মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়

  এম এ খালেক ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো জাতি সত্যিকার অর্থে তার কর্মদক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না। তাই শুধু সনাতনি পন্থায় শিক্ষা বিস্তার করলেই একটি দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না। বিশ্বে যেসব দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে, সেসব দেশে প্রথমেই গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। তারপর উন্নয়ন অর্জিত হয়েছে। অর্থাৎ এক অর্থে উন্নয়ন হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার এক ধরনের উপজাত, যা অনিবার্যভাবে অর্জিত হয়। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তার করেছে অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়ের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে এমন একটি দেশের দৃষ্টান্তও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই যেসব দেশের নেতৃত্ব দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তারা চেষ্টা করে কিভাবে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়ে উন্নত এবং আধুনিক শিক্ষা বিস্তার করা যায়। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে ত্বরান্বিত করা সম্ভব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে জাপান হয়তো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু জাপানি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একইসঙ্গে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়। তারা মোট জিডিপি’র ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিতে থাকেন। এর ফলে তারা খুব শিগগিরই এর সুফল পেতে শুরু করে। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই জাপান দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলে আবারও উঠে দাঁড়ায়। একইসঙ্গে জাপানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট অবস্থার শুরু হয়।

একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বয়স যখন ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে থাকে তখন সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বলা হয়। অর্থাৎ এ অবস্থায় একটি দেশের বেশিরভাগ মানুষই কর্মক্ষম থাকে। অনেকেই বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট অবস্থা একটি দেশ বা জাতির জীবনে একবারই আসে। কারও মতে, হাজার বছরে একবার আসে। কর্মক্ষম মানুষ একটি দেশের জন্য বিরাট সম্পদ বলে পরিগণিত হতে পারে যদি তাকে মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করে তোলা যায়। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। উৎপাদনের যতগুলো উপকরণ আছে তার মধ্যে মানুষ বা মানবসম্পদ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। জনসংখ্যা এমনই এক অর্থনৈতিক উপকরণ যা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং উপযুক্ত কারিগরি জ্ঞানে প্রশিক্ষিত হলে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। আর কোনো কারণে যদি জনসংখ্যাকে উপযুক্ত শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত করে তোলা না যায় তাহলে এটি একটি দেশের জন্য অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের উপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ এখনও আন্তর্জাতিক মাত্রার চেয়ে অনেক কম। এমন কি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ অনেক কম। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জিডিপি’র অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার কথা থাকলেও বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ এখনও ২ শতাংশের নিচে। এই সামান্য আর্থিক বরাদ্দের বেশিরভাগই ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে। ফলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং শিক্ষা সংক্রান্ত গবেষণা কাজে অর্থ ব্যয় হয় খুবই সামান্য।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে অবজেকটিভ প্রশ্ন ব্যাপকভাবে চালু হওয়ার পর পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কিন্তু আমরা কি নিশ্চিত করে বলতে পারব, শিক্ষার মান আগের তুলনায় বেড়েছে? যারা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করলেই তাদের জ্ঞানের মাত্রা বুঝা যায়। দৃশ্যত শিক্ষার উদ্দেশ্য থাকে দুটি। প্রথমত, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে সার্টিফিকেট অর্জন করা, যার মাধ্যমে একটি সরকারি চাকরি পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জানা বা জ্ঞানার্জনের জন্য পড়া। কিন্তু ইদানীং জ্ঞানার্জনের জন্য পড়ুয়াদের সংখ্যা মারাÍকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এখন যারা পড়াশোনা করছে তাদের বেশির ভাগেরই উদ্দেশ্য থাকে কিভাবে একটি ভালো চাকরি বাগিয়ে নেয়া যায়। এভাবে সার্টিফিকেট অর্জনের প্রতিযোগিতায় সামিল হয়ে একজন শিক্ষার্থী জ্ঞানার্জনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুৎ হচ্ছে। ফলে তারা না পারছে জ্ঞানার্জন করতে না পারছে মনের মতো চাকরি জুটিয়ে নিতে। বিগত কয়েক দশকে দেশে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইদানীং প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে যেভাবে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে জাল সার্টিফিকেট নিয়ে ঠিক ততটা আলোচনা হচ্ছে না। যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তারা অন্তত খাতায় কিছু লিখে তারপর পাস করে। কিন্তু যারা সার্টিফিকেট ক্রয় করেন তারা তো সে পরিশ্রমটুকুও করেন না। একটি ব্যাংকের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট ক্রয় করে পদোন্নতি লাভের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। পরবর্তী পদোন্নতির জন্য এসব কর্মকর্তা তিন বছর চাকরি করলেও তাদের ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়নি। এখন প্রশ্ন হল, একজন কর্মকর্তা কোনো পদে একাদিক্রমে তিন বছর চাকরি করলে তিনি পরবর্তী পদোন্নতির জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। কিন্তু এসব কর্মকর্তাকে কেন ইন্টারভিউয়ের জন্য ঢাকা হল না? আর যদি জাল সার্টিফিকেটের জন্য এদের ইন্টারভিউ’তে না ডাকা হয়ে থাকে তাহলে এই অপকর্মের জন্য তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হল না কেন?

সেদিন আমার এক পরিচিতজন একটি ভয়াবহ তথ্য দিলেন, যা শুনলে গা শিউরে ওঠে। তিনি জানালেন, তার পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে ডক্টরেট ডিগ্রির সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে দিতে চেয়েছেন টাকার বিনিময়ে। অর্থাৎ চাহিদামতো টাকা দিলে সেই ব্যক্তিটি তার জন্য ডক্টরেট ডিগ্রির সার্টিফিকেট জোগাড় করে দিতে পারেন। এজন্য থিসিস জমা দেয়া বা অন্য কোনোভাবে কষ্ট করার দরকার নেই। কথায় বলে, অর্থই সব অনর্থের মূল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, অর্থই সব ব্যথা উপশমের মূলমন্ত্র। অর্থ ছাড়া কিছুই হয় না। তা না হলে কি টাকার বিনিময়ে ডক্টরের ডিগ্রির সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব। অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন, একটি মহলবিশেষ উদ্দেশে পরিকল্পিতভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য তৎপর রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কিছুদিন আগে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, একটি মহল যারা সরকারের ভালো দেখতে পারে না, তারা সরকারকে বিব্রত করার জন্য প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে। দায়িত্বশীল মানুষের কাছ থেকে আমরা দায়িত্বশীল কথাবার্তাই শুনতে চাই, কোনো ছেলেভোলানো গল্প আমরা শুনতে চাই না। আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, শিক্ষামন্ত্রী বললেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা এখন প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তারপরই কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হল। প্রশ্নপত্র কি কোচিং সেন্টার থেকে ছাপা হয়? তাহলে প্রশ্ন ফাঁস রোধের জন্য কোচিং সেন্টার কেন বন্ধ করতে হবে। প্রশ্নপত্র যেসব প্রেস থেকে ছাপা হয় তা তো সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই সেসব ছাপাখানার ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করলেই তো প্রশ্নপত্র ফাঁস করার প্রবণতা বন্ধ হতে পারে। ইতিপূর্বে যাদের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে কি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে? মনে রাখতে হবে, বাঁধের উজানে কেউ যদি পানি ঘোলা করে তাহলে ভাটিতে পানি সিঞ্চন করে কোনো লাভ হবে না। পানি যিনি ঘোলা করছেন তাকে সরিয়ে না দিলে ভাটিতে ঘোলা পানিই আসতে থাকবে।

যারা নানাভাবে শিক্ষার মানকে দুর্বল করে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানহীন শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কোনো জাতির পক্ষে বর্তমান বিশ্বের কঠোর চ্যালেঞ্জ কোনোভাবেই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। শিক্ষাকে যারা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক নাগরিক অধিকার। এই অধিকার নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া যায় না। আমাদের লাখ লাখ জিপিএ-৫ ধারীর দরকার নেই। আমাদের দরকার, মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত এমন একটি জাতি যারা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করাসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির মেরুদণ্ড। কাজেই সেই মেরুদণ্ড যাতে কেউ ভেঙে ফেলতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্রিটিশ আদলে তৈরি। কাজেই এই শিক্ষা ব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারছে না। শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে শিক্ষাজীবন শেষে একজন শিক্ষার্থী নিজেই তার উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে পারে। আমাদের দেশে একটি প্রবণতা খুবই দুর্ভাগ্যজনক তা হল, শিক্ষাজীবন শেষে প্রায় সবাই সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে চান। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আত্মকর্মসংস্থানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা। আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হচ্ছে উপযুক্ত মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ কোনো দুর্বল শিক্ষা নিয়ে কারও পক্ষে আত্মকর্মসংস্থান করাও সম্ভব নয়। কাজেই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল, যে কোনো মূল্যেই হোক দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তার ঘটানো।

এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter