বিশ্ব নিদ্রা দিবস

ঘুমের গুরুত্ব কম নয়

  মনিলাল আইচ লিটু ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুমের গুরুত্ব কম নয়

আধুনিক সভ্যতায় ব্যস্ত মানুষ ঘুমের প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে দেখছে। অথচ ঘুম শরীরবৃত্তীয়চক্রের একটি প্রয়োজনীয় মৌলিক অংশ।

আর তাই নিদ্রাজনিত সমস্যা এবং এর জটিলতা বিষয়ে অবহিত ও সচেতন করার জন্য এ বছর ১৫ মার্চ বিশ্বে পালিত হবে ‘বিশ্ব নিদ্রা দিবস’। সুনিদ্রার গুরুত্ব বোঝাতে ২০০৮ সালের মার্চ মাসে থেকে সারা বিশ্বে নিদ্রা দিবস পালন করা শুরু হয়। এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘Healthy Sleep Healthy Aging’, অর্থাৎ সুনিদ্রা নিশ্চিত করে সুস্বাস্থ্য।

বৈশ্বিক নিদ্রা সংকটে ভুগছে পৃথিবী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অন্তত ১০ কোটি মানুষের পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। ৮ শতাংশ মানুষ নিদ্রাজনিত রোগ এবং নাক ডাকা সমস্যায় আক্রান্ত। এ ছাড়া ২ কোটি ২০ লাখ আমেরিকান নিদ্রাহীনতায় ভুগছে। ঘুমের সমস্যা শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই হতে পারে। বয়সভেদে এর কারণেরও ভিন্নতা রয়েছে।

সুনিদ্রার উপকারিতা বহুবিধ। প্রশান্তিময় ঘুম মানসিক চাপ কমায়, স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ডায়াবেটিস রোগের ঝুঁকি কমায়, শিশুদের মেধা বিকাশে সাহায্য করে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, সুস্থ মানসিকতা সুরক্ষা করে এবং কর্ম উদ্দীপনা বাড়ায়।

ভালো ঘুমের জন্য প্রয়োজন সুনিয়ন্ত্রিত জীবন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমান এবং ঘুম থেকে উঠে পড়ুন। দিনের বেলা ৪৫ মিনিটের বেশি ঘুমাবেন না। ধূমপান ও অ্যালহোকল বর্জন করুন। ঘুমাতে যাওয়ার ৬ ঘণ্টা আগে চা, কফি, চকলেট, সোডা বর্জন করুন। রাতে ভারি ও মশলাযুক্ত খাবার খাবেন না। নিয়মিত ব্যায়াম করুন, তবে কখনই ঘুমাতে যাওয়ার আগে নয়। ঘুমানোর জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করুন। যেমন- আলো নিভিয়ে দিন, নীরবতা বজায় রাখুন। ঘুমানোর আগে সব স্মার্ট ডিভাইস পরিহার করুন। আপনার বিছানা পরিষ্কার রাখুন এবং বিছানাকে অফিসের মতো করে ব্যবহার করবেন না।

বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক কারণে সব বয়সের মানুষের ঘুমের সমস্যা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত এডিনয়েড ও টনসিলের

অস্বাভাবিক বৃদ্ধিজনিত কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বড়দের বেলায় নাকের হাড় বাঁকা, বড় আকারের টনসিল, নাকের পলিপ এবং সর্বোপরি অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি এর মূল কারণ। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ ঘুম কম হওয়ার বিষয়টি সরাসরি বুঝতে পারেন না, বিশেষ করে মুখ হা করে ঘুমানো কিংবা নাক ডাকাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন। অনেকে আবার নাক ডেকে ঘুমানোকে গভীর ঘুম বলে মনে করন। সাধারণের এ ধারণার উল্টোটাই সত্যি। নাক ডাকা কখনই স্বাস্থ্যকর বিষয় নয়। যারা নাক ডাকেন তাদের অনেকেরই ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ বা শ্বাস বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। এই দম বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিয়মিতভাবে অল্প সময়ের জন্য হতে থাকে। সাধারণভাবে এই স্বাস্থ্য সমস্যার নাম Obstructive Sleep Apnoea বা নিদ্রাকালীন শ্বাসবদ্ধতা।

কারণ নির্ধারণ করে চিকিৎসা না করলে হতে পারে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা। সূচনায় এ সমস্যা সাধারণ শারীরিক অস্বস্তি দিয়ে শুরু হয়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ব্রেইনস্ট্রোক, হার্টের সমস্যা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, সারাদিন ক্লান্ত লাগা, ঘুম ঘুম ভাব গিয়ে শেষ পর্যন্ত মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার মতো পরিণতিতে পৌঁছাতে পারে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানোর কারণেই অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। আর আগে থেকেই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে পারে তার মধ্যে মাথাব্যথা, মেজাজ খিটখিটে থাকা, সব সময় ক্লান্তি ভোগ করা, অবসাদগ্রস্ত থাকা, একাকিত্ব বোধ করা অন্যতম। এর বাইরেও কমে যায় উদ্যম, কর্মস্পৃহা।

নাক ডাকা রোগী শনাক্ত করার জন্য রোগের ইতিহাস খুব ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। যেমন- আক্রান্ত ব্যক্তির নাক ডাকা কতটা মারাত্মক। নাক ডাকা কি ঘুমের মধ্যে শারীরিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নাকি যে কোনো অবস্থাতেই নাক ডাকে। রোগীর নাক কতদিন থেকে ডাকে। OSA-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য/লক্ষণ রয়েছে কি? প্রতি রাতে নিয়মিতভাবে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে কি? ঘটলে প্রতি রাতে কতবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। হরমোনজনিত সমস্যা অথবা অন্যান্য রোগ যেমন ডায়াবেটিস অথবা হাইপো থাইরয়ডিজম অ্যালার্জির ইতিহাস ইত্যাদি জেনে নিতে হবে।

পর্যাপ্ত ইতিহাসের পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করে দেখবেন এবং প্রয়োজন হলে কিছু পরীক্ষা করাবেন, যেমন- এক্স-রে, এডেনয়েড, নাকের ও কণ্ঠনালীর এন্ড্রোস্কপি, থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা, পলিস্নোগ্রাফি। স্লিপ ল্যাবে রাতে ঘুমন্ত রোগীর শরীরের অক্সিজেনের পরিমাণ, ইসিজি, ইইজি, ইএমজি, ইওজি, শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন ইত্যাদি মনিটর করা হয়। এই পরীক্ষাটি বর্তমানে বাংলাদেশেই করা সম্ভব। এ পরীক্ষার মাধ্যমে স্লিপ অ্যাপনিয়া সমস্যাটি নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। যারা Obstructive Sleep Apnoea বা নিদ্রাকালীন শ্বাসবদ্ধতাজনিত সমস্যায় ভুগছেন তদের উচিত এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানো।

অ্যালার্জি ও ঠাণ্ডা লাগাজনিত সমস্যাগুলো ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। নাক বাঁকা, এডিনয়েড, টনসিল বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে অপারেশন করে নিন। ঘুমের সময় CPAP/BIPAP মেশিন ব্যবহার করা যায়। জন্মগতভাবে নাক, মুখ, জিহ্বা ও গলার গঠনগত সমস্যা থাকলে প্রয়োজনীয় অপারেশন করতে হবে।

পরিশেষে বলব- ভালো ঘুমান, ভালো থাকুন।

অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটু : বিভাগীয় প্রধান, নাক-কান-গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×