তৃতীয় মত

কালরাত্রির কালো উপাখ্যান

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কালরাত্রির কালো উপাখ্যান
ফাইল ছবি

এ যুগে বহু হত্যাকাণ্ড হয়েছে। যেগুলোকে বলা হয় বর্বর গণহত্যা। যেমন জালিয়ানওয়ালাবাগ, শার্পভিল, মাইলাই হত্যাকাণ্ড এবং অন্যায় ও অবৈধ যুদ্ধে ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে লাখ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশু হত্যা। যাদের সংখ্যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। আবার কোনো কোনো দেশে চলেছে গণহত্যার পাশাপাশি সিলেক্টেড কিলিং। যেমন- গত শতকের ত্রিশের দশকে জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে হয়েছে।

জার্মানিতে ইহুদি হত্যার পাশাপাশি চলেছে বুদ্ধিজীবী নির্যাতন এবং হত্যা। রোমা রোঁলাকে হিটলারের কারাগারে জীবন দিতে হয়। টমাসম্যানসহ অসংখ্য সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর বই পুড়িয়ে ফেলা হয়। ইতালিতে মুসোলিনীর ফ্যাসিস্ট দলের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য আগে বিখ্যাত সাহিত্যিকসহ আলবার্তো মোরাভিয়াকেও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।

কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড ও বর্বরতাকে ম্লান করেছে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে (তখন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের বর্বর হত্যাকাণ্ড। একদিকে চলেছে গণহত্যা ও গণধর্ষণ, অন্যদিকে চলেছে তালিকাভুক্ত দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ও ১৪ ডিসেম্বর- এই দুটি দিবসই চিহ্নিত হয়ে আছে বুদ্ধিজীবী হত্যার কালো দিবস হিসেবে। আজ ২৫ মার্চের সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশেই আমার এই শ্রদ্ধা নিবেদন।

এই বুদ্ধিজীবীদের একমাত্র অপরাধ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির প্রতি সমর্থন। তারা কোনো কোনো দেশের বুদ্ধিজীবীদের মতো অস্ত্র হাতে নেননি। তাদের হাতিয়ার ছিল শুধু কলম। তারপরও তাদের অনেককে গভীর রাতে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তুলে নিয়ে নির্মম অত্যাচার দ্বারা হত্যা করা হয়েছে। ঢাকার রায়েরবাজারের বধ্যভূমির দৃশ্য অনেককে ভিয়েতনামের মাইলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিহতদের কারও চোখ খুলে নেয়া হয়েছে। কারও হাত, কারও পা কাটা হয়েছে। এক নারী সাহিত্যিককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তারও উলঙ্গ এবং নির্মমভাবে নির্যাতিত দেহটি পাওয়া গিয়েছিল।

শহীদ মুনীর চৌধুরী এক সময় একজন রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্ট ছিলেন। কিন্তু শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. গোবিন্দ দেবসহ অনেকেই ছিলেন নিরীহ মননশীল পণ্ডিত। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তারা। এই শহীদদের মধ্যে কেউ ছিলেন বিখ্যাত ক্রীড়াবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক বা সঙ্গীতজ্ঞ। ডা. ফজলে রাব্বি ছিলেন প্রগতিশীল মতামতের একজন বিখ্যাত চিকিৎসক। ললনা পত্রিকার সম্পাদিকা এবং মেহেরুন্নেসা ছিলেন উদীয়মান কবি।

সবচেয়ে লজ্জা ও ক্ষোভের বিষয়, বাংলাদেশের এই বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকাটি তৈরি করে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর হাতে দিয়েছিল বাংলাদেশেরই একদল কুলাঙ্গার দেশদ্রোহী জামায়াতি নেতা ও কর্মী। এমনকি গভীর রাতে এই তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে হানাদারদের হাতে সমর্পণের কাজটি করেছে জামায়াত এবং তাদের সৃষ্ট রাজাকার, আলশামস ও আলবদরের দল। এরা শুধু দেশের সেরা মাথা ও মস্তিষ্ককে হত্যা করেনি, স্বজাতি ও স্বধর্মের মানুষের রক্তে হাত রাঙিয়েছে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর হাত রাঙা ছিল লাহোরে কাদিয়ানিবিরোধী দাঙ্গায় নিহত ৫০ হাজার মানুষের রক্তে। তার যোগ্য পূর্ব পাকিস্তানি শিষ্য গোলাম আযম আদালতের বিচারে দণ্ডিত হয়েছেন তিরিশ লাখ নর-নারী হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার সহযোগী হিসেবে।

সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যেসব শহীদের নাম লেখা আছে তাদের অধিকাংশের সঙ্গেই আমি ছিলাম ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন আমার শিক্ষক। সিরাজউদ্দীন হোসেন ছিলেন আমার সাংবাদিক শিক্ষক ও সহকর্মী। ডা. আলীম চৌধুরী ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ডা. ফজলে রাব্বির রোগী ছিলাম তিন বছর। শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো। তার ছোট ভাই সাহিত্যিক ও চিত্রপরিচালক জহির রায়হান ছিল আমার সহপাঠী। তাকে হত্যা করা হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে মোহাম্মদপুরে গিয়ে সে আর ফিরে আসেনি।

পাকিস্তানি আমলের এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পর তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপির শাসনামলে। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তারাও জামায়াত অথবা জামায়াতের উপদলগুলোর ঘাতক বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার চেষ্টা হয়। তিনি ভাগ্যের জোরে বেঁচে যান। খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এই হত্যা-প্রচেষ্টার নিন্দা করা দূরের কথা, ঠাট্টার মুখে বলেছেন, ‘শামসুর রাহমানকে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে বলে একটা নাটক সাজানো হয়েছে।’ বুদ্ধিজীবী হুমায়ুন আজাদকেও বাংলা একাডেমির কাছে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত করা হয়। তিনিও মৃত্যু এড়াতে পারেননি।

শহীদ কিবরিয়াও শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না। ছিলেন বুদ্ধিজীবীও। তাকে বোমা হামলায় হত্যা করা হয়। এ রকম হত্যাকাণ্ড আরও চলেছে। তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। শেখ হাসিনার ওপর যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল তাতে তিনি আহত হয়েছেন, কপালগুণে বেঁচে গেছেন। এই প্রতিটি হত্যা-প্রচেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডে বিএনপি এবং জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এগুলো যে ’৭১-এর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যারই অনুসরণ ও ধারাবাহিকতা তাতে সন্দেহ পোষণের কোনো কারণ আছে কি? উদ্দেশ্যও একটাই, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিকেশ করে দেশটাকে মেধাশূন্য ও রাজনৈতিক নেতাশূন্য করা। তাহলে দেশটাকে আবার পাকিস্তানের ছায়ারাষ্ট্র, চাই কি পুরো তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করা সহজ হবে। দেশটিতে কোনো প্রতিরোধ থাকবে না। এই উদ্দেশ্যে ’৭১ সালে বাংলাদেশকে বধ্যভূমিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছে পাকস্তানি হানাদাররা। পরবর্তী সময় চেষ্টা করেছে তাদের দেশি দোসররা।

বাংলাদেশের মানুষ সাহসী এবং সচেতন, তাই ’৭১-এর হানাদারদের যেমন তারা সশস্ত্র যুদ্ধে হারিয়েছে, তেমনি তাদের দোসরদের সন্ত্রাসকে পরাজিত করতে পেরেছে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, শহীদদের রক্তদান ব্যর্থ হয়নি।

লন্ডন ২৪ মার্চ, রোববার, ২০১৯

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×