নিউজিল্যান্ডে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাস প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ১৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিউজিল্যান্ডে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাস

১৫ মার্চ শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে দুটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী একাই গুলি করে ৪৯ জন মুসল্লিকে হত্যা করেছে। আহত হয়েছেন অনেকে। ৫০ লাখ মানুষ অধ্যুষিত দেশ নিউজিল্যান্ড অন্য অনেক দেশের তুলনায় শান্তিপ্রিয়।

সেখানে বছরে সারা দেশে ৫০টির বেশি হত্যাকাণ্ড হয় না, যদিও অন্যান্য পশ্চিমা দেশে এই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অনেক বেশি। কাজেই নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার। এ ঘটনায় নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন থেকে নিয়ে সারা নিউজিল্যান্ডবাসী হতবাক হয়েছেন।

তারা ব্যাপকভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে, ঘটনা নিউজিল্যান্ডে ঘটলেও এর প্রেরণার উৎস অন্য দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সের মতো দেশই হল এ ধরনের ক্রিমিনাল বর্ণবাদী আক্রমণের প্রেরণার ক্ষেত্র।

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ব্রেনটন ট্যারেন্ট কিশোর বয়স পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে থাকাবস্থায় তার মধ্যে বর্ণবাদী কোনো উন্মাদনা তো দূরের কথা, ধ্যান-ধারণাও ছিল না। কিন্তু তার পরিবার এবং অন্য সূত্র থেকে জানা যায়, এর পর সে ইউরোপ চলে যায়। সেখানেই সে বর্ণবাদী চিন্তার দ্বারা আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ হয় এবং পরিণত হয় এক বর্ণবাদী সন্ত্রাসীতে।

সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, ব্রেনটন একাই পাঁচটি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর এবং পরে অন্য মসজিদটিতে আক্রমণ চালায়। এটা তার একক এবং ব্যক্তিগত কাজ। এর সঙ্গে কোনো সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। আল-নূর মসজিদে ৪১ জন এবং অন্য মসজিদে ৮ জনকে হত্যা এবং অন্যদের আহত করে সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

গুলি চালানোর সময় সে আহতদের অনেককে বারবার গুলি করে তাদের জীবন শেষ করে। পরে আদালতে হাজির করা হলে তাকে বেশ হাসিখুশি দেখা যায় এবং তার মধ্যে অনুতাপের কোনো চিহ্নই দেখা যায়নি।

উপরন্তু সে খুব ফুর্তির সঙ্গে আদালতে সাংবাদিকদের শ্বেত সন্ত্রাসের প্রতীকী চিহ্ন দেখায়। এর থেকেই বোঝা যায়, কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের লোক বা সদস্য না হলেও ব্যক্তিগতদের তার মধ্যে বর্ণবাদী ঘৃণা কোনো পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে।

আসলে কোনো সুসংগঠিত সংগঠন না হলেও বর্ণ সন্ত্রাসীদের হাতে ২০১৭ সালেই ইউরোপ-আমেরিকায় সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা অনেক। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক একটি গ্রুপের হিসাবমতে ২০১৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকায় ১১৩টির মতো সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছে ৬৬ জন।

১৯৭০ সাল থেকে বর্ণবাদী হামলা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে এসেছে। শুধু ২০১৭ সালেই পশ্চিম ইউরোপে ৫৯টি হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি গ্রেট ব্রিটেন, ৬টি সুইডেনে এবং গ্রিস ও ফ্রান্সে দুটি করে ঘটনা ঘটেছে। নিউইয়র্কে Anti Defamation League নামে একটি সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী আমেরিকায় ২০১৮ সালে বিভিন্ন বর্ণবাদী হামলায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৭ সালে কানাডায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন ৬ জন (Daily Star, 17.03.2019)।

লক্ষ করার বিষয়, এসব আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগতভাবে, মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর মতো সাংগঠনিকভাবে নয়। আসলে এটা ঘটছে এ কারণে যে, বর্ণবিরোধী, মুসলিমবিরোধী ঘৃণা এখন ইউরোপ-আমেরিকায় রাষ্ট্রীয় ও সরকারি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্বারাই প্রচারিত হচ্ছে এবং সংবাদমাধ্যমগুলো এসব ধারণ করে নিজেরাও এই প্রচারের বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পশ্চিমা ইউরোপ এবং আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত দেশগুলোতে। ব্যক্তিগতভাবে লোকে এর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিণত হচ্ছে সন্ত্রাসীতে। অধিকাংশ সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে এভাবেই।

বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড অধিকাংশই এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত সন্ত্রাসীদের দ্বারা ঘটলেও এটা অস্বীকারের কিছু নেই যে, ইউরোপ-আমেরিকায় চরম দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নানা ধরনের সংগঠন গড়ে উঠছে এবং তারাই বর্ণবাদী প্রচার করছে। সংবাদমাধ্যমগুলো এই প্রচার নিয়মিতভাবেই করছে।

কিন্তু এ নিয়ে দুনিয়ায় কোনো হইচই নেই, যেমন আছে মুসলিম সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে। এর কারণ মুসলিম সন্ত্রাসবাদী সংগঠনই হোক অথবা খ্রিস্টান বা বর্ণবাদী সন্ত্রাসীই হোক, এরা সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের। নিজেদের প্রয়োজনেই তারা এগুলো সৃষ্টি করছে, আবার প্রয়োজন শেষ হলেই তারা সেগুলো ধ্বংস করে আবার নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ খাড়া করছে।

তবে মুসলিম সন্ত্রাসীদের কেন্দ্র করে যে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়, তার সামান্য অংশও পশ্চিমা অর্থাৎ ইউরোপ ও আমেরিকার শ্বেত সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে বলা হয় না। অনেকটা নীরবেই তারা কাজ করে। তবে যেসব চরম দক্ষিণপন্থী ধ্যান-ধারণা ও বর্ণবাদী চিন্তাভাবনা তারা প্রচারমাধ্যমে ছড়ায় তার দ্বারা ব্যক্তি পর্যায়ে লোকজন যে প্রভাবিত ও রূপান্তরিত হয়ে সন্ত্রাসীতে পরিণত হয় তার প্রমাণ নিউজিল্যান্ডের হত্যাকারী ব্রেনটেন।

অস্ট্রেলিয়া থেকে বের হয়ে ইউরোপ গিয়েই সে বর্ণবাদী সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়েছে। তার কথা হল, আমাদের ভূমিতে বহিরাগতদের ঠাঁই নেই, তাদেরকে মেরে তাড়াতে হবে। কিন্তু এসব সন্ত্রাসী এবং তাদের মগজ ধোলাই করনেওয়ালারা স্বীকার করে না যে, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কোনোটিই শ্বেতাঙ্গদের ভূমি নয়। এই দেশগুলো হল দেশীয় জনগণকে হত্যা করে, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা দখল করা দেশ।

বিশ্বের সব থেকে বড় এবং সব থেকে বিপজ্জনক সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দ্বারা সৃষ্ট ইসরাইল হল একটি ঘোষিত সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদের এমনই খেলা যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এখন হল এক আত্মপ্রচারিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ শক্তি।

তারা নিজেরা ১৯৭০ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তুলতে থাকলেও বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় তা উচ্চতার এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এ কারণে নিউজিল্যান্ডের হত্যাকারী ব্রেনটন হল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন বড় সমর্থক ও প্রশংসাকারী। এ কথা সে নিজের একটি ‘ম্যানিফেস্টোতে’ প্রচার করেছে হত্যাকাণ্ডের মুহূর্তেই দেশজুড়ে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এত নিকৃষ্ট বর্ণবাদী এবং চরম দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী যে তার মতো মুসলিমবিদ্বেষী প্রেসিডেন্ট আমেরিকায়ও আগে দেখা যায়নি। মুসলিমদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধ করার চেষ্টা করে ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন। এখন তিনি তার বর্ণবাদী-জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে মেক্সিকো ও আমেরিকার মধ্যে দেওয়াল তোলার এক কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এটা নতুন নয়।

নিজের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও তিনি তার এই কর্মসূচি বেশ জোরের সঙ্গেই প্রচার করেন। এখন এই দেওয়াল তোলা নিয়ে তিনি ডেমোক্রেটদের সঙ্গে এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। এ জন্য মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে।

এই নিম্নকক্ষের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বেশ ঘৃণার সঙ্গেই বলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতই নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য যে তিনি অভিশংসনের (impeachment) জন্যও যোগ্য নন। এই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন তার বর্ণবাদী-জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে মেক্সিকোর সীমান্ত বরাবর দেয়াল তোলার জন্য মরিয়া হয়ে মার্কিন ফেডারেল সরকারকে পর্যন্ত অকেজো করে রেখেছেন এবং এ ব্যাপারে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব নিম্নকক্ষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি নিজের ভোট ব্যবহার করে এই অর্থের সংস্থান করতে উদ্যোগী হয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডের দুই মসজিদে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটা এক বড় রকম বিপজ্জনক ব্যাপার। এই হত্যাকাণ্ড ঘাতক-সন্ত্রাসী ব্যক্তিগতভাবে করলেও আসলে এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। সমাজ ও জনগণকে বিভক্ত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদ যুগ যুগ ধরে যেসব নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করে এসেছে, সন্ত্রাসবাদ হল তারই এক আধুনিকতম সংস্করণ।

তারা এই সন্ত্রাস ব্যবহার করে নিজেদের হাজারো অপরাধী তৎপরতা, এমনকি নিজেদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পর্যন্ত আড়ালে রাখার ব্যবস্থা করে। তারা যে কত বড় সন্ত্রাসী তার সব থেকে বড় উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাসে হিরোশিমা-নাগাসাকিতে এটম বোমা নিক্ষেপ করে।

মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ হত্যা করেও তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণার এমনই মহিমা যে এর জন্য ট্রুম্যান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ফ্যাসিস্ট বলা হয় না। তাদেরকে চরম দক্ষিণপন্থী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলা হয় না। তারা হল এক মহৎ ও বৃহৎ ‘গণতান্ত্রিক’ দেশ!

আসলে সন্ত্রাসবাদী বর্ণবাদ, সন্ত্রাস ইত্যাদি শুধু যে অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে, তা নয়। এর বৃহত্তর লক্ষ্য হল নিজেদের দেশের শ্বেতাঙ্গদেরও দেশের ও জনগণের বিভিন্ন মৌলিক সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা ও আন্দোলন থেকে দূরে রাখা। তাদেরকে জাতীয় ঐক্যের নামে দেশের জনগণের বড় অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। কাজেই যে ধরনের সন্ত্রাসবাদ সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্টি করেছে কৃত্রিমভাবে এবং যা তারা দেশে ব্যবহার করছে তাদের প্রচারণা ও গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে, এটা প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বের জনগণের বিরুদ্ধেই এক গভীর চক্রান্ত এবং পুরোপুরি পরিকল্পিত।

১৮.০৩.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ঘটনাপ্রবাহ : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×