আন্দাজ-অনুমানের ভুলে অনেক বড় খেসারত দিতে হয়

  ড. সা’দত হুসাইন ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. সা’দত হুসাইন

আমি তখন সবেমাত্র সমবায় সমিতির নিবন্ধক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এ পদটির ইংরেজি নাম Registrar Co-operative Societies of Bangladesh, সংক্ষেপে RCS. এটি একটি মর্যাদাবান পদ। দেশের সমবায়ীরা RCSকে তাদের স্বাভাবিক নেতা হিসেবে মেনে চলে।

এ সেক্টরের শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে তারা RCS-এর প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করে। সমবায়ী এবং সমবায় সমিতির বিবাদ-বিসম্বাদ, মামলা-মোকদ্দমার ব্যাপারে নির্বাহী পর্যায়ে তিনি সর্বোচ্চ আপিলাত (appellate) কর্তৃপক্ষ। সমবায় সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাধারণত তিনিই সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে ভিভিআইপি বা মন্ত্রী-সচিব উপস্থিত থাকলে তিনি কখনও কখনও বিশেষ অতিথি হিসেবে আসন গ্রহণ করেন।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আমি মহকুমা প্রশাসক এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। সচিবালয়ে এবং ট্রেনিং একাডেমিতে আমি কর্মরত ছিলাম। মাঝে বেশ কয়েক বছর উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে অবস্থান করেছিলাম। এ কারণে লোক জড়ো করা অনুষ্ঠান-আয়োজন সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা ছিল না। সম্যক ধারণাও ছিল না।

রেজিস্ট্রার হিসেবে আমার প্রথম লোক সমাগমপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল ফার্মগেটের বার্ক (BARC) মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন সুউচ্চ মর্যাদার একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। তখনকার সময়ে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালীও ছিলেন। আমার ধারণা ছিল এ রকম একজন ব্যক্তি যখন প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন তখন আমন্ত্রিত সুধীবৃন্দ সবাই অনুষ্ঠানে হাজির হবেন।

নিমন্ত্রণপত্রের সংখ্যা বিবেচনায় আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে আমন্ত্রিত দর্শকে হল ভর্তি হয়ে যাবে। সুতরাং হল ভর্তি করার জন্য আমি অতিরিক্ত কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করিনি। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার প্রায় আধঘণ্টা আগে আমি অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হলাম। আমার সঙ্গে ডজনখানেক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম হলে লোক সমাগম অত্যন্ত কম। আমন্ত্রিত অতিথিরা খুব একটা আসেননি। প্রধান অতিথির আকর্ষণ তাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি।

আমি প্রমাদ গুনলাম, আর ২০-২৫ মিনিটের মধ্যেই প্রধান অতিথি এসে পৌঁছাবেন। দর্শক সমাগমের এমন করুণ অবস্থা দেখলে নিশ্চয়ই তিনি অসন্তুষ্ট হবেন, যার বিরূপ অভিঘাত আমার ওপর পড়বে। উপায়ান্তর না দেখে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম অফিস থেকে গাড়ি ভর্তি করে লোক আনতে হবে। ফোনের মাধ্যমে অফিসে নির্দেশ পাঠানো হল। তখনকার দিনে যানজট ছিল না।

তাই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই বিনা আমন্ত্রণের কর্মকর্তা-কর্মচারী এসে হল ভরিয়ে ফেলল। মোটামুটি দর্শক-ভরা হলে প্রধান অতিথি এসে খুশি মনে অনুষ্ঠান অলঙ্কৃত করলেন। কোনো অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল। আমার জন্য শিক্ষণীয় ছিল যে, বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলে ভ্রান্ত ধারণা (Error of Judgement) বড় রকমের বিপত্তি সৃষ্টি করতে পারে।

আন্দাজ-অনুমান তথা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে রাজা-মহারাজা, সেনাপতি, উজির-নাজির থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই এমন কিছু পদক্ষেপ বা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা স্বাভাবিকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কোনো অভিযান, প্রকল্প, কর্মসূচি সফল হবে কিনা তা বহুলাংশে নির্ভর করে সেই সংক্রান্ত প্রাক-কল্পের (assumption) যথার্থতার ওপর।

যদি ভুল তথ্য, ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করে সব চলককে (variable) অন্তর্ভুক্ত না করে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয় তবে দেখা যাবে সেই কর্মসূচির বাস্তবায়ন সফল হবে না। নানাবিধ অপ্রত্যাশিত ত্রুটি-বিচ্যুতি, ঘটনা-দুর্ঘটনা জড়ো হয়ে কর্মসূচিকে ওলটপালট করে দেবে। অবস্থা এমন হতে পারে যে, এ ভ্রান্ত ধারণার কারণে সমুদয় সংগঠন, রাজনৈতিক দল, এমনকি সাম্রাজ্যও বিপর্যস্ত হতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে আমরা ভ্রান্ত ধারণার খেসারত দিয়েছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী নেতাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) ৬২ হাজার গ্রাম রয়েছে, আর এ অঞ্চলে পাকিস্তানি সৈন্য রয়েছে মাত্র ৬১ হাজার। অতএব, এক গ্রামে একজন করে সৈন্যও পড়ে না। যুদ্ধ হলে আমরা সহজেই পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাভূত করতে পারব।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে টের পেলাম তারা কী ভয়াবহ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেছিল। পাক হানাদার বাহিনী তো একসঙ্গে একদিনে সব গ্রাম আক্রমণ করে না। তারা দলবদ্ধ হয়ে তাদের সুবিধামতো গ্রাম নির্ধারণ করে আগ্নেয়াস্ত্র সহযোগে একের পর এক গ্রাম আক্রমণ করে।

মারণাস্ত্র বলে সজ্জিত আক্রমণকারী দলকে প্রতিরোধ করার সাধ্য নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ছিল না। অস্ত্রের প্রাধান্য দেখিয়ে অল্পসংখ্যক হানাদার সৈন্য গ্রাম দখল করে নিল। গ্রামের একটি স্কুল ঘরে ক্যাম্প বসিয়ে পুরো গ্রামের দখল দীর্ঘায়িত করে ফেলল।

অন্যদিকে পাক হানাদার বাহিনীর নীতিনির্ধারকরা বুঝতে চেষ্টা করেনি যে, ভারতের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রতি সরাসরি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। সীমান্তবর্তী দেশ যদি স্বাধীনতাকামী জনতাকে তার ভূখণ্ডে আশ্রয় দেয় এবং অস্ত্র ও প্রশক্ষিণ দিয়ে সহায়তা করে তবে মুক্তিকামী সেই বাহিনীকে মোকাবেলা করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

নীতিনির্ধারকদের ভ্রান্ত ধারণার খেসারত হানাদার বাহিনীকেও করুণভাবে দিতে হয়েছে। ভারতের সহায়তায় সামরিক ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিসেনারা যখন অস্ত্র হাতে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল তখন হানাদার বাহিনী তাদের বাধা দিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হল।

মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে মুক্তিবাহিনী গ্রামের পর গ্রাম দখল করে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিল। উজ্জীবিত গ্রামবাসী তাদের সঙ্গে মিলে গ্রাম পাহারা দিল। হানাদার বাহিনী আর গ্রামে আসতে সাহস করল না। গ্রামবাসী স্থায়ীভাবে নিজেদের গ্রামে তাদের দখল বজায় রাখল। শেষ পর্যন্ত পাক হানাদার বাহিনী তাদের আন্দাজ-অনুমানের ভুলের (Error of Judgement) মাশুল দিয়ে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করল। ৯৩ হাজার সৈন্য যুদ্ধবন্দি হল।

রাশিয়া আক্রমণের ক্ষেত্রে মহাবীর নেপোলিয়নও আন্দাজ-অনুমানে বিরাট ভুল করেছিলেন। একটি অঞ্চলে শীতকাল যে কত ভয়াবহ হতে পারে যুদ্ধের আগে নেপোলিয়ন তা আন্দাজ করতে পারেননি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়ে যখন শীতকাল এসে পড়ল তখন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং বরফের স্তর মিলে এমন অসম্ভব অবস্থার সৃষ্টি করল যে নেপোলিয়নের সৈন্যরা দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে পালাতে শুরু করল। শীতের কারণে অবস্থা যে এমন দুর্বিষহ হতে পারে নেপোলিয়ন পূর্বাহ্নে তা বুঝতে পারেননি। যুদ্ধে নেপোলিয়ন পরাভূত হলেন। ভ্রান্ত ধারণার ফল ভোগ করলেন।

অনেক বড় মাপের নেতা কিংবা রাজনৈতিক দল কোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর কার্যকর সমর্থনের আশা নিয়ে বড় ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তারা মনে মনে আশ্বস্ত থাকেন যে, কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হলে সেই ক্ষমতাধর গোষ্ঠী তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অদৃষ্ট কোনো কারণে ক্ষমতাধর গোষ্ঠী তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। ফলে একা মাঠে তাদের কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সহায়তার বিষয়টি সুনিশ্চিত না হয়ে ভ্রান্ত ধারণার বশে মাঠে নামার কারণে সেই বড় মাপের নেতা বা দলকে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো রাষ্ট্রনায়ক ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সম্ভাব্য সব তথ্য ও চলককে অন্তর্ভুক্ত না করে কর্মপরিকল্পনা বা কর্মকৌশল প্রস্তুত করার কারণে শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হন। ভ্রান্ত ধারণা তাদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এরূপ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়াতে হলে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সতর্কতার মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলোকে পূর্বাহ্নেই মূল্যায়ন করা আবশ্যক। নইলে সর্বনাশ ঠেকানো যায় না। ভ্রান্ত ধারণা ও ভুল আন্দাজ-অনুমানের বশবর্তী হয়ে কাজে নেমে অনেক রাষ্ট্রনায়ক, বীর-মহাবীর, জ্ঞানী-গুণী, নেতা-নেত্রী করুণ পরিণতি বরণ করেছেন।

ড. সা’দত হুসাইন : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি কর্ম কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×