সড়ক দুর্ঘটনা ও সরকারের ঔদাসীন্য

  বদরুদ্দীন উমর ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক দুর্ঘটনা
সড়ক দুর্ঘটনা। ছবি-যুগান্তর

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অবস্থা দেখে মনে হয় এটা শুধু সরকার নয়, এ দেশের মানুষেরও গা-সহা হয়ে গেছে। প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় ৮/১০/১৫ জন বা তার থেকেও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অনেকে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে আছে শিশু, নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধ। বছরে এভাবে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। এ বিষয়ে লিখতেও এখন অসুবিধা নয়। কারণ আমি নিজে এবং অন্যেরা এর ওপর অনেক লিখেছি। একেকটি দুর্ঘটনার পর অল্পদিনের জন্য এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট বিক্ষোভ দেখা যায়। কিন্তু এর কোনো প্রতিকার হয় না। আগে ঢাকা শহরে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হতো না। কিন্তু এখন ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকার পথচারীদেরকে সরকারি কর্তৃপক্ষ যতই দোষারোপ করুক, সব দুর্ঘটনার কারণই এক এবং অভিন্ন।

সড়ক দুর্ঘটনার ওপর ঢাকার দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদে ১১ এপ্রিল তারিখে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ। এই আলোচনা প্রসঙ্গে পত্রিকার রিপোর্টটি থেকে কিছুটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়া দরকার। ‘দুর্ঘটনা-বীমায় অনাগ্রহ মালিক ও চালকদের’ শিরোনামে এ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার পরিমাণ টাকার অঙ্কে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। উন্নত দেশে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি এড়াতে বীমার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে বীমায় আগ্রহ নেই পরিবহন মালিক-চালক কারোরই। কারণ হিসেবে বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা বলছেন তারা। তবে বীমা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে বীমা করলে কমবে দুর্ঘটনা, সুরক্ষা পাবে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, এমনকি মালিকরাও। সড়কে দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি নিত্যদিনের চিত্র। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। এতে খোদ ১২ শতাধিক চালক ও পরিবহন শ্রমিকসহ মারা গেছেন বিভিন্ন পেশার প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ। অথচ এসবের নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা। বীমা করা না থাকায় দুর্ঘটনার শিকার পথচারী বা যাত্রীরাও পান না কোনো আর্থিক সহায়তা।’

রিপোর্টটিতে আরও বলা হয়েছে, ‘পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, আইনি দায় বা থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স করে পুলিশি ঝামেলা এড়াতেই বেশি আগ্রহ মালিকদের। চালকরা বলেন, কোর্টে গেলে ৬০০ টাকা দিলেই ইনস্যুরেন্স পাওয়া যায়। তবে সেখান থেকে চালক-শ্রমিকরা কোনোভাবেই লাভবান হন না বলে জানান তারা। রাস্তায় পুলিশ আটকালে দেখানোর জন্যই শুধু, এর আর কোনো কাজ নেই। কোনো ক্ষতিপূরণও পায় না। পরিবহন মালিকদের দাবি, বিনা কারণে বা নানা টালবাহানায় দাবি পরিশোধ করে না কোম্পানিগুলো। তবে ভিন্ন কথা বলছেন বীমা সংশ্লিষ্টরা।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘কোনো যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কোনো গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার। সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ শাহরিয়ার আহসান বলেন, রাস্তায় চলার জন্য যে ইনস্যুরেন্স তারা সেটা করছেন। ইনস্যুরেন্স দিতে গেলে আমরা প্রথমে দেখব গাড়ির ফিটনেস আছে কিনা। ড্রাইভিং লাইসেন্স ভুয়া কিনা, ওভারলোড করার কারণে কোনো সমস্যা হলে সেগুলো তো আমাদের কাভারেজের মধ্যে আসবে না। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, এগুলো অনেক ক্ষেত্রে থাকে না, পাওয়া যায় না। কিন্তু যাদের এগুলো আছে তারাও পান না। প্রগতি ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জালালুল আজিম বলেন, তারা মনে করছে যে ইনস্যুরেন্স করলে যদি আমাকে বেনিফিট পেতে হয়, তাহলে তো আমাকে এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ইনস্যুরেন্স বিআরটিএ’র সঙ্গে ট্যাগ করে দেয়া উচিত। টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে ২০২০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা নামিয়ে আনতে হবে অর্ধেকে। বিশেষজ্ঞ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করা ব্যক্তিরা বলছেন, গাড়ি, চালক, যাত্রী এবং দুর্ঘটনার শিকার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বীমার আওতায় এলে ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে অনায়াসে। আর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ক্ষতিপূরণও পাওয়া যাবে। তাই পরিবহনের বীমা বাধ্যতামূলক করারও দাবি তাদের।’

এই গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, কেন প্রতিদিন বড় আকারে সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে সারা বাংলাদেশে এবং বছরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। এখানে বলা দরকার যে, রিপোর্টটিতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সাধারণভাবে অজানা নয়। বিভিন্ন রিপোর্টে ও আলোচনা এসব কারণ প্রায়ই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই রিপোর্টটিতে বেশ পরিষ্কারভাবে কারণগুলো নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রথমত, সড়কে চলাচলের জন্য গাড়িগুলোর ফিটনেস পরীক্ষা করে তাদেরকে লাইসেন্স দেয়া হয় না। সড়কে পুলিশকে দেখানোর জন্য যে ইনস্যুরেন্স কাগজপত্র দেয়া হয় তাতে ক্ষতিপূরণের ব্যাপার থাকে না এবং সার্টিফিকেটও দেয়া হয় ঘুষ খেয়ে। এই ঘুষ খায় পরিবহন খাতে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তারা। কিন্তু শুধু গাড়ির ফিটনেস নয়, চালকদেরকে লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে একই ব্যাপার ঘটে। কোনো রকম প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা ছাড়াই চালকদেরকে ঘুষ খেয়ে লাইসেন্স দেয়া হয়। তাছাড়া লাইসেন্সবিহীন হেলপারও অনেক ক্ষেত্রে চালকের জায়গায় গাড়ি চালায়।

রিপোর্টটিতে ইনস্যুরেন্সের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেখা যায় যে, সড়কে চলাচলের জন্য গাড়ির লাইসেন্স থাকলেও যাত্রীসহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য কোনো ধরনের ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া গাড়ির ক্ষেত্রে লাইসেন্স থাকলেও কাগজপত্র প্রায়ই ঠিক না থাকার কারণে এক্ষেত্রেও গাড়ির মালিক ও চালকদের কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। দুর্ঘটনা হলে তাদের জবাবদিহিতা ও শাস্তির কোনো ব্যাপার নেই। ঢাকা শহরে আগে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা খুব কম ছিল। এখন এ সংখ্যা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গাড়ির মালিক, এমনকি সরকার পক্ষ থেকেও এর জন্য পথচারীদের অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কথা বলা হয়। কিন্তু দেখা যাবে ঢাকার সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়মের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা কম। বিপুল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গাড়ির চালকরা নিজেরাই নিয়ম লঙ্ঘন করে, গাড়ি চালকদের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হলেও কোনো প্রতিকার নেই এবং সারা দেশের মতো ঢাকাতেও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে।

দেশে একটি সরকার আছে। সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় আছে। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের ঔদাসীন্য এবং নিরুদ্বেগ অবস্থা দেখলে অবাক হতে হয়। মনে হয় এ বিষয়ে যে তাদেরই দায়িত্ব সব থেকে বেশি, এটা বোঝার কোনো উপায় নেই। গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স এবং যাত্রী ও দুর্ঘটনার অন্য শিকারদের জন্য ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা বিষয়ে সরকারের কোনো নীতি নেই। রিপোর্টটিতে সঠিকভাবেই বলা হয়েছে যে, এসব বিষয়ে যথাযথ সরকারি নিয়মকানুন থাকলে এবং গাড়ির ফিটনেস যথাযথভাবে পরীক্ষা করা এবং ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স দেয়ার ব্যবস্থা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা বড় মাত্রায় কমিয়ে আনা যায়।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী আছেন, সচিব আছেন, অসংখ্য কর্মচারী আছেন। তারা যদি সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করতেন এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এত বেপরোয়াভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কিছুতেই হতে পারত না। কিন্তু বাস্তবত দেখা যায় যে, কোনো দুর্ঘটনা তো বটেই, এমনকি বড় বড় সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও মন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া কদাচিৎ পাওয়া যায়। তার ও তার মন্ত্রণালয়ের ঔদাসীন্য ও নিরুদ্বেগ অবস্থার কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।

কোনো সরকার যদি জনস্বার্থের দিকে, জনগণের জীবনের দিকে খেয়াল রাখে, তাহলে সড়ক পরিবহনের এই অবস্থার প্রতিকারের ক্ষেত্রে তাদের করণীয় থাকার কথা। কিন্তু প্রতি বছর বাংলাদেশে হাজার হাজার নিরপরাধ যাত্রী ও পথচারী যেভাবে নিহত ও পঙ্গু হচ্ছেন, তার দিকে দৃষ্টি দেয়ার কোনো ব্যাপার নেই। আছে শুধু বড় বড় কথা, গাড়ির মালিক ও চালকদের দোষারোপ না করে পথচারীদের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা। জনগণকে সড়ক নিরাপদ রাখার জন্য হিতোপদেশ দেয়া। এর থেকে জনগণের প্রতি সরকারের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গির হদিস পাওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার নয়।

১৫.০৪.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×