ভারতের নির্বাচন ঘিরে নানা সংশয়

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সি. পি. সুরেন্দ্রন

নোট বাতিলের পদক্ষেপ অর্থনীতির উন্নতিতে সহায়তা করেছে বলে দাবি করার পাশাপাশি কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের পারফরম্যান্সকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মঙ্গলবার একটি টিভি চ্যানেলে তার এমন দাবির কয়েক ঘণ্টা আগে বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা কপিল সিবাল দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে সিবাল ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, নোট বাতিলের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শাসক দল বিজেপির তল্পিবাহী নেতারা শত শত কোটি রুপি অর্থ পাচার করেছেন। ভারতের জাতীয় নির্বাচনের সাত ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ চলছে এবং এটি এখন স্পষ্ট যে, এটি হতে যাচ্ছে সর্বকালের সবচেয়ে দাগ লাগানো নির্বাচনগুলোর একটি।

কংগ্রেস ও বিজেপি যে নির্বাচনী ইশতেহারগুলো প্রকাশ করেছে তাতে জনপ্রিয় আবেদনগুলো নিয়ে প্রতিযোগিতা করা হয়েছে। কংগ্রেসের ইশতেহারের মূল বিষয় হচ্ছে ভারতের ২০ শতাংশ চরম দরিদ্রের জন্য ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা বিধান করা। অন্যদিকে, বিজেপির প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে আছে অর্থকে গ্রামীণ খাত ও এলাকামুখী করা এবং স্থায়ী ভোগান্তির শিকার ও ক্ষুব্ধ কৃষকের জন্য ভালো কিছু করা। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়বস্তু এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ তুলে দেয়ার সম্ভাব্যতার ওপর জোর দিয়েছে।

বিজেপির ইশতেহারে নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার বিষয়াবলীর ওপর মনোজাগতিক চাপ দেয়া হয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তার থিঙ্কট্যাঙ্ক যে পদক্ষেপ নিয়েছে, ধারণা করা যায় তাদের ইশতেহারটি মনের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু কপিল সিবালের মঙ্গলবারের উদঘাটন এবং স্পষ্টত অভিযুক্ত করার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ আপাতদৃষ্টিতে মিডিয়াকে স্তব্ধ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা ভারতের দরিদ্র মানুষের জন্য নিজস্ব স্টাইলের চৌকিদার হিসেবে মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ ক্ষুণ্ণ করার জন্য তেমন শক্তিশালী কোনো লড়াই তৈরি করতে পারবে বলে মনে হয় না।

বিজেপির ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও দলের সভাপতি অমিত শাহকে সরাসরি বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারে জড়িত বলে দেখিয়েছেন সিবাল। যেহেতু অমিত শাহ মোদির খুবই ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাই দোষ থেকে বাঁচা প্রধানমন্ত্রীর জন্য কঠিনই হবে। প্রায় রাতারাতি, খেলার স্বাভাবিক চিত্র মনে হয় জোরালোভাবে বদলে গেছে। অতীতের ঘটনাবলী পর্যালোচনায় এটা মনে করা যায় যে, নতুন করে পাওয়া আস্থা ও আগ্রাসী মনোভাব, যেটা রাহুল দেখিয়েছেন, তার সর্বশেষ উন্মোচনের পেছনে কোনো উৎস আছে। এটি ধারণা করা যৌক্তিক মনে হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রীর মুখোশ উন্মোচনের জন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন রাহুল।

যেমনটি দেখা যাচ্ছে, গত সপ্তাহের কিছু জরিপে দেখা গেছে, বিজেপি দক্ষিণের কিছু রাজ্যে হারতে যাচ্ছে, বিশেষত কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও তামিলনাড়ুতে। কর্ণাটকে তারা কিছু আসন পেতে পারে। উত্তরের বড় রাজ্যগুলো যেমন- উত্তরপ্রদেশ (ইউপি), মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানে অবশ্য বিপরীত পরিস্থিতি হতে পারে। ইউপিতে যদি কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে জয়ী নাও হয়, মায়াবতী ও অখিলেশ যাদবের জোট বড় ধরনের জয় ছিনিয়ে নেবে।

বিজেপির জন্য বাকি রইল বিহার ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো। বিজেপি জোট যদি এতে বেশিরভাগ আসনও পায় (যদিও বিষয়টি সন্দেহপূর্ণ), তাহলেও তারা ১৮০ আসনের বেশি পাবে না। মোদির একনায়কতান্ত্রিক স্টাইলের কর্মকাণ্ডের কথা বাদ দিলেও ৫৪৩ আসনের পার্লামেন্টে এটি যথেষ্ট ভালো নয়। এর অর্থ খুবই স্বাভাবিক। বিজেপি যদি যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থেকে যেতে চায় তবে তাকে আঞ্চলিক দল ও বিভিন্ন দল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র দলগুলোর সঙ্গে নিজেদের মনের বিরুদ্ধে ছাড় দিয়ে সমঝোতা করতে হবে। যদি তেমনটি হয়, তাহলে প্রতিপাদনযোগ্যভাবে মোদিকে আরও বেশি গণতান্ত্রিক হতে হবে। এমনটি নাও ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হবে বিজেপির অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করা। এটি সহজ কোনো বিষয় হবে না কারণ, দলটি অন্যসব ব্যক্তিত্বকে বাদ দিয়ে মোদি ঘরানাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে।

আমার বাজি হচ্ছে- কংগ্রেস সফল হতে পারে, যা কিনা সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত অসম্ভব বিবেচনা করা হচ্ছে। দলটি ক্ষমতায় ফিরতে পারে। রাহুল কিছু সুতার বুনন দিয়ে মালা গাঁথবেন- কংগ্রেসকেও কিছু ছোট দলের ওপর নির্ভর করতে হবে, যাতে রশি বাঁধার বিষয়টি দেখার বাকি থাকে। কিন্তু গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে রাহুল দেখিয়েছেন তিনি ঝুঁকি নিতে সক্ষম। অবশ্যই তিনি দেখিয়েছেন মানসিক ও নৈতিক গুণাবলিতে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে বেড়ে উঠতে পেরেছেন তিনি।

প্রথমদিকে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এই নির্বাচন আর কোনো ভদ্রতার খাতিরে কাউকে প্রণাম করছে না। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচন শুরু হওয়ায় আগামী কয়েকটি সপ্তাহ ভারত ও বিশ্ব সর্বাত্মক দ্বৈরথ দেখবে। সবাই এখন এটিই আশা করতে পারে যে, ব্যালট রক্ত ঝরাবে না। এটি হচ্ছে কঠিন এক সময়। গণতন্ত্র নিজেই হতাশার একটি ওজর হিসেবে আসতে পারে। আমি ভয় করছি; কিন্তু তা আমি নিজের মধ্যেই রাখতে চাই।

গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

সি. পি. সুরেন্দ্রন : ভারতভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক