ছয় দফাই ছিল স্বাধীনতার বীজমন্ত্র

  তোফায়েল আহমেদ ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৬ দফা দাবি
৬ দফা দাবি। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ ছিল শুক্রবার। ২৫ মার্চ রাত ১১টায় আমি আর মণি ভাই বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিই। রাত ১২টায় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী জিরো আওয়ারে শুরু করে বাঙালি নিধনযজ্ঞ, যা অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।

বঙ্গবন্ধু ঘোষিত শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবিকে সশস্ত্র পন্থায় নিশ্চিহ্ন করতেই এ গণহত্যা। চারদিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে তখন বাজছে বিদায় বেলায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘তোমাদের যে দায়িত্ব আমি দিয়েছি, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করো। আমার জন্য ভেবো না।

আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, আমার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। ওরা অত্যাচার করবে, নির্যাতন করবে। কিন্তু আমার বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ বর্বর পাকিস্তান বাহিনী বাংলার মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

মার্চের ২৬ তারিখ প্রথম প্রহরেই সারা দেশসহ ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়। এ অবস্থায় রাতে খবর পেলাম বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সকালে ইয়াহিয়া খান তার ভাষণে সারা দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘সপ্তাহ খানেক আগেই আমার উচিত ছিল শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা...। ...কেননা কয়েকটি শর্ত দিয়ে সে আমাকে ট্র্যাপে ফেলতে চেয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সে আক্রমণ করেছে, এ অপরাধ বিনা শাস্তিতে যেতে দেয়া হবে না।’

২৭ মার্চ যখন ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়, তখন আমি আর মণি ভাই গুলিস্তান দিয়ে নবাবপুর রোড ধরে সদরঘাট গিয়ে কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করি। পেছনে পড়ে থাকে ধ্বংস আর মৃত্যু উপত্যকাসম রক্তাক্ত ঢাকা নগরী। যাওয়ার সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দফায় দফায় প্রচারিত এমএ হান্নান সাহেবের ভাষণ শুনি, ‘কে বলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে? তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন।’

সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে হান্নান সাহেব এবং অন্য নেতারা বিরামহীনভাবে ঘোষণা দিতে থাকেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে আমাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।’ এরপর সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়।

টানা ২৪ দিন চলা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন আর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে অবশেষে গণহত্যার দিকে এগিয়ে যায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ২৫ মার্চ জিরো আওয়ারে গণহত্যা শুরুর আধঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’।

স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হল, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিও’র সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে ক্ষীণস্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ওই কণ্ঠের বাণী মনে হল পূর্বেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল।

তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।” স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তিনি আরও লিখেছেন, “ঘোষণায় বলা হয়, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে’।”

প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য এ রকম একটি চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়ার উত্তুঙ্গ অবস্থায় পৌঁছতে বঙ্গবন্ধুকে দীর্ঘ ২৪টি বছর ধরে নিজকে, দলকে এবং বাঙালি জাতিকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লক্ষ্য স্থির করে, ধাপে ধাপে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে, জেল-জুলুম-হুলিয়া, ফাঁসির মঞ্চ উপেক্ষা করে মৃত্যুঞ্জয়ী শক্তি নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়েছে।

একদিনে হয়নি। বহু বছর ধরে, অগণিত মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতি আজ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে শিরোধার্য করেছে। তাই বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা ’৭১-এর এপ্রিলের ১০ তারিখে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৬নং প্যারায় অনুমোদিত হয়ে সাংবিধানিক বৈধতা অর্জন করেছে।

স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরিস্থিতির শুরুটা হয়েছিল মূলত ৬ দফা দেয়ার মধ্য দিয়েই। ৬ দফাই ছিল স্বাধীনতার বীজমন্ত্র। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ ৬ দফাকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বহু ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু ৬ দফার প্রতি বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় স্থির-প্রতীজ্ঞ তাকে জনমনে জনগণমন অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

আর আমরা যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারা ’৬৯-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ৬ দফাকে দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনসমেত ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে সারা বাংলার গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে-কলে-কারখানায় ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। ফলে ১১ দফা আন্দোলনের পক্ষে সারা দেশে গণজোয়ার তৈরি হয় এবং বৈপ্লবিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।

এ অবস্থায় শাসকশ্রেণী আমাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পায়। তাদের এ অপপ্রয়াসের সমূচিত জবাব দিতে ’৬৯-এর ৯ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শপথ দিবসের জনসমুদ্রে বলেছিলাম, ‘পূর্ব বাংলার মানুষ কোনোদিন বিচ্ছিন্নতাকে প্রশ্রয় দেয়নি এবং বিচ্ছিন্নতায় বিশ্বাসীও নয়। কারণ তারা সংখ্যায় শতকরা ৫৬ জন।

যদি কারও পূর্ব বাংলার সঙ্গে থাকতে আপত্তি থাকে তবে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।’ পাকিস্তানিরা গণহত্যা চালানোর আগ পর্যন্ত কোনো উগ্রতাকে, অতি বিপ্লবীপনাকে আমরা প্রশ্রয় দেইনি। নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও সব রাজবন্দির মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি যেদিন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘সংখ্যা সাম্য নয়, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব চাই, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার চাই আর সার্বভৌম পার্লামেন্ট চাই।’

গোলটেবিল বৈঠকের পর যখন মার্চের ২৫ তারিখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেন, তখন তিনি বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক উত্থাপিত দাবিগুলো মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করেন। এবং ’৭০-এর ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২ অনুযায়ী লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) জারি করেন। সর্বমোট ৪৮টি অনুচ্ছেদ সংবলিত এ এলএফওতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব মেনে নেয়া হয়। জাতীয় পরিষদে ৩১৩টি আসনের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে আমরা পেলাম ১৬৯টি।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও যাতে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে না পারেন সে জন্য ইয়াহিয়া খান এলএফওতে বিতর্কিত ২৫ ও ২৭নং অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করেন। ২৫নং অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল ‘শাসনতন্ত্রের প্রমাণীকরণ’। এতে বলা হয়েছিল, ‘জাতীয় পরিষদে গৃহীত শাসনতন্ত্র বিল প্রমাণীকরণের জন্য প্রেসিডেন্টের নিকট উপস্থাপিত হবে।

এই পর্বে প্রমাণীকরণ প্রত্যাখ্যাত হলে জাতীয় পরিষদের অবস্থান লুপ্ত হবে।’ আর ২৭নং অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল ‘আদেশের সংশোধন এবং ব্যাখ্যা, ইত্যাদি’। এর ক-ধারায় ছিল, ‘এই আদেশের কোনো আইনের ধারা সম্পর্কে কোনো ধারণা, কোনো ব্যাখ্যা বা কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সে সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে এবং এ ব্যাপারে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।’ একই অনুচ্ছেদের খ-ধারায় ছিল, ‘জাতীয় পরিষদ নয় বরং রাষ্ট্রপতিই এই আদেশের সংশোধনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী।’ এলএফওতে সন্নিবেশিত দুটি ধারাই ছিল আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ঠেকানোর অপপ্রয়াস।

বস্তুত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য খুবই বিরক্তিকর এবং তিনি আমাদের প্রায়ই বলতেন, ‘নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলব।’ এলএফওতে এরকম দুটি বিতর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে সামরিক শাসকদের হিসাবের ছক ছিল যে, নির্বাচনে কেউ-ই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। সুতরাং, একদিকে কোয়ালিশন সরকার গঠনের অনিবার্যতা, অপরদিকে এলএফওতে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রেসিডেন্টের হস্তে চূড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত থাকায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কোনোভাবেই ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা সম্ভবপর হবে না।

উপরন্তু, এলএফওতে ১২০ দিনের মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করার বাধ্যবাধকতাও ছিল। ফলে এলএফও কাঠামোতে নির্ধারিত সময়ে শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নে ব্যর্থ হলে জাতীয় পরিষদ বিলুপ্ত হবে এবং সামরিক শাসন চলতে থাকবে। আর যদি স্বাধীনতা ঘোষণার মতো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করে, তবে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে আফ্রিকার বায়াফ্রার মতো নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হবে এবং সে ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের তথা জাতিসংঘের সমর্থনও পাওয়া যাবে।

এভাবেই ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার ও কুমন্ত্রণাদাতা ভুট্টো তাদের ধীরলয়ে নেয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সামনে যে বিষয়টি প্রকট করে তুলছিলেন তা হচ্ছে, হয় এলএফও নির্ধারিত একটি শাসনতন্ত্র মেনে নাও, অন্যথায় সামরিক শাসন অব্যাহত থাকবে। সামরিক শাসকদের অনুমান ছিল এ দুয়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মন্দের ভালো হিসেবে একটিই বেছে নেবেন। এভাবেই পাকিস্তানের অতীত ছায়া ফেলছিল বর্তমান তথা ভবিষ্যতের ওপর। বঙ্গবন্ধু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগ্রামের পথেই এগিয়েছেন।

এমন একটি ভবিতব্য এড়িয়ে পাক সামরিক কর্তৃপক্ষের চাতুর্যপূর্ণ অপপ্রয়াসের বিপরীতে গণনায়ক বঙ্গবন্ধু সর্বব্যাপী নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই নির্বাচন ছিল তার সমগ্র জীবনের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তান সামরিকচক্রের চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রতিটি জনসভাতেই তিনি বলেছেন, ‘২২ বছরের পুরনো ক্ষমতাসীন চক্রের জানা উচিত তারা আগুন নিয়ে খেলছেন।’

সেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী সফরসঙ্গী হয়ে সারা দেশ সফর করেছি। নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিতে, গণরায় নিতে প্রতিটি সভায় তিনি বলতেন, ‘এ নির্বাচন বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা ও ১১ দফার পক্ষে গণভোট। আপনাদের অধিকার আদায়ের জন্য আমি যদি আমার জীবনের যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি, ফাঁসির মঞ্চে যেতে পারি, তবে কি আমি আপনাদের কাছে আমার ৬ দফার পক্ষে একটি ভোট চাইতে পারি না?’ মানুষ দু’হাত তুলে তাকে সমর্থন জানাত।

বাংলার মানুষের স্বাধিকারের দাবিতে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা-বিবৃতির বিপরীতে ভুট্টো সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেন। আর বঙ্গবন্ধু জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করেন। ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান। শপথগ্রহণ করাবেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। সেদিন বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘৬ দফা ও ১১ দফা আজ আমার নয়, আমার দলেরও নয়।

এ আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে বাংলার মানুষ তাকে জ্যান্ত সমাধিস্থ করবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও।’ সেদিন বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় নির্বাচনী ফলাফলে আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে সবাইকে হুশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের কাছে দেনা হয়তো আবারও রক্তেই পরিশোধ করতে হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে নস্যাৎ করার জন্য চক্রান্ত চলছে, এর বিরুদ্ধে আসন্ন সংগ্রামের জন্য সবাই প্রস্তুত থাকবেন।’

চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য বঙ্গবন্ধু সদা-সচেতন ছিলেন। এরপর জেনারেল ইয়াহিয়া ’৭১-এর ১১ জানুয়ারি ঢাকা এসে ১২ ও ১৩ জানুয়ারি দুই দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দু’দফা আলোচনায় মিলিত হন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে তেজগাঁও বিমানবন্দরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তার সঙ্গে আলোচনা সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন তা পুরোপুরি সঠিক।’

ঢাকা থেকে ফিরে ইয়াহিয়া খান লারকানায় ভুট্টোর বাসভবনে যান এবং সেখানে জেনারেলদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। মূলত লারকানা বৈঠকেই নির্বাচনী ফলাফল বানচালের নীলনকশা প্রণীত হয়।

এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি এক সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ৩ মার্চ বুধবার ৯টায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। এদিকে ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

ওয়ার্কিং কমিটি আলোচনা অনুমোদন করে এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও অধিকার আদায়ের জন্য যে কোনো পন্থা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার প্রদান করে।’ ১৫ ফেব্রুয়ারি ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু চক্রান্তকারীদের হুশিয়ার করে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট পন্থা পরিহার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংখ্যাগুরুর শাসন মেনে নিয়ে দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখুন।

জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থা বানচাল করার যে কোনো উদ্দেশ্যে তৎপর গণতান্ত্রিক রায় নস্যাৎকারীরা আগুন নিয়ে খেলবেন না। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দেয়া অধিকার বলে আমরা ৬ দফার ভিত্তিতেই শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করব। সাত কোটি বাঙালির বুকে মেশিনগান বসিয়েও কেউ ঠেকাতে পারবা না।’

একই দিনে ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ৬ দফার ব্যাপারে আপস বা পুনর্বিন্যাসের আশ্বাস পাওয়া না গেলে তার দল জাতীয় পরিষদের আসন্ন ঢাকা অধিবেশনে যোগদান করতে পারবে না।’ ১৭ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো তার পার্টি অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের যে অধিবেশন শুরু হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পিপলস পার্টির জন্য তাতে যোগদান করা একেবারেই অর্থহীন।’

এরপর ১৮ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো তার সহকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি ও সেনাবাহিনী- দেশে এই তিনটি শক্তিই আছে, আমরা কোনো চতুর্থ শক্তির কথা স্বীকার করি না।’ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে অস্বীকার জ্ঞাপন করলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার জন্য ভুট্টোকে আমন্ত্রণ জানান। ১৯ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে ৫ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

১৭ জানুয়ারির লারকানা বৈঠক এবং ১৯ ফেব্রুয়ারির রাওয়ালপিন্ডি বৈঠকেই গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। পিন্ডি থেকে করাচি ফিরে ভুট্টো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা তার নেই।’ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামরিক চক্র ’৭০-এর নির্বাচনে বাঙালির গণরায় বানচাল করার জন্য ভুট্টোর সঙ্গে একত্রে খলনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

ভুট্টো যখন বারবার জাতীয় পরিষদে যোগদানে তার অক্ষমতার কথা প্রকাশ করছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখন অধিবেশনে যোগদানের জন্য আওয়ামী লীগকে প্রস্তুত করেন। এরই অংশ হিসেবে ’৭১-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে যথাক্রমে বঙ্গবন্ধু ও মনসুর আলী নেতা, জাতীয় পরিষদে উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং এএইচএম কামরুজ্জামান সচিব নির্বাচিত হন।

এ ছাড়াও ইউসুফ আলী চিফ হুইপ, আবদুল মান্নান ও আমীর-উল ইসলাম হুইপ নির্বাচিত হন। এরপর আসে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। ’৭১-এর শহীদ দিবস ছিল সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এদিন মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বাংলার স্বাধিকার, বাংলার ন্যায্য দাবিকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র চলছে। এখনও চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। কিন্তু বাংলার সাত কোটি মানুষ আর বঞ্চিত হতে রাজি নয়। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব। আর শহীদ নয়, এবার গাজী হয়ে ঘরে ফিরব। বাংলার ঘরে ঘরে আজ দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।

ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে হবে আমাদের সংগ্রাম। মানুষ জন্ম নেয় মৃত্যুর জন্য; আমি আপনাদের কাছে বলছি এ বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে আমাকে আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছে, আমিও আপনাদের জন্য নিজের রক্ত দিতে দ্বিধা করব না। বাংলার সম্পদ আর লুট হতে দিব না।’ ২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং পিন্ডিতে গভর্নর ও সামরিক প্রশাসকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।

ওই বৈঠকে লারকানা ও রাওয়ালপিন্ডি বৈঠকের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা চূড়ান্ত করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি করাচি প্রেসিডেন্ট হাউসে আবার ভুট্টো-ইয়াহিয়া শলা-পরামর্শ শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির সংবর্ধনা সভায় প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের আহ্বান জানান। একই দিন লাহোরে এক জনসভায় ভুট্টো হুমকি দেন, ‘তার দলের কোনো সদস্য যদি পরিষদ অধিবেশনে যোগদান করে তাহলে দলের সদস্যরা তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার দল খাইবার থেকে করাচি পর্যন্ত সবকিছু অচল করে দেবে।’ এ ছাড়াও জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানি যেসব সদস্য অধিবেশনে যোগদানের জন্য ইতিমধ্যেই ঢাকা গিয়েছেন, তারা ফিরে গেলেই তিনি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ারও হুমকি দেন। ভুট্টোর এসব হঠকারী বক্তৃতা-বিবৃতির একটিই উদ্দেশ্য ছিল- যে কোনো মূল্যে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা। ষড়যন্ত্রকারীদের নীলনকশা অনুযায়ী বাংলার মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য অবশেষে ’৭১-এর ১ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ তারিখে ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করেন।

জাতীয় পরিষদ স্থগিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভুট্টো ও জেনারেলদের মধ্যকার ঐকমত্য জনসাধারণে প্রকাশিত হয়। এ রকম একটি ষড়যন্ত্র যে হতে পারে এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু আগেই আমাদের ধারণা দিয়েছিলেন এবং তার অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার করে জনসাধারণের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এহেন বক্তব্যে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা নগরী। এদিন হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় ৬ দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় বিক্ষুব্ধ মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে এসে সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে।

বঙ্গবন্ধু হোটেলের সামনে এসে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অধিবেশন বন্ধ করার ঘোষণায় সারা দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ। আমি মর্মাহত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আমি সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। সংগ্রাম করেই মুক্তি আনব। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন।’ বিকাল ৩টায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে প্রতিবাদ সভা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পল্টন ময়দানের স্বতঃস্ফূর্ত জনসভার জনসমুদ্রের উদ্দেশে বলি, ‘আর ৬ দফা ও ১১ দফা নয়। এবার বাংলার মানুষ ১ দফার সংগ্রাম শুরু করবে। আর এই ১ দফা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

আজ আমরাও শপথ নিলাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ সুশৃঙ্খল সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’ প্রতিবাদ সভায় আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই। আজকাল অবাক হয়ে লক্ষ করি ইতিহাস বিকৃতির ধারায় অনেকেই মননের দীনতা ও নীচতা প্রকাশ করেন বিভিন্ন মিডিয়ায়। কেউ পতাকা তুলেছেন, কেউবা আবার ঘোষণা দিয়েছেন ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ না দিলে তো স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদই গঠিত হতো না। পতাকা তোলার প্রশ্ন তো অবান্তর। সমগ্র জাতিসহ গোটা বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর দিকে।

তিনি ছিলেন জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা না দিলে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা হতো না। এই মামলা না হলে ১১ দফার ভিত্তিতে ’৬৯-এর গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান হতো না; ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান না হলে ‘এক মাথা এক ভোটের’ ভিত্তিতে ’৭০-এর নির্বাচন হতো না; আর ’৭০-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কিছুই হতো না, কিছুই সম্ভব ছিল না।

বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল গগনচুম্বী। তিনি সর্বস্তরের জনসাধারণের কাছে আহ্বান রেখেছিলেন এই নির্বাচনকে রেফারেন্ডামে পরিণত করতে। বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ’৭০-এর নির্বাচনকে গণভোটে পরিণত করেছিল।

বাংলার মানুষের অধিকার বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু কখনোই ভাবেননি তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতায় তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন- ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না; আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ তিনি’৭১-এর ১৭ মার্চ তার ৫২তম জন্মদিনে পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিয়েছিলেন, ‘আমার জীবন আমি জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছি।’ সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধুর জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গিত ছিল এবং জীবন দিয়েই তিনি তা প্রমাণ করেছেন। সবসময় লক্ষ করেছি, বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অনমনীয় মনোভাব ছিল।

তিনি মৃত্যুকে কখনোই ভয় পেতেন না। সবসময় মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার আগে ’৭১-এর ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে জীবনানন্দ দাশের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, “যদি বেঁচে থাকি, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়...’।”

’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর, মাত্র ৯ মাসে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা। দেশ স্বাধীনের পর দেশবাসীসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর দোয়া ও আশীর্বাদে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে বীরের বেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সেদিন পরিপূর্ণতা লাভ করে।

স্বাধীনতার নির্মোহ ইতিহাস যারা বিশ্বাস করেন না, তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। এ স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোনো সাংবিধানিক অধিকার থাকতে পারে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সম্মুখ পানে, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে, সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে।

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

[email protected]

বদরুদ্দীন উমরের আজকের নির্ধারিত লেখাটি প্রকাশিত হবে বৃহস্পতিবার -বি.স.

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×