নির্বাচন, নাকি নির্বাসন?

  মুঈদ রহমান ০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন, নাকি নির্বাসন?
নির্বাচন, নাকি নির্বাসন? ছবি: সংগৃহীত

২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আতিকুল ইসলাম- কনগ্রেচুলেশনস! কিন্তু পরদিন শুক্রবার যুগান্তর শিরোনাম করেছে- ‘নিরুত্তাপ ভোটে মেয়র হলেন আতিকুল’।

অপরদিকে প্রথম আলো লিখেছে, ‘অনাগ্রহের ভোট, আতিক এগিয়ে’। নিন্দুকরা বলছে, পত্রিকা দুটি খুবই বেরসিক, সবকিছুতেই খুঁত না ধরলে পেটের ভাত হজম হয় না। আমরা সাধারণ মানুষ তা মনে করি না। আমরা মনে-প্রাণেই বিশ্বাস করি, আমেজ-উদ্দীপনা-অংশগ্রহণ-স্বতঃস্ফূর্ততার বিচারে নির্বাচনকে নির্বাসন দেয়া হয়েছে। এতে আপাত লাভালাভির বিষয় হয়তো থাকতে পারে; তবে ভবিষ্যৎ বিচারে তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। সমালোচনাকে উড়িয়ে দিতে সরকারি তরফ থেকে অনেকেই ‘নাথিং হ্যাপেন্ড’ বলতে পারেন; কিন্তু তা হবে দায়সারা মন্তব্য।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট ভোটারের সংখ্যা ৩১ লাখ ২ হাজার। তার মধ্যে ভোট পড়েছে ৯ লাখ ২৩ হাজার ২৬, যা শতাংশের হিসাবে ৩১.৫। ছোটবেলায় শুনেছি ক্লাসের পরীক্ষায় পাস মার্কস ৩৩%। ৩১% পেলে স্যার দয়া করে ২ মার্কস দিয়ে দিতেন- সেটাকে বলতাম ‘গ্রেস মাকর্স’। সিইসির দয়া আছে; কিন্তু গ্রেস মার্কস দেয়ার ক্ষমতা নেই। অতএব ফেল মার্কসই সই।

এই ৩১-কেও অনেকে বিশ্বাস করতে চান না, তাদের মতে, এ হার ২৮ শতাংশের বেশি নয়। তবে এ তর্কে না গিয়েও বলা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল সর্বনিু। সাম্প্রতিক সময়ে আরও চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে গেছে। রাজশাহীতে ভোট পড়েছিল ৭৮ শতাংশ, গাজীপুরে ৫৭ শতাংশ, খুলনায় ৬২ শতাংশ এবং সিলেটে ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ সব কটিতেই ৫০ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণ ছিল। আগামী দিনগুলোতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও কমে যাবে বলে সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ভোটারদের এ অনাগ্রহের কারণ কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান ২ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একদিকে এ নির্বাচনে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না।

অন্যদিকে গত সাধারণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় জনগণের মনে হয়েছে, তারা ভোট দিল কী দিল না, তাতে ফলাফলের কিছু যাবে আসবে না। ক্ষমতাসীনরা যে ফল চায়, তা তারা কোনো না কোনোভাবে তৈরি করবে। তাই জনগণ নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা না হলেও অহিংসতার ভেতর দিয়ে এমন কিছু ঘটেছে যা ভোটারদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অভিযোগ করেছিল যে, নির্বাচনের আগের মধ্যরাতে ৬০ শতাংশ ভোট সরকারি দল ‘সিল’ মেরে নিয়েছে; ভোটের দিন ভোটারদের গোপনে ভোট দেয়ার পরিবর্তে নৌকার এজেন্টদের সামনে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে; বিরোধী দলের প্রচার কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দমনমূলক আচরণ করেছে; আগের রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দেয়া হয়েছে ইত্যাদি।

সরকারি দল এসব অভিযোগ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন কমিশন কোনো আমলেই নেয়নি; কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে ‘ডাল মে বহুত কালা হায়’।

এ বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘ভোট কেন্দ্রে ভোটার না আসার দায় নির্বাচন কমিশনের নয়। এ দায় রাজনৈতিক দলগুলোর এবং প্রার্থীদের’ (যুগান্তর, ০১.০৩.১৯)। দায় কার সে কথায় আমরা নাইবা গেলাম। কিন্তু ‘না আসার’ যে একটা দায় কারও না কারও আছে সেটা সিইসির মন্তব্যে বেরিয়ে এসেছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের মাঠে তো এখন নির্বাচন কমিশন আর আওয়ামী লীগ- অন্য কোনো প্রাণী তো ডিসেম্বরেই ক্ষান্ত!

তাহলে দায়টা হয় নির্বাচন কমিশনের, না হয় সরকারি দলের, উভয়ের বাইরে তো যাওয়ার সুযোগ নেই। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনকে আওয়ামী ঘরানার না বলতে পারেন; কিন্তু আওয়ামীবিদ্বেষী নিশ্চয়ই বলা যাবে না।

এ নির্বাচনে ভোটারদের অনাগ্রহ সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘মানুষ ভোট দিতে যায়নি। কারণ, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মানুষ নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে’ (প্রথম আলো, ০১.০৩.১৯)। যে কোনো দল চাইবে যে কোনোভাবেই হোক ভোট অনুকূলে আনতে। সে জন্য যা যা করা দরকার (তা যত অনাকাক্সিক্ষতই হোক) তাই করতে চেষ্টা করবে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে তার বাহিনী মেধা, সততা আর দক্ষতা দিয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। যদি সেটা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সারা নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত হবে।

‘নির্বাচন আসে, এবং মনে করা হয় যে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরিণামে যা পাওয়া যায় তা মোটেই গণতন্ত্র নয়, সেটা হচ্ছে নির্বাচিত স্বৈরাচার। আর সাধারণ অভিজ্ঞতা এটাই যে স্বৈরাচার যদি নির্বাচিত হয়, অর্থাৎ নিজেকে বৈধ করে নেয় তবে তা অবৈধ স্বৈরাচারের চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে।

কেননা বৈধ স্বৈরাচার নিজেকে বৈধ মনে করে, ভাবে সে জনগণের রায় নিয়ে এসেছে, তাই যা ইচ্ছা তা করতে পারবে, যতটা সম্ভব আইন চালাবে, পাঁচ বছর পর দেখা যাবে জনগণ তাদের কাজ পছন্দ করেছে কী করেনি’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘গণতন্ত্রের অভিমুখে’, পৃষ্ঠা : ১১০)।

গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ আশাব্যঞ্জক উন্নয়ন করেছে- এ কথা কেউ বললে আমি তার সঙ্গে নিশ্চয়ই দ্বিমত করব না। আবার কেউ যদি বলেন, গত দশ বছরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আশঙ্কাজনক অবনমন হয়েছে তাতেও দ্বিমত করার সুযোগ থাকবে না। অনেকেই বলতে পারেন, গত চার দশকের কথা বিবেচনায় নিলে চীনের তুলনায় ভারতে অধিকতর গণতন্ত্রের চর্চা হয়েছে; কিন্তু ভারতের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে চীন এগিয়েছে চোখ-টাটানোর মতো।

তাই আওয়ামী লীগ শুধু উন্নয়নের গানটাই বেশি গাইতে পছন্দ করে। অন্যদিকে বিএনপি আওয়ামী লীগের উন্নয়নকে আমলেই নিতে চায় না, শুধুই রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি সামনে আনছে।

অথচ গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন একই সঙ্গে চলতে কোনো বাধা নেই বরং চলাই উচিত। এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন, ‘উন্নয়নকে যদি বৃহত্তর অর্থে দেখি, তাহলে তার কেন্দ্র হচ্ছে মানুষের জীবন। এভাবে দেখলে এটা পরিষ্কার হয় যে, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্কটাকে শুধু তাদের বাহ্যিক সম্পর্কের দিক থেকে দেখলে চলবে না, বরং দুটোর অন্তর্নিহিত ঐক্যকেও দেখতে হবে।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা ‘উন্নয়নের জন্য অনুকূল’ কিনা- কখনও কখনও এ প্রশ্নও তোলা হয়। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার হচ্ছে উন্নয়নের ‘অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ’ (‘নীতি ও ন্যায্যতা’; পৃষ্ঠা: ৩৮৫-৮৬)। সুতরাং একটাকে আরেকটার প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো কারণ নেই।

অনেকেই হেঁয়ালি করে বলেন, সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ। এটা কোনো গৌরবের কথা নয়। একজন মানুষ সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করা হয়, তার দ্বারা একটি নিষ্পাপ শিশুকে আদর করাও সম্ভব আবার ঠাণ্ডা মাথায় শিশুটিকে খুন করাও সম্ভব- এ চরিত্রের মানুষ আমাদের কাম্য নয়। অবশ্যই আপনার একটা পজেটিভ আইডেন্টিটি থাকতে হবে। কথায় বলে, বসার জায়গা চষতে হয় না।

আপনাকে কোনো না কোনো বিষয়ে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ এর আগে ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর দেশ শাসন করেছেন। অনেকে তাকে স্বৈরাচারের তকমাও দিয়েছেন। তবে সাধারণভাবে বলা হতো, মালয়েশিয়ায় মাহাথিরের কথাই শেষ কথা। ১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী মিচেল রকার্ড মালয়েশিয়ায় মাদক চোরাচালানের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ফ্রান্সের নাগরিক মিস বেট্রিসে সাওবিনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদকে একটি অনুরোধপত্র পাঠান।

জবাবে অপারগতা প্রকাশ করে মাহাথির লেখেন, ‘...আর তাছাড়া পরবর্তী সময়ে (সাওবিন) আবার ক্ষমার আবেদন করা হলে পেনাং রাজ্যের পার্ডনস বোর্ড (Pardon's Board) আবেদন নাকচ করে দেয়। খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, মিস সাওবিনের ব্যাপারে কোনোরকম সাহায্য করতে পারছি না। বিচার বিভাগীয় কাজে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার আমার নেই’ (ডা. মাহাথির’স সিলেক্টেড লেটার্স টু ওয়ার্ল্ড লিডার্স; পৃষ্ঠা: ৪৩)। তার মানে হল ডা. মাহাথির যা খুশি তাই করতে পারেননি; কিন্তু আমরা মনে হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘যা খুশি তা করে’ ফেলেছি। এটা কেউ স্বীকার করুন বা না করুন।

আমি দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক শক্তি বিবেচনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি সংহত। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি দলের অস্তিত্ব ধরে রাখতে জবরদস্তির প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। নিজেদের দুর্বলতাগুলো আস্তে আস্তে কাটিয়ে তুলে মানুষের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বাস্তব উপলব্ধির দ্বারা নির্বাচনবিমুখ আমজনতাকে নির্বাচনমুখী করার সব দায়িত্ব এখন সরকারকেই নিতে হবে। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×