উপজেলা পরিষদের সীমাবদ্ধতা

  ফাইজুস সালেহীন ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপজেলা পরিষদের সীমাবদ্ধতা

কেমন হল প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচন? কেমন হবে পরের তিন ধাপের ইলেকশন? এ সময়ের গুরুত্বহীন প্রশ্নের একটা তালিকা করা হলে সম্ভবত শীর্ষে জায়গা করে নেবে এ দুটি প্রশ্ন।

অনেক উপজেলায় চেয়ারম্যানসহ একাধিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো লোকই যেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেখানে নির্বাচন কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। প্রথম ধাপে ৭৮ উপজেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ২৮ জন।

এ প্রার্থীদের মধ্যে পনেরজন নির্বাচিত হয়েছেন চেয়ারম্যান পদে। ব্যক্তির জন্য এ এক বিরাট অর্জন; খুবই সম্মানজনক। ভয়ে নয়, পরিস্থিতির পাকেচক্রেও নয়, প্রকৃতপক্ষেই সম্মান করে লোকে ওই ব্যক্তিদের নেতৃত্বের আসনে বরণ করে নেন।

এবারের উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইলেকটেড হলেন, তারাও সেরকম ব্যক্তিত্বের অধিকারী কিনা, সে তারা নিজেরাই ভালো জানেন।

প্রথম ধাপের নির্বাচনে সরকারি হিসাবে ভোট পড়েছে কমবেশি ৪৩ শতাংশ। এর মধ্যে ফেইক ভোট কত ভাগ, সে হিসাব অবশ্য পাওয়া যায়নি। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে যে হারে ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হয়, তার তুলনায় তেতাল্লিশ শতাংশ খুবই নগণ্য।

অথচ স্থানীয় সরকারের যে কোনো নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ার কথা। কারণ স্থানীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। তাছাড়া ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে বিভিন্ন পদে বহুসংখ্যক প্রার্থী মাঠ চষে বেড়ান, ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত করেন।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে, যতদূর মনে পড়ে ৬২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এবার কাস্টিং ভোটের হার তার চেয়েও অনেক কম। এতে প্রতীয়মান হয়, মানুষ ভোট প্রদানে আগের মতো আর উৎসাহবোধ করছে না।

কিন্তু কেন? এই কেন’র উত্তর খুঁজতে গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থার যে জীর্ণ ইমারতটি বেরিয়ে আসবে, গণতান্ত্রিক মনের জন্য তা মোটেও প্রীতিপ্রদ নয়। ইলেকশন কমিশনও মনে হয় এখন বিষয়টি নিয়ে বিচলিতবোধ করছে।

সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানের কর্তারা আড়মোড়া ভেঙে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে চাইছেন যেন! ইলেকশনে যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সেজন্য কয়েকজন এমপিকে এলাকায় না থাকতে বলা হয়েছে।

প্রথম ধাপের ভোটের দিন কয়েকজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে আটকও করা হয়েছে অনিয়মের অভিযোগে। কমিশনের পক্ষ থেকে কথাবার্তাও বলা হচ্ছে কড়া হেডমাস্টারের মতো। এও কম কিসে!

স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনটি প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অংশগ্রহণমূলক না হলেও নতুন মেয়াদে উপজেলা পর্যায়ে নতুন পরিষদ কার্যভার নিতে যাচ্ছে। সঙ্গে থেকে যাচ্ছে পুরনো প্রশ্নটিও। সাড়ে তিন দশক আগে যে উদ্দেশ্য নিয়ে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের বিধান করা হয়েছিল, তার কতখানি পূরণ হয়েছে এতদিনে?

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও সংহত করা ছিল এ সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বলা হয়েছিল, একটি এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই তা স্থির ও বাস্তবায়ন করবেন।

বিচার ও প্রশাসনকে পৌঁছে দেয়া হবে জনগণের দোরগোড়ায়। এইচএম এরশাদ তিরাশি সালে বিকেন্দ্রীকরণের স্লোগান দিয়ে প্রথম পর্যায়ে কিছুসংখ্যক থানাকে উন্নত থানায় রূপান্তরিত করেন। সার্কেল অফিসারের জায়গায় বসানো হয় থানা নির্বাহী অফিসার।

সার্কেল অফিসাররা ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন না। কিন্তু নির্বাহী অফিসার (টিএনও) বিসিএস ক্যাডার। টিএনওশাসিত মান উন্নীত থানার এ ব্যবস্থাটি আসলে ছিল উপজেলা হয়ে ওঠার কসরত।

স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ১৯৮৪ সালে সব থানা উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের বিধান করা হয়। উপজেলা সদরে তখন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টও বসানো হয়।

উপজেলা পর্যায়ের সব বিভাগ চলে আসে উপজেলা পরিষদের অধীনে। উপজেলার কর্মকর্তাদের কাজের বার্ষিক মূল্যায়নের ক্ষমতাও প্রাপ্ত হলেন উপজেলা চেয়ারম্যান। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, কৃষি, সমবায়, ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমের তদারকি- মোটামুটি সবই উপজেলা পরিষদের আওতায় চলে আসে। তখন দেশে কোনো পার্লামেন্ট ছিল না, এমপি ছিলেন না।

ফলে উপজেলায় চেয়ারম্যানই হয়ে উঠলেন বলা যায় সর্বেসর্বা। কিছুটা সমস্যা দেখা দিল ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর। কার ক্ষমতা বেশি- এমপির, না উপজেলা চেয়ারম্যানের? এমপি উপজেলার কাজে নাক গলানোর কসরত করতে লাগলেন।

কিন্তু পেরে উঠেননি। কেননা উপজেলার চেয়ারম্যানও জনগণের ভোটে নির্বাচিত। দলাদলি, মনকষাকষি শুরু হয়ে গিয়েছিল তখনই। তা সত্ত্বেও এইচএম এরশাদের শাসনামলে উপজেলার অস্তিত্ব বেশ ভালোভাবেই দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পেরেছিল।

গোল বাধলো ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর। বিএনপির ‘আপসহীন’ নেতৃত্ব প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ তথা উপজেলা পদ্ধতি কখনই মেনে নেয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ বাতিল করে দেয়।

উপজেলা বাতিল করে দেয়ার পেছনে আরও একটি বড় কারণ ছিল এই যে, তারা পার্লামেন্টের বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের, বিশেষ করে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যদের নখ-দন্তহীন দেখতে চায়নি। নন পার্টিজান অথবা বিরোধী দল সমর্থক উপজেলা চেয়ারম্যানদের ওপর ভরসা করতে পারেনি। কাজেই প্রথম রাতেই বিড়াল মেরে ফেলতে তারা দ্বিধা করেনি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে উপজেলা পদ্ধতি পুনরুজ্জীবিত করলেও সেই মেয়াদকালে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনটি করা সম্ভব হয়নি। উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে অপ্রকাশ্যে বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছিল সংসদ সদস্যদের এক বড় অংশের আপত্তি।

উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা কী হবে- এ প্রশ্নের মীমাংসা করতেই চলে যায় দেড়-দুই বছর। আটানব্বই সালে আইন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানানো হল। তারপরেও নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। প

রের মেয়াদে আবার বিএনপি যখন ক্ষমতায়, তখন তারাও এ নিয়ে টুঁ-শব্দটি করল না। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে অল্পকালের মধ্যেই উপজেলা পরিষদের একটা নির্বাচন করতে সক্ষম হয়। এর আগে টানা আঠারো বছর কোনো উপজেলা পরিষদ ছিল না।

কাগজপত্রে উপজেলা পদ্ধতিটি গণতান্ত্রিক। মাসিক সমন্বয় সভায় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে আসা প্রকল্পগুলো বিচার-বিবেচনা করে অনুমোদন দেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছাড়া অন্য প্রায় সব বিভাগের দেখভাল করার দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের।

প্রাথমিক শিক্ষা উপজেলা পরিষদের আওতাধীন থাকলেও হাইস্কুল ও কলেজ শিক্ষার ব্যাপারে এ পরিষদের কিছুই বলার নেই। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ উপজেলার ষোলো-সতেরটি বিভাগের জন্য রয়েছে উপজেলা পরিষদের বিভাগীয় উপকমিটি। তারপরও সমালোচকরা বলেন, উপজেলা পরিষদ আসলে ঠুঁটো জগন্নাথ, রাবার স্ট্যাম্প।

স্থানীয় সংসদ সদস্যের ইচ্ছার বাইরে পরিষদের কিছুই করার নেই। পরিষদের সমন্বয় সভায় যে কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা যতই হোক, যত প্রস্তাবই গৃহীত হোক না কেন, এমপি সাহেব না বলে দিলে, কিছুই হয় না। উপদেষ্টা সংসদ সদস্যই আসলে সব ক্ষমতার অধিকারী। এক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য বলে কিছু নেই।

আর কিছু কিছু বিষয়ে উপজেলা পরিষদের কথা বলারই অধিকার নেই। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত চেয়ারম্যান বা পরিষদের অন্য কোনো কর্মকর্তা যদি শাসক দলের সমর্থক না হয়ে থাকেন, তাহলে তার অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি ভয়ে থাকেন কখন খড়গ নেমে আসে, ক্ষমতা তো পরের কথা।

কারও কারও অবস্থা এমন হয়ে দেখা দেয়- ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। এ ধরনের দৃষ্টান্ত অনেক আছে। এই যখন অবস্থা, তখন উপজেলা পরিষদ কতটা শক্তিশালী ও কার্যকর হতে পারে; তা সহজেই অনুমেয়।

আমাদের দেশে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের গণতন্ত্র চালু রয়েছে। এ গণতন্ত্রে তো বটেই, প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির গণতন্ত্রেও সংসদ সদস্যদের মর্যাদা অনেক উঁচুতে। যৌথভাবে তাদের ক্ষমতাও অনেক। তারা যৌথভাবে সরকার ফেলে দিতে পারেন, সরকার গঠন করতে পারেন। সরকারের সিদ্ধান্ত তারা আটকে দিতে পারেন, বদলে দিতে পারেন।

তারাই দেশের নীতিনির্ধারণ করেন। পার্লামেন্ট কতটা শক্তিশালী, আমেরিকা ও ব্রিটেনের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলী তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। আমাদের দেশে পার্লামেন্ট অতটা শক্তিশালী নয়। সংসদ সদস্যরা সত্তর অনুচ্ছেদে বাধা। পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যরা নির্বাধ না হলেও স্থানীয় প্রশাসনে আমাদের এমপিরা বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

সব গণতান্ত্রিক দেশেই স্থানীয় সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংসদ সদস্যকে অবহিত রাখার রীতি-বিধান রয়েছে। কারণ তারা পার্লমেন্টে নিজের নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাকে অবহিত করা না হলে তিনি কী করে সংসদে এলাকার সমস্যা-সম্ভাবনার কথা তুলে ধরবেন? এলাকার এমপি হিসেবে তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শও দিতে পারেন বৈকি। কিন্তু সেই পরামর্শ গ্রহণ করা পরিষদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

যারা সচেতন, তারা বলেন- স্থানীয় সরকার সংস্থার কাজ তাদেরকেই করতে দিতে হবে। এতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না। উপজেলা পরিষদের কাজের আওতা বাড়ানো দরকার। কেবল প্রাথমিক শিক্ষা নয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য উপজেলা পরিষদের নজরদারির সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়।

উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা গেলে সর্বক্ষেত্রে তৈরি হতে পারে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। আর এ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং সেবামূলক সব কার্যক্রমের মানোন্নয়ন ও গতিশীলতা। উপজেলা পরিষদকে আরও গতিশীল ও সক্ষম করে তোলার প্রশ্নটি উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়।

ফাইজুস সালেহীন : সাংবাদিক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : উপজেলা নির্বাচন ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×