ডাকসু নির্বাচন কিছুটা হলেও দিয়েছে

  মুঈদ রহমান ১৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডাকসু নির্বাচন কিছুটা হলেও দিয়েছে
ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে গণ্য করি। এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সমালোচক আহমদ ছফার মন্তব্য ছিল- কার্জন হলের আদল বিবেচনা করে যদি অক্সফোর্ড বলা হয় তাহলে কোনো কথা নেই; কিন্তু একাডেমিক কন্ট্রিবিউশনের কথা বিবেচনায় নিলে অক্সফোর্ডের সঙ্গে তুলনা চলে না। সে হোক, তবে জাতীয় রাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার তুলনা মেলা ভার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তরের প্রাণ ছিল। আজকের বাংলাদেশও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকে। তাই অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন আমাদের সবার নজর কাড়তে সক্ষম।

দীর্ঘ ২৮ বছর (১৯৯০-৯১’র পর থেকে) ১১ মার্চ হয়ে গেল ডাকসু নির্বাচন। ১৮টি হল সংসদের ভিপি পদে ১২টিতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জয়লাভ করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংসদের ভিপি পদে ছাত্রলীগকে ছাপিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নূরুল হক নূর। নূর হলেন ডাকসুর ২৬তম ভিপি। ১৯৬৩-৬৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নের ব্যানারে ১৪তম ভিপি ছিলেন বর্তমান ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। ১৮তম ভিপি বর্তমান আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছাত্রলীগের ব্যানারে নির্বাচন করেন। জাসদের বর্তমান সভাপতি আসম আবদুর রব ১৯তম ভিপি। ১৯৭২-৭৩ এ ভিপি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বর্তমানে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশের (সিপিবি) সভাপতি। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না জাসদ ছাত্রলীগের ব্যানারে ১৯৭৯ এবং ১৯৮০ সালে দু’বার ভিপি নির্বাচিত হন; সে হিসেবে তিনি ২১তম এবং ২২তম ভিপি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত (শপথ নেয়ার পর দল থেকে বহিষ্কৃত) সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ১৯৮৯-৯০ সালে ছাত্রলীগের ব্যানারে ২৪তম ভিপি নির্বাচিত হন। বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান ছাত্রদলের ব্যানারে ২৫তম ভিপি। লক্ষ করার বিষয় হল, উল্লিখিত ভিপিরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার করেছিলেন। সে হিসেবে বর্তমান ভিপি নূরুল হক নূরের ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ অনেকটাই অরাজনৈতিক এবং জাতীয় রাজনীতিতে এর কোনো অভিভাবক নেই। তাদের পরিচিতির একমাত্র কারণ সফল ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’। আমি এখানে শুধু ভিপিদের নাম উল্লেখ করেছি তার কারণ আছে। ছাত্র সংসদের প্রতিটি পদেরই নিজ নিজ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু ‘ভিপি’ নামটাতে একটা আলাদা ‘ফ্লেভার’ আছে, একটা অতিরিক্ত আকর্ষণ আছে।

কেমন হল ডাকসু নির্বাচন? সারা দেশের মানুষ যেমনটি আশা করেছিলেন, তেমনটি নয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের মন এখন নির্বাচনবিমুখ। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল এদেশের সর্বোত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে সারা দেশের সেরা ছাত্ররাই পড়তে আসে। তাছাড়া তাদের বয়সটাও হয় টগবগে। তাই আমাদের মতো খুব সহজে তারা নেতিয়ে পড়ে না। ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়ার পরও অনায়াসেই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে। দেহ-মনে ‘তাকত’ আছে। তাই পুরোপুরি উৎসাহ নিয়েই মাঠে নেমেছিল। তার পরও সন্দেহ ছিল শেষতক কী হবে। ‘ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা সবসময়ই প্রাকৃতিকভাবে সবকিছুকে অবিশ্বাসের প্রতি তাড়িত করে। অন্যদিকে ভদ্রোচিত ও পরিশীলিত ধারা সবসময়ই খোলামেলাত্ব এবং স্বাধীনতা মুখী।’ (নোয়ম চমস্কি; ‘মেকিং দ্যা ফিউচার’; পৃষ্ঠা: ২১)। নির্বাচনের পূর্বে সেরকম ‘পরিশীলিত’ অবস্থা আমরা দেখতে পাইনি। তারপরও নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সবাই আশাবাদী ছিল; কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পুরোটা না হলেও অনেকখানি চরিত্রের প্রতিফলন এখানেও দেখা গেল। কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত আবাসিক হলগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, প্রভোস্ট বহিষ্কৃত হয়েছেন, নির্বাচন কমিশনার বিব্রতবোধ করেছেন, সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঔজ্জ্বল্য রয়েছে, সে মার্গে নির্বাচনটি হয়নি। নূরকে নির্বাচিত ঘোষণার পর ভিসিকে ৩৫ মিনিট অবরুদ্ধ রাখা এবং নূরকে বহিষ্কারের যে দাবি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে করা হয়, তা গণতান্ত্রিক রীতিবিরুদ্ধ। আবার ফলাফলের পর ভিপি নূর দুটি পদ ছাড়া বাকি পদগুলোতে পুনর্নির্বাচনের যে দাবি করেন তা-ও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধই হয়ে থাকে, তাহলে সব পদেই পুনর্নির্বাচনের দাবি করা সঙ্গত; আংশিকভাবে নয়। শিক্ষকদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ হল, ‘এ ডাকসু নির্বাচন আমাদের শিক্ষক রাজনীতির অন্ধকার একটি দিক তুলে ধরল। একজন শিক্ষকের কাছে সব শিক্ষার্থীই সমান। তার দলীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন। এ নির্বাচনে শিক্ষকরা সেটি দেখাতে ব্যর্থ হলেন। এর ফলে তাদের ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা কমবে। শিক্ষক হিসেবে আমাদের সামাজিক মর্যাদা একটুখানি হলেও হারাব।’ (প্রথম আলো; ১২.০৩.২০১৯)।

তারপরও আমি বলব, এ নির্বাচনে আমরা কিছু না কিছু পেয়েছি। কোনো ধরনের রক্তপাত হয়নি, বড় ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো ডাকসু নির্বাচনে সবকিছু বিনা বাধায় অতিক্রম করতে পারেনি। সেখানে বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে, ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে, বিভিন্ন মিডিয়ায় অনিয়মের চিত্র ও সমালোচনা হয়েছে। ছাত্ররাজনীতিতে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ হয়েছে। ছাত্রদের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করে কেবল দলের লেজুড়বৃত্তিকে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই তারা বিনা সংকোচে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নূরুল হক নূরকে ভোট দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগকে অপছন্দ করে বিএনপির ছাত্রদলের ছায়াতলে যায়নি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংক্রান্ত ইস্যুতে তারা যাকে কাছে পেয়েছে তাকেই বেছে নিয়েছে। সুতরাং বড় বড় ছাত্র সংগঠনগুলো এ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারে। শত বেদনার পরও আমার ভালো লেগেছে ১২ মার্চের বিকাল বেলাটা। ছাত্রলীগের পরাজিত ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বিজয়ী নূরুল হককে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এটিকে আমি বলব ডাকসু নির্বাচনের ‘গ্রেট এচিভমেন্ট’- একটি আশাবাদী দৃশ্য। আমাদের বর্তমান রাজনীতিতে এ ধরনের সৌজন্য বিরল। একে উদাহরণ ধরে আমরা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে আমাদের তরুণ প্রজন্ম আগামীর রাজনীতির পথে পা বাড়াতে পারে।

বিগত দশকে আমাদের আয়-উন্নতি একেবারে হতাশাব্যঞ্জক নয়। জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে, মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৫২ ডলারে; কিন্তু অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে পড়েছি, ‘উন্নয়ন হচ্ছে সমাজের পরিবর্তন- যে পরিবর্তন শুধু আয়ের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে একটা সমাজে মানুষের সক্ষমতা-সামর্থ্য, ফাংশানিং এবং স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। তেল সমৃদ্ধ অনেক দেশে মাথাপিছু আয় খুব বেশি আছে; কিন্তু সেসব দেশে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, গণতন্ত্র ইত্যাদির অভাবের প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। অথচ তেল সমৃদ্ধ অনেক দেশের চেয়ে ভারতের মাথাপিছু আয় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও ভারতে গণতন্ত্র আছে।’ (আবদুল বায়েস ও মাহবুব হোসেন; ‘গল্পে গল্পে অর্থনীতি’; পৃষ্ঠা: ৫)। সুতরাং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটানোর নিশ্চয়তা বিধান করাটাও উন্নয়নেরই শর্ত, যার আংশিক আমরা ডাকসু নির্বাচনে পেয়েছি। পূর্ণ প্রতিফলনের আশায় রইলাম। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনাপ্রবাহ : ডাকসু নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×