দুর্নীতি, নৈতিকতা ও সুশাসন

  ড. এসএম ইমামুল হক ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি

বঙ্গবন্ধুকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে। আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দু’বার সরকার পরিচালনা করার কারণে দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে।

উন্নতির এ ধারা অব্যাহত রাখতে জনগণ আবারও আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করেছে। আওয়ামী লীগের এ বিজয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয়।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বাংলাদেশকে পাকিস্তানের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তাদের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে এবারের নির্বাচনে। এমনটিই হওয়ার ছিল। দেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রকে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি একত্রে এবারের নির্বাচন করায় মুক্তিযুদ্ধ বিরুদ্ধশক্তি সমূলে উৎপাটিত হয়েছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এরপরও প্রধানমন্ত্রী এবার সব মন্ত্রী পদেই আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়েছে।

এ বিষয়টি অনেক দূরদৃষ্টি দিয়েই করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। এ কারণেই জনগণের অনেক আশা-আকাক্সক্ষা রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর কাছে সুনাম কুড়িয়েছে, সেগুলো অব্যাহত রাখতে হবে।

সবকিছু ছাপিয়ে বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি উন্নত দেশ। উন্নত দেশ হতে হলে আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি মানবিক দিক দিয়েও উন্নতি করতে হবে। সব পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে দুর্নীতির মতো কোনো বালাই থাকবে না।

বিভিন্ন সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার উপরের দিকে বাংলাদেশের নাম ছিল। আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় থাকতে চাই না। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, সারা বিশ্বেই দুর্নীতি হয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত টিআই’র প্রতিবেদনে কেউ একশ’তে একশ’ পায়নি। এটিই প্রমাণ করে কম-বেশি সব দেশেই দুর্নীতি হয়। তবে উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে দুর্নীতির পরিমাণ খানিকটা বেশি। আমাদের দেশে আইনের শাসন সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি দুর্নীতি রোধের বড় অন্তরায়। দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়া হয় না।

যদি উপযুক্ত সাজা হতো তাহলে তারা ভয়ে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকত না। উন্নত দেশগুলো দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিয়ে অপরাধের পরিমাণ কমিয়ে এনেছে। মানুষ কঠোর শাস্তির ভয়ে দুর্নীতি কম করছে।

যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের সঠিক প্রয়োগ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সুশাসন নিশ্চিত হবে না, দুর্নীতি প্রতিহত করা যাবে না। গত মেয়াদে সরকারে থাকার সময়ই প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এরই মধ্যে আমরা সাফল্য পেতে শুরু করেছি। জনগণের প্রত্যাশা, এবার তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন।

আমার বিশ্বাস, দুর্নীতি প্রতিহত ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে পদক্ষেপই নেবেন, জনগণ তাতে সার্বিক সহায়তা দেবে।

দুর্নীতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি সেক্টর আছে আমাদের দেশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টরে। এটি অনেক আলোচিত একটি বিষয়। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকই বের হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

আমরা যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছি, আমাদেরও অনেক করণীয় রয়েছে। আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে দুর্নীতি প্রতিহত করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো তদবির মানা যাবে না।

অফিসে দুর্নীতি কীভাবে হয়? চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে, প্রমোশন দেয়ার লোভ দেখিয়ে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান সুযোগ দেন বলেই অফিসের অনেকেই দুর্নীতি করার সুযোগ পায়। আমি নিজে যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেই, কঠোর হই, তাহলেই অধস্তনরা দুর্নীতি করার সাহস পাবে না। আগে নিজেকেই ঠিক হতে হবে।

আমি যদি অনিয়ম না করি, তাহলে অফিসের অন্যরাও অন্যায়-অনিয়ম করার সাহস পাবে না। এভাবে একে একে বদলে যাবে সবাই।

প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা জবাবদিহির ব্যাপারে অবহেলা করলে সুশাসন নিশ্চিত হবে না। আমি মনে করি, কাউকে বড় কোনো কাজের দায়িত্ব দেয়ার আগে তার যোগ্যতা, দক্ষতা, প্রজ্ঞা, সততা, বিচক্ষণতা, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়া উচিত। অনেক সময় অযোগ্য ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে।

সেসব জায়গায় ভালো কাজ হয় না। তার দুর্বলতার সুবাদে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তবে বিভিন্ন সেক্টর ডিজিটালাইজ্ড হওয়ার ফলে সুশাসন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তবে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

দুর্নীতি রোধ ও সুশাসনের জন্য যত রকম পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন, সেটা প্রয়োগ করতে হবে। সরকার শুদ্ধাচারের বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে। শুদ্ধাচার শুধু আর্থিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। শুদ্ধাচার হল কর্মীরা সময়মতো অফিস করছে কিনা। দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছে কিনা। চিকিৎসকদের দায়িত্বের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী চমৎকার বক্তব্য দিয়েছেন।

অনেক চিকিৎসক দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছেন না, ঢাকার বাইরে কিংবা মফস্বল শহরে থাকতেও তাদের অনীহা। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশে চিকিৎসকের স্বল্পতা আছে, এটা ঠিক। বাংলাদেশের সব অফিস-আদালতেই প্রয়োজনের তুলনায় কম কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও তাই। তার মানে এই নয় যে, আমি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করব না। প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখব। জনগণের অর্থে ডিগ্রি অর্জন করার পর সেটি জনগণের জন্য ব্যয় না করে নিজের স্বার্থে ব্যবহার কাম্য হতে পারে না।

আমরা দিন দিন দুর্নীতিগ্রস্ত কেন হচ্ছি? আমি মনে করি, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব। দেখা যায়, বাবা ঘুষ খাচ্ছে, মা তাতে কিছু বলেন না। ফলে ছেলেমেয়ে এটিকে স্বাভাবিক বিষয় মনে করে।

স্বভাবতই বড় হয়ে তারাও তা-ই করছে। বাচ্চাদের শেখানো যেতে পারে, বাবাকে জিজ্ঞাসা করো, তোমার বেতন কত টাকা? তুমি এত টাকা কোথায় পেলে? এভাবে প্রথমে পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। আগেকার দিনে মানুষের আয় কম ছিল; কিন্তু তাদের মধ্যে সততা ছিল। এখন মানুষের আয় বাড়লেও অসৎ কাজ করে বেড়ায় বেশি।

প্রতিটি বিদ্যাপীঠে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষায় নকল করা যে অন্যায়, তা স্কুল থেকেই শেখাতে হবে। আমাদের বাংলা বর্ণমালা বইয়ে শেখানো হয় ‘অ-তে অজগর, অজগর ওই আসছে তেড়ে’।

এর পরিবর্তে শেখানো যেতে পারে ‘অ-তে অসৎ, অসৎ ব্যক্তি দেশের শত্রু’। কোমলমতি ছেলেমেয়েদের শ্রেণীকক্ষে আমরা যদি এভাবে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দিতে পারি, সেটা তারা ধারণ করবে। পরিতাপের বিষয়, স্কুলগুলোতে নৈতিকতার পাঠ পাচ্ছে না ছাত্রছাত্রীরা।

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কতটুকু সততা, মূল্যবোধ শেখানো হয় জানি না। আমি মনে করি, কোর্স কারিকুলামে ন্যায়, নীতি, নিষ্ঠা, সততা, আদব-কায়দা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যতদিন পর্যন্ত না এগুলো আমরা শেখাতে পারব, ততদিন পর্যন্ত সমাজ উন্নত হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবেন। দুর্নীতি ঠেকাতে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবেন। এসব আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যাতে দুর্নীতিবাজরা বেরিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে, এই ভয়টা মানুষের মধ্যে ঢোকাতে পারলে সবাই ধীরে ধীরে দুর্নীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এসব বিষয় নিয়ে সরকারকে এখনই চিন্তাভাবনা করতে হবে। নৈতিকতামূলক শিক্ষা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগই পারে আমাদের এ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে।

ড. এসএম ইমামুল হক : শিক্ষাবিদ ও উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×