এর পেছনে সদিচ্ছারও অভাব ছিল?

‘সমস্যাগুলো আমরা সবাই জানি। কিন্তু সবাই মিলে চাপা দিয়েছিলাম’- শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্যের এই চুম্বক অংশটুকু বিশ্লেষণ করলে এ কথা কি বলা যায়, সুপারিশ বাস্তবায়নে সদিচ্ছারও অভাব ছিল? ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীনদের চূড়ান্ত অবহেলা? আমলাদের দক্ষতা থাকলেই শুধু হবে না, যে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নে চাই সদিচ্ছাও। আর এই সদিচ্ছা আমলা পর্যায়ে থাকলেই কি হবে? এর জন্য চাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত এবং সে সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ দেয়ার দৃঢ় পদক্ষেপ। এ ক্ষেত্রে মনে হয় দুটোর অভাবই কাজ করেছে সমভাবে অর্থাৎ অদক্ষতা ও সদিচ্ছার অভাব।

অদক্ষ আমলাদের নিয়ে আদালতের মন্তব্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইদানীং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমলাদের দক্ষতা ও সততা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। অনেকেই মনে করেন, সরকারি কর্মপরিমণ্ডলে এখন এক প্রকার অসুস্থ পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে সখ্য ও আনুগত্য হয়ে গেছে যোগ্যতার মাপকাঠি। যার যত বেশি সখ্য আছে এবং আনুগত্য থাকুক বা না থাকুক, যে যত বেশি আনুগত্য দেখাতে পারে, তিনি অযোগ্য হলেও সহজেই পেয়ে যাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও পদোন্নতি।

যখন দেখা যায়, ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ে তোষণনীতি অবলম্বন করে পদোন্নতির বৈতরণী পার হয়ে কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- এদের দিয়ে জনগণের কতটুকু স্বার্থ সংরক্ষিত হবে? এ ধরনের তোষণনীতির অনুশীলন এখন বাছ-বিচারহীনভাবে চলছে সব সেক্টরে। সরকারি-বেসরকারি, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সংগঠনগুলোসহ সর্বত্র। এসব কারণে মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন দিন দিন।

কর্মক্ষেত্রে এখন এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে, পেশাগত উন্নতি ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রশাসনের অনেক যোগ্য কর্তাব্যক্তিকেও অনিচ্ছাকৃতভাবে আপসনীতির পথে পা বাড়াতে হচ্ছে। ফলে সখা বাড়ানো এবং অনৈতিক আনুগত্য প্রকাশের অসভ্য প্রতিযোগিতা বেড়ে চলেছে দিন দিন। এমন নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা অনেক সময় নিয়োগকৃত কর্তৃপক্ষকেও লজ্জায় ফেলে দেয়। অতি সম্প্রতি এর আলামতও আমরা দেখতে পেয়েছি।

অসৎ পথে যারা হাঁটে, তাদের সততা নিয়ে সন্দেহ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু আর্থিক সততার কথা বিবেচনা করলে চলবে না। কর্মক্ষেত্রে কতটুকু সৎ সে বিবেচনাও করতে হবে। অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করাও এক ধরনের অসততা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, কাজের প্রতি সৎ থাকলেও পারিপার্শ্বিক কারণে অনেক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না। দেখতে হবে এই পারিপার্শ্বিক কারণগুলো কী। এর জন্য আমাদের খুব বেশি দূরে যেতে হবে না।

বর্তমান শিল্পমন্ত্রীর উল্লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমেই এসব কারণ বেরিয়ে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুধু সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্মকর্তাদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্বটুকু ভুলে গেলে চলবে না। কারণ ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে, সংশ্লিষ্টরা তাদের দায়িত্ব পালনে বড় রকমের অবহেলা করেছেন। এ অবহেলার জন্য যে এতগুলো প্রাণ গেল তার দায়িত্ব আজ কে নেবে? আমরা লক্ষ করেছি, অপঘাতে মৃত্যুর পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে একটা অঙ্কের অর্থ ধরিয়ে দেয়া হয়। চুড়িহাট্টা ঘটনায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

আদালত হতাহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আদেশ দিয়েছেন। হয়তো দেয়াও হবে সে পরিমাণ টাকা। ক্ষতিপূরণ প্রদান উপলক্ষে সেই অনুষ্ঠানের ফটোসেশনও হয়তো আমরা দেখতে পাব দেশের মিডিয়াগুলোতে। একদল হয়তো বাহবা দেবে মানবিকতার গীত-গান গেয়ে, অন্য কেউ হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করবে নতুন করে।

কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়াবেন। কিন্তু যে ঘরের মানুষ পুড়ে অঙ্গার হল, সে ঘরের বিধবা স্ত্রী, এতিম সন্তান কিংবা সন্তানহারা মায়ের বোবা কান্নার শব্দ কি কেউ শুনতে পাবে? সে কান্নার শব্দ আদৌ কি গিয়ে পৌঁছবে ওই ‘অদক্ষ আমলা’দের ঘরে? কিংবা একে অপরকে দোষারোপকারী আমাদের সেই জনপ্রতিনিধিদের কর্ণকুহরে?

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×