কী ঘটবে লোকসভা নির্বাচনে?

  পবিত্র সরকার ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কী ঘটবে লোকসভা নির্বাচনে?

বদ্ধমূল রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকলেও আমি যেহেতু প্রত্যক্ষ রাজনীতির লোক নই, সেহেতু নির্বাচন সম্বন্ধে আমার ভবিষ্যদ্বাণী প্রায়ই ভুল হয়।

অন্যদিকে জ্যোতিষে বা জুয়া খেলাতে আমার বিশ্বাস নেই, দক্ষতাও নেই। ফলে যখন নানা কাগজে ফল-সমীক্ষকদের নানা সমীক্ষা বেরোয়, তার সঙ্গে আমার বিশ্বাস এবং সাধারণ বুদ্ধির বিরোধ ঘটলে আমি খুব বিভ্রান্ত বোধ করি।

এ বিভ্রান্তি নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হওয়া উচিত নয় বলেই আমি এ ধরনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা খুঁজি।

১. আগে অর্থনীতির কথা, নাকি দুর্নীতির কথা?

এর আগে ভারতের কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন নরেন্দ্র মোদির সরকারকে খুব একটা আশা দেয়নি, তা বোধহয় যুগান্তরের পাঠকরা দেখেছেন। এর একটা কারণ হল, প্রধানমন্ত্রীর অতি নাটকীয় ভাবভঙ্গিতে দেশের লোক এক সময়ে বিমুগ্ধ হয়েছিল; এখন সেই সম্মোহন থেকে তারা যেন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

তার একটা কারণ, অঢেল প্রতিশ্রুতির কিছুই বাস্তবের মুখ না দেখা। সেই ২০১৪ থেকে প্রতিশ্রুতির বন্যা চলছে। প্রথম প্রতিশ্রুতি- বিদেশের কালো টাকা ফিরিয়ে আনব, প্রতিটি ভারতীয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা জমা পড়বে। কোথায় কী! একটা পয়সাও জমা পড়েনি; বরং সুইস ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের হাতে এখন ভারতের কালো টাকার পরিমাণ বেড়ে সাত হাজার কোটি দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে মোদিজির বন্ধুরা সব ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা ধার নিয়ে বিদেশে পালিয়েছে। মদ্য-উৎপাদক এবং স্পাইসজেটের মালিক বিজয় মাল্য ন’হাজার কোটি টাকা চৌপাট করে লন্ডনে, নীরব মোদি বলে একজন হিরে বিক্রেতা (আমাদের ‘সরব’ মোদির সঙ্গে ছবির একই ফ্রেমে তাকে প্রায়ই দেখা গেছে), মেহুল চোক্সি বলে আর একজন গুজরাটি ব্যবসায়ী- এসব মহাত্মারা মহানন্দে ভারতীয় ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ধার বা লুট করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে।

এ ঋণলুণ্ঠক পলাতকদের মোট ঋণের পরিমাণ ১১.৫ লাখ কোটি টাকা। তাদের ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের ঋণ শোধ করার কোনো কার্যকর প্রকল্প এখনও নেয়া হয়নি। সিংহাসনে বসেই মোদিজি বলেছিলেন, ‘হম ন কুছ খায়েঙ্গে, ন কিসিকো খানে দেঙ্গে।’

অর্থাৎ আমি চৌকিদারি করব, কাউকে কিছু (ঘুষ, তোলা, চাঁদা) খেতে দেব না, নিজেও কিছু খাব না।’ এখন তো মানুষ ‘চৌকিদার’ কথাটাকে হয় ‘চোরো কা চৌকিদার’ আর না হয় সোজাসুজি ‘চোর হ্যায়’ বলেই বুমেরাং করে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি- দু’কোটি বেকারকে চাকরি দেব। প্রতি বছরে। কত ঠিক চাকরি পেয়েছে, তা নিয়ে সরকার রহস্যময় হাসি হাসে; কিন্তু একটি সরকারি এনএসএস (ন্যাশনাল স্যাম্পল? সার্ভে) সমীক্ষাতেই দেখা গেছে, গত ২০১৭-২০১৮ আর্থিক বছরে দেশে বেকারের সংখ্যা ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এ সমীক্ষাটি সরকারের তরফে চেপেচুপে রাখার সযত্ন ও আন্তরিক চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৮-তে নতুন করে কর্মহীন হয়েছে ১.১ কোটি মানুষ। এদিকে সরকারি যেসব কোম্পানি ছিল; যেমন বিমান পরিবহনে এয়ার ইন্ডিয়া, তাতে লালবাতি বেশ উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে, সরকার সেটির খরিদ্দার পাচ্ছে না।

আর টেলিযোগাযোগ কোম্পানি বিএসএনএল (ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড) থেকে এর মধ্যে পঞ্চাশ হাজার কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, হয়তো এটিও লালবাতি জ্বালাবে। খারাপ লোকেরা বলে, এসব কোম্পানিকে ইচ্ছা করে নিঃস্ব করে তোলা হচ্ছে, কারণ প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু অম্বানি আদানি প্রভৃতিদের নানা কোম্পানি এবার মাঠে নামবে। আসলে নেমে পড়েছে।

অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার কোনো প্রতিশ্রুতি বা উদ্যোগ সফল হয়নি। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির সমীক্ষা দেখাচ্ছে, ২০১৮-এ বেকারত্ব বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৫.৯ শতাংশ আর ২০১৯-এর গোড়াতেই তা বেড়ে হয়েছে ৭.৯ শতাংশ। ‘বৃদ্ধির পরিমাণ’ মোট বেকারত্বের হিসাব নয়।

আর চাষীদের ঋণের দায়ে আত্মহত্যা এরই মধ্যে লাখের ওপরে ছাড়িয়েছে এবং এতে বিরতি ঘটেনি। চাষীরা মিছিল করেছে, লাঠির আঘাত ও গুলি খেয়েছে; কিন্তু প্রতিশ্রুতি ছাড়া তারা আর কিছু এখনও পায়নি।

এর মধ্যে বিশ্ব ক্ষুধাসূচকে ভারতের গৌরবময় ১০৩তম স্থান সম্বন্ধে সবাই জানে। শ্রীলংকা (৬৭) আর নেপালের (৭) স্থান তার ওপরে। একমাত্র সান্ত্বনা, পাকিস্তান আরও নিচে, ১০৬তম স্থানে।

অর্থনীতিকে চাঙা করার কথা কী; বরং তার কোমর ভেঙে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে নানা উদ্যোগে। এর একটা হল, অর্থনীতিতে এক ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’, যার নাম ‘নোটবন্দি’; গত ২০১৬-র ৮ নভেম্বর যা ঘটেছিল। সাধারণ ভারতীয়ের কাছে সে এক দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা।

এক হাজার আর পাঁচশ’ টাকার সব নোট বাতিল হয়ে গেল, নোট বদলানোর জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে একশ’র বেশি লোক মারা গেল, আর অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা, কাঁচামালের বাজার ভয়ংকর মার খেল খুচরার অভাবে, তবু নাকি তা সফল।

কালো টাকা উদ্ধারে তা সফল নয়, সন্ত্রাসবাদীদের উদ্যাম হ্রাসে তা সফল নয়। জিএসটি নামক সর্বাঙ্গীণ বিক্রয় করটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এর আগের সরকারই বিদেশি খুচরা ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ করেছিল, এ সরকারের আমলে বিদেশি আর দেশি ‘চেইন’ আর ‘শপিংমল?’ গোছের ব্যবসা আরও বিপুলভাবে বেড়েছে, ‘পাড়ার দোকান’ ধারণাটা ক্রমশ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

অন্যদিকে শিক্ষায়, চিকিৎসায় বেসরকারিকরণের ফলে মধ্যবিত্ত আর গরিবের নাভিশ্বাস উঠেছে।

কত প্রকল্প ঘোষিত হল এর মধ্যে। নির্মল গঙ্গা তেমনই দূষিত রইল, ‘স্বচ্ছ ভারতের’ চেহারা চতুর্দিকে আবর্জনা আর পূতিগন্ধময়, আর ‘অচ্ছে দিন’ তো লাখো চাষীর আত্মহত্যার দ্বারা কলঙ্কিত। গাড়ির পেট্রল-ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ত বেড়ে চলেছে; ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, গরিবের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়ছে।

রোজই ঘটছে আত্মহত্যার ঘটনা, কোনো কোনো মন্ত্রী তাকে ‘ফ্যাশন’ আখ্যা দিয়ে অমানবিক বিদ্রূপ করতে দ্বিধা করছেন না। আর দুর্নীতির খবর তো প্রতিদিনই কাগজে হেডলাইন হয়ে আসছে।

তাতে শাসকদের ভূমিকা বেশ শাঁসালো বলতে হবে। ফরাসি যুদ্ধবিমান কোম্পানি রাফালের সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছিল, কোন? কর্তার হস্তক্ষেপে অম্বানিরা তার মধ্যে ঢুকে পড়ল- এসব নিয়ে সারা ভারত এখনও তোলপাড়, সুপ্রিমকোর্ট সে মামলা টেনেই চলেছে; চৌকিদারের অবস্থা সঙ্গিন।

২. অন্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতার রাষ্ট্রপোষিত বিস্তার, ধর্মীয় পেশিপ্রদর্শন

যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতেই হবে। তাই অবিশ্রান্ত চলেছে সাম্প্রদায়িক প্রচার। ভারত হিন্দুর দেশ বাস্তবের সঙ্গে সংগতিহীন- এ প্রচার করছে শাসকের সমর্থক ও ভিত্তি নানা হিন্দুত্ববাদী দল। এদের সবার স্লোগান হল ‘গরব সে কহো, হম্? হিন্দু হ্যায়।’

কিন্তু হিন্দু হলেই যে সবাই ধোয়া তুলসীপত্র হবে এবং তার মধ্যে কোটাসম্মত অপরাধী আর দুর্নীতিবাজ থাকবে না, তা তো দাবি করা চলে না! মোদিজি নাকি সাম্প্রতিক একটি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘একটি হিন্দু সন্ত্রাসবাদী আমাকে দেখিয়ে দিন’!

হিন্দুদের মধ্যে যদি সন্ত্রাসবাদী না জন্মায়, নাথুরাম গডসে; সেই গান্ধিজির হত্যাকারী, তা হলে কী? কারা খুন করল সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে, যুক্তিবাদী কালবুর্গি এবং গোবিন্দ পানসারেকে? কারা দিল্লির আখলাককে মারল রেফ্রিজারেটরে তথাকথিত ‘গোমাংস’ রাখার জন্য? কারা মালদা থেকে রুজির সন্ধানে যাওয়া মুসলমান শ্রমিককে পুড়িয়ে মারল, পরে বীর হিসেবে পূজিত হল; আর এখন শুনছি, লোকসভার প্রার্থীও হল? হরিয়ানায় গুরগাঁওয়ে পেটানো হল অন্য ধর্মীয়দের, এখন খবরে দেখছি, সেখানেও মাংস বিক্রি বন্ধ করার ব্যবস্থা হচ্ছে, মুরগি বা পাঠার মাংস পর্যন্ত।

হিন্দুধর্মের মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের পুরান ইতিহাস, ইতিহাসের চিহ্ন সবই বদলানো হচ্ছে। হয় তা বাবরি মসজিদের মতো ধ্বংস করা হচ্ছে, না হয় তার নাম বদলে তার ইসলামী স্পর্শ ঘোচানো হচ্ছে। মুঘল সরায় জংশন রাতারাতি হয়ে গেল দীনদয়াল উপাধ্যায় জংশন।

বলা হচ্ছে, রাবণের একটি বিমানবাহিনী ছিল, প্লাস্টিক সার্জারি করে গণেশের কাঁধে হাতির মাথা বসানো হয়েছিল, গোমূত্র খেলে ক্যান্সার সারে, ময়ূরের চোখের জল পান করে ময়ূরী ডিম উৎপাদন করে, মহাভারতে গান্ধারীর শতপুত্র স্টেম সেল প্রক্রিয়ার জন্মেছে- এ রকম হাজারও গালগল্পকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে বিজ্ঞানের নামে চালানো হচ্ছে।

শবরীমাল নামে কেরলের মন্দিরে, নারীর প্রবেশাধিকারে বাধা দিয়েছিল এ হিন্দুত্ববাদীরাই, তারাই রামমন্দির প্রতিষ্ঠার হুঙ্কার ছাড়ে মাঝেমধ্যে, ভারতে অন্য ধর্মের নাগরিকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখতে চায়। এ দিকে হনুমান জয়ন্তীতে হনুমানের পূজো হিন্দু-বীরত্বের আস্ফালনের চেহারা নিচ্ছে, যেমন একই চেহারা নিচ্ছে অস্ত্র হাতে রামনবমীর মিছিল।

এ অসহিষ্ণুতা আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের এক ছদ্মবেশ হল, আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) প্রণয়ন আর সেটি ধরে বহু মানুষকে ভারত থেকে বার করার চেষ্টা।

আসামে স্থানে স্থানে সেটা শুধু বাংলাদেশি বা স্থানীয় মুসলমান বিদ্বেষ নয়, বাংলাভাষী বিদ্বেষ হিসেবেও দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আসামে আছে, আসামের কৃষি এবং অন্য অর্থনীতিতে যোগ্য ভূমিকা রাখছে, দীর্ঘদিন ভোট দিয়েছে- এমন মানুষদের এন শিবিরে রাখা হচ্ছে। তারা খুনও হচ্ছে, কেউ কেউ আত্মহত্যাও করছে। এ মানবিক ট্র্যাজেডির মূলে আছে হৃদয়হীন এক রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, যার ভিত্তি সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক।

এখন নানা নির্বাচনী বক্তৃতায় বলা হচ্ছে, বিজেপি ক্ষমতায় ফিরে এলে অন্য রাজ্যেও এনআরসি তৈরি করবে। এ এক অদ্ভুত ডাইনি-সন্ধান শুরু হয়েছে দেশে। সেই যে কাশ্মীর এক গলার কাঁটা হয়ে আছে দেশে, তা ভারত আর পাকিস্তান দুই দেশের কেউ গিলতে বা উগরাতে পারছে না।

ফলে কাশ্মীরে এক বিচিত্র ও কিম্ভূত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে সংবিধানের ৩৭০ ধারায় তাদের নানারকম সুবিধে (সস্তায় চাল-ডাল, পেট্রল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) দেয়া হচ্ছে, যার জন্য প্রতিবেশী জম্মুর অধিবাসীরা ক্ষেপে থাকে; অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদী ছাপ পেয়ে কাশ্মীরের মানুষেরা প্রতিদিন নানা নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ হচ্ছে, অত্যাচারও চলছে তাদের ওপর।

এ শতাব্দীর গোড়া থেকে এরা স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ‘বৈদিক গণিত’ বলে একটা বিষয় আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে আর সিলেবাসে পৌরোহিত্য, সেই সঙ্গে অ্যাস্ট্রোলজি বা জ্যোতিষ-গণনাকেও প্রাণপণে ঢোকানের চেষ্টা করে চলেছে।

ইদানীংকালে কী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণা করবে, তার বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষায় বাজেটের এক দশমাংশ অর্থসংস্থান বামপন্থীদের চিরকালের দাবি, সে বিষয়ে আগের কোনো সরকার মনোযোগ দেয়নি; এ সরকার উল্টো অর্থসংস্থান আরও কমিয়ে এনেছে।

যুক্তিবাদীরা এদের অত্যন্ত অপছন্দ (কোনো ধর্মেই তারা তত পছন্দসই নয়), তাই যুক্তিবাদী নির্মূল করার এক গোপন এজেন্ডা ভারতে চালু হয়েছে মনে হয়। গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের পরিসরকে এরা এতই কমিয়ে এনেছে যে, যাকে-তাকে এরা ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করছে।

অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ একটা কথা বললেন তো তিনি ‘দেশদ্রোহী’; আমোল পালেকর দু-একটা অপছন্দের কথা বললেন তো তিনি ‘দেশদ্রোহী’। কবি শ্রীজাত একটা কবিতা লিখল তো সে ‘দেশদ্রোহী’।

পুলওয়ামার পর একটা প্রবল ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ জিগির উঠেছিল, সেটাতে যারা সায় দেয়নি; তারাও ‘দেশদ্রোহী’। এ বাড়াবাড়িতে স্বয়ং আদভানিজি সম্প্রতি একটি টুইট করে জানিয়েছেন, ‘না, যারা বিজেপির বিরুদ্ধে, তারাই দেশদ্রোহী নয়।’ অন্যদিকে হিন্দুধর্মের নিজস্ব (এবং স্বাভাবিক বিচারে কুৎসিত ও অমানবিক) জাতপাতের সিঁড়ির ধাপের একেবারে তলায় পড়ে থাকা দলিতদের ওপর এদের বিতৃষ্ণা কম নয়।

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একজন দলিতের পা ধুইয়ে দিয়েছেন মহাসমারোহে, টেলিভিশন ক্যামেরার উজ্জ্বল প্রদর্শনে। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ আর অন্যরা দলিতদের বাড়িতে পাত পেড়ে খেয়েছেন। এসবই দেখনধারী পরিকল্পনা, তাতে দলিতদের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। এসব ভান-ভঙ্গিতে আর লোকে ভুলছে বলে মনে হয় না। নারীদের ওপরে বিধিনিষেধও দিন দিন বেড়েই চলেছে।

৩. শুধু ধর্ম নয়, সামরিক পেশি প্রদর্শন করে ভোট প্রার্থনা

সম্প্রতি পুলওয়ামা বলে একটি জায়গায় অন্তত পঞ্চাশজনের মতো ভারতীয় জওয়ান সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণে নিহত হয়েছে- আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে এ এক কলঙ্কজনক ঘটনা।

কীভাবে এ ঘটনা ঘটল, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ফাঁক ছিল কী না, সে সম্বন্ধে তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ধরেই নেয়া হয়েছে যে, এটা পাকিস্তান-পোষিত জঙ্গিরা করেছে এবং যদিও এই ঘটনার খবর পাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী কোনো? এক টেলিভিশন প্রোগ্রামের শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন বলে জানা গেছে, তবু জবাবে তিনি আর একটি ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বাহিনী পাঠান, এবং তা নাকি পাকিস্তানের বালাকোটে গিয়ে প্রচুর জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করে আসে। এটা দেশ-বিদেশের সাংবাদিক মহলে বেশ কিছু প্রশ্ন এবং হয়তো কিছুটা হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।

কেউ কেউ জানিয়েছেন, বালাকোট থেকে জঙ্গিরা অনেক আগেই তাদের ঘাঁটিগুলো সরিয়ে নিয়েছিল, কাজেই সেখানে বিমানবাহিনী পাঠানোর মানে কী? কেউ কেউ বলেছেন, আরে গিয়ে তো দেখা গেল, কয়েকটা পাইনগাছের ভাঙা ডাল আর একটা মরা দাঁড়কাক; তা হলে এ কী রকমের সামরিক কীর্তি হল?

অন্যদিকে ওই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করতে গিয়ে আমাদের একজন সামরিক কর্তা অভিনন্দনের প্লেন ধ্বংস হল, তিনি প্যারাসুটে পাকিস্তানের সীমানাতেই নামতে বাধ্য হলেন এবং পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ তাকে সসম্মানে বিনাক্ষতে ভারতে ফিরিয়ে দিলেন; এতে নিশ্চয় যুদ্ধবিলাসী ভারতীয়রা খুব হতভম্ব হয়েছেন।

কারণ, খুব প্রত্যাশিতভাবেই প্রতিটি নির্বাচনের আগে যুদ্ধের একটা আবহ তৈরি করা হয়, যুদ্ধ ‘এই লাগে কী, সেই লাগে’ অবস্থা তৈরি করে ক্ষমতাসীনদের অপরিহার্যতা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। এবারে সেই কৌশলে ইমরান খান জল ঢেলে দিলেন অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দিয়ে। এ ‘শান্তি-আক্রমণ’ আমাদের শাসকদের বেশ একটু অস্বস্তিতে ফেলেছে সন্দেহ নেই।

যুদ্ধটা কেমন যেন জমতে জমতেও জমল না। এসব নাটকীয় ঘটনার রেশ না কাটতেই ভারতীয় নভোবিজ্ঞানীরা একটা সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘শক্তি’র ক্ষমতা প্রদর্শন করলেন; তা একটি দূরবর্তী কৃত্রিম উপগ্রহকে নিখুঁতভাবে ধ্বংস করল। বিজ্ঞানীদের এ সাফল্যকে প্রধানমন্ত্রী এখন নিজের সাফল্য বলে ঘোষণা করছেন এবং তারই ভিত্তিতে ভোট প্রার্থনা করছেন।

বাইরের জঙ্গিদের দমন করাতে সাফল্য দূরে থাক, এখনও কাশ্মীরে বা অন্য সীমান্তে একজন দু’জন করে জওয়ানের প্রাণ যাচ্ছে আর দাবি করা হচ্ছে যে, ও পক্ষেরও সমান বা (প্রায়ই) দ্বিগুণ বা তিনগুণ জঙ্গির প্রাণ যাচ্ছে আমাদের সৈন্যদের হাতে।

কিন্তু ভেতরের সন্ত্রাসীরাও থেমে নেই। মধ্যপ্রদেশে, ছত্রিশগড়ে, ওডিশায় তথাকথিত ‘মাওবাদী’রা পুলিশের কনভয় উঠিয়ে দিচ্ছে, মন্ত্রীও রেহাই পাচ্ছেন না। সরকার কিছু প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীকে ‘আরবান’ বা নাগরিক নকশাল নাম দিয়ে গায়ের ঝাল মেটাচ্ছে; কিন্তু অরণ্যের ওই দিশি নকশালদের দমনে কোনো ভালোরকম সাফল্য এখনও দেখা যায়নি।

৪. এখন কী হবে?

আমার লেখা থেকে বোঝা যাবে, আমি ভারতীয় নাগরিকদের যে অংশের প্রতিনিধি; তারা কেউ চায় না বর্তমান শাসক দলের সরকার ফিরে আসুক। এর মধ্যে আমার স্তরের অনেকে, যেমন ভারতের একশ’র বেশি চিত্রপরিচালক, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, তারা আর এ সরকারকে চান না। পশ্চিমবঙ্গেও বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু আমরাই কি সব? এখনও ভোট-জ্যোতিষীরা নানা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়িয়ে চলেছে। কেউ বিজেপিকে এগিয়ে রাখছে, আবার কেউ পিছিয়ে দিচ্ছে। একটি সমীক্ষা বলছে, উত্তরপ্রদেশে অর্থাৎ ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশে প্রায় ৮০ সিটের মধ্যে বিজেপি ৭১টি পেয়েছিল ২০১৪-তে, এবার তা ২১ থেকে ৩২-এ নেমে আসবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কোন? দিব্যদৃষ্টিতে জানি না, বলে যাচ্ছেন বিজেপি এবার ১০০-র বেশি সিট পাবে না।

সবই হতে পারে, যদি মানুষ স্বচ্ছন্দে নিজের ভোটটি দিতে পারে। তাতে যাদের চাই না, তারাও যদি আসে আপত্তি নেই; গণতন্ত্রের জয় বলে মাথা পেতে নেব। কিন্তু তা কি হবে? ত্রিপুরার গত নির্বাচনে যেমন দেখা গেল এবং পশ্চিমবঙ্গের গত কয়েকটি নির্বাচনে, বুথে গিয়ে নির্বিঘেœ নিজের ভোটটি দিয়ে আসব, সেই ইচ্ছাকে ভণ্ডুল করার জন্য শাসকের মস্তান বাহিনী সার-সার দাঁড়িয়ে আছে।

একদিকে তারা প্রার্থীকে ভয় দেখাচ্ছে, কিনে নিচ্ছে বিপুল টাকা দিয়ে (মিডিয়াকেও এখন কিনে নিয়েছে, ‘পেইড নিউজ’ বলে একটি ব্যাপার এখন প্রায় স্বীকৃতি পেয়ে গেছে), না হলে রাস্তায় ফেলে পেটাচ্ছে; আর নয়তো ভোটারকে বলছে, বাড়ি থেকে বেরোবার কষ্ট করবেন না, আমরাই আপনার ভোটটি দিয়ে দেব।

আবার কোথাও চলছে টাকার খেলা, ভোটারদের টাকা দিয়ে ভোট কেনা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের জন্যই নাকি শাসক দলের ৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের খবর আছে।

এ গভীর ও অন্তহীন নেতিবাচক ছবির মধ্যে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দেশের ভোট পর্ব ১১ এপ্রিল, ২০১৯ থেকে শুরু হয়েছে; শেষ হবে ২৩ মে ফল প্রকাশের চূড়ান্ত ঘটনায়।

অসহায় মানুষের সেই অসহায় উচ্চারণটাই করি, ‘দেখা যাক’। (মতামত লেখকের নিজস্ব)

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×