শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সামগ্রিক সমাধান প্রয়োজন

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শরীফুজ্জামান আগা খান

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন পদযাত্রা কর্মসূচি দেয়। এ কর্মসূচি অনতিদূরে কদম ফোয়ারার কাছে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। টানা পাঁচ দিন সেখানে অবস্থানের পর ২৪ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষকদের অবস্থানস্থলে আসেন। সেখানে তিনি বলেন, আমি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আগামী অর্থবছরে এমপিওভুক্তির জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হবে। আপনারা বাড়ি ফিরে যান। খোলা আকাশের নিচে রোদের মধ্যে আর কষ্ট করবেন না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব যাতে আপনাদের কষ্ট দূর হয়। শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন এক মাসের আলটিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে।

দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার (নিম্নমাধ্যমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) ৯৭ শতাংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনানির্ভর। এ স্তরে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৮ হাজারের কাছাকাছি আর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওর আবেদন চাওয়ায় আবেদন পড়েছে ৯ হাজার ৪৪৮টি। অবশ্য সম্পূর্ণ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এত বেশি হবে না। এর ভেতর ২ হাজারের মতো এক স্তর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপর স্তর এমপিওভুক্তির আবেদন করেছে। আর এক হাজারের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো স্তর এমপিওভুক্ত না থাকায় দু’বার গণনায় এসেছে। এক স্তর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছুটা আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও সম্পূর্ণ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দৈন্যদশার ভেতর রয়েছে। যে কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিক দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পিছিয়ে পড়েছে।

সরকারি, এমপিওভুক্ত এবং স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একই নিয়ম-নীতিতে পরিচালিত হয়। একই কারিকুলাম, সিলেবাস এবং প্রশ্নপদ্ধতি অনুসরণ করে। শিক্ষার্থীরা বোর্ড থেকে একই মানের সনদ লাভ করে। অথচ পরিহাসের বিষয়, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বেতন-ভাতাদির কিছুই পায় না। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এর শিক্ষক-কর্মচারীদের তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নীতিমালা

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ার পর তিন বছর সফলভাবে পাঠদান করলে স্বীকৃতি পায়। আর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে সেটাই প্রচলিত রীতি। ২০১০ সালে এই রীতির অতিরিক্ত নীতিমালার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই নীতিমালা কার্যকর করা যায়নি। মন্ত্রী/এমপিদের ডিও লেটার এবং অর্থ-লবিং এমপিওভুক্তির নিয়ামক উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। তখন দেখা যায়, অনেক যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে না পারলেও কম যোগ্যতার, এমনকি স্বীকৃতি নেই এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১২ জুন স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা জারি করা হয়। এর মাসাধিককাল পর ১৯ জুলাই মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিমালা প্রকাশিত হয়। নীতিমালায় কঠিন সব শর্ত রয়েছে। কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতির তারিখ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পাসের হারের ওপর মান নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত নির্দেশিকায় নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর ন্যূনতম যে সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৮-এর নীতিমালায়, সে সংখ্যা ১০ জন করে বাড়ানো হয়েছে। আগে স্কুল ও কলেজে কাম্য পাসের হার নির্ধারিত ছিল ৫০ শতাংশ। এখন পাসের হার বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭০ শতাংশ। অবশ্য মাদ্রাসার পাসের হার ধরা হয়েছে ৬০ শতাংশ।

কোনো ক্ষেত্রে গ্রেডিং করার অর্থ সমজাতীয় উপাদানগুলোর মান নির্ধারণ করা। যে চারটি সূচকের ভিত্তিতে যেভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণ করতে চাওয়া হয়েছে তাতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অযোগ্য প্রমাণ করে সেই সুবাদে বাদ দেয়ার উদ্দেশ্যই বড় হয়ে উঠেছে। একটি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ১০০-এর ভেতর ০ (শূন্য) হবে এটা আদর্শ কোনো মানবণ্টন পদ্ধতি হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তিকরণে সূচক ধরা হয়েছে- একাডেমিক স্বীকৃতির বয়স ২৫ (প্রতি ২ বছরের জন্য ৫,১০ বা তদূর্ধ্ব বছর হলে ২৫)। শিক্ষার্থীর সংখ্যার মান ২৫ (কাম্য হার অর্জনের সংখ্যার ক্ষেত্রে ১৫, কাম্য সংখ্যার পরবর্তী প্রতি ১০ জনে ৫)। উত্তীর্ণে ২৫ (কাম্য হার অর্জনের ক্ষেত্রে ১৫, পরবর্তী প্রতি ১০ শতাংশের জন্য ৫)। ধরা যাক, বিগত ২ বছরের ভেতর কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখনও ভালোভাবে দাঁড়াতে পারেনি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা যথেষ্ট নয় বিধায় পরীক্ষার্থীও কম। উত্তীর্ণের হার ৭০ শতাংশের নিচে। তাহলে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বসাকুল্যে স্কোর ০ (শূন্য)। একাডেমিক স্বীকৃতিতে স্কোর পেলেও অন্য তিনটি সূচকে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ০ (শূন্য) স্কোর জুটেছে।

এ স্কোরিং সঠিক চিত্র দেবে না

স্কোরিং করে গ্রেডিংয়ের উদ্দেশ্য হল, একটি সংখ্যার ভেতর দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান সম্পর্কে ধারণা লাভ। সহজ হিসাবটা হল, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্কোর বেশি সেটির মান ভালো, আর যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্কোর কম সেটি দুর্বল। কিন্তু ১ থেকে স্কোরিং না করে ১৫ থেকে স্কোরিং শুরু করলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মান সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে না। নীতিমালার অদ্ভুত মূল্যায়ন রীতিটা এ রকম, শিক্ষক ১০০-এর ভেতর ৬০-এর নিচে নম্বর পাওয়া সব শিক্ষার্থীকে ০ (শূন্য) স্কোর পাচ্ছে।

শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর কাম্য সংখ্যার অসঙ্গতি

কোনো একটি ক্লাসের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। নীতিমালার সবক্ষেত্রে সেই হিসাব যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। একটা উদাহরণ, মফস্বলে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (৬ষ্ঠ-৮ম)) কাম্য শিক্ষার্থী ধরা হয়েছে ১৫০ জন। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (৬ষ্ঠ-১০ম) ২০০ জন। তাহলে মাধ্যমিক স্তরে (৯ম-১০ম) শিক্ষার্থী বাড়ছে ৫০ জন। নবম ও দশম শ্রেণির প্রতিটিতে গড় শিক্ষার্থী ২৫ জন। এমতাবস্থায় এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ পরীক্ষার্থী হওয়া উচিত ২৫ জন। অথচ এখানে কাম্য পরীক্ষার্থী চাওয়া হয়েছে ৪০ জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করতে হলে স্কোরিং ও গ্রেডিং নতুনভাবে করতে হবে।

এমপিদের ডিও লেটারে জটিলতা বাড়বে

এমপিওর আবেদন ফরমে সংসদীয় এলাকার ঘর পূরণ করতে হচ্ছে। তবে কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিভুক্তিতে এমপিদের ডিও লেটার লাগবে? এমপিওভুক্তির নীতিমালা এবং গ্রেডিং নিয়ে যাবতীয় আলোচনাই বৃথা যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে মন্ত্রী/এমপিদের ডিও লেটার লাগে এবং তার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকা তৈরি করা হয়। কারণ তারা নীতিমালার বিচারে নয়, নিজস্ব বিবেচনায় ডিও লেটার দেবেন। ২০১০ সালেও নীতিমালা এবং গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও করতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মন্ত্রী/এমপিদের নিজস্ব বিবেচনার ডিও লেটারের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও করা হয়। এতে করে অনেক যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও হতে না পারলেও কম যোগ্যতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি স্বীকৃতি নেই এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এমপিওর তালিকায় স্থান পায়।

অতিরিক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমন্বয়করণ

বহু বছর প্রত্যাশার পর এবারে এমপিওবঞ্চিত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে। শহর এলাকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতনপ্রাপ্ত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো কোনোভাবে টিকে থাকবে। তবে মফস্বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। কাজেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওর বাইরে রাখার আগে ওই প্রতিষ্ঠান এবং এর শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নেয়া জরুরি। প্রস্তাবিত এমপিও নীতিমালা ২ (খ) ধারায় বর্তমানে অনুমোদিত সব স্কুল-কলেজ ভৌগোলিক দূরত্বভিত্তিক ম্যাপিং এবং ভৌগোলিক দূরত্বে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে তা প্রশাসনিকভাবে একীভূত করার বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একাধিক স্কুল ভবন-কাঠামো একীভূত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস হিসেবে বিবেচিত হবে। নীতিমালার ১২ ধারায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলির প্রস্তাব করা হয়েছে। বদলির মাধ্যমেও অতিরিক্ত বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে সমন্বয় করা সম্ভব।

শেষকথা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি থাকবে কিন্তু এমপিও হবে না, এটি সুবিবেচনাসম্মত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে না চললে আগে স্বীকৃতি বাতিল করতে হবে। আর স্বীকৃতি বাতিল হলে স্বাভাবিকভাবেই এমপিওর অযোগ্য হয়ে পড়বে। স্বীকৃতির শর্তাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ করলে কোনো অযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি থাকার কথা নয়। ঠিকভাবে না চলায় সম্প্রতি ২২০টি মাদ্রাসার স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। কোনো জনপদে স্থাপিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে এলাকাবাসী সেটা প্রত্যাশা করেন। বহু বছর অপেক্ষার পরও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমপিওভুক্ত হলে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সক্ষমতা ফিরে পাবে। কাজেই কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে কীভাবে এমপিওভুক্তির সমস্যার সমাধান করা যায় সেই উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

শরীফুজ্জামান আগা খান : শিপক ও গৃবষক