পহেলা বৈশাখ কতটা পালিত হয়েছে গ্রামাঞ্চলে?

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুঈদ রহমান

পহেলা বৈশাখ। ফাইল ছবি

যথাযথ আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে এবারের পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হল। নতুন নতুন বাহারি পোশাক, নাচগান, র‌্যালি আর খাওয়া-দাওয়ায় কমতি ছিল না। আমাদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও তিন দিনের মেলা হল, তা ছিল অসাধারণ। এর কৃতিত্ব বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারীকে দিতে হবে। সংস্কৃতির বড় মাহাত্ম্য হল সে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।

একই আচার-আচরণের মানুষের মধ্যে ছোটখাটো যে বিরোধ থাকে তা মিটিয়ে সমাজকে শক্তিশালী করে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক জীবনের যে অদম্য ছুটে চলা তা থেকে খানিকটা পরিত্রাণ দেয় এ উৎসব। তারপরও বলা হয়ে থাকে বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে কম-বেশি ১২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অর্থনীতিতে এর প্রভাব উল্লেখ করার মতো। সবকিছু মিলিয়ে ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি নিয়ে বর্তমান জাতিসংঘও সোচ্চার। প্রতিটি দেশের, প্রতিটি জাতির, প্রত্যেক নৃ-গোষ্ঠীর স্বতন্ত্রতা বাঁচিয়ে রাখতে হবে সভ্যতার প্রয়োজনে।

কিন্তু এ বছরের উৎসব শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের মানুষের মনকে আমরা জাগিয়ে তুলতে পারিনি। এভাবে গুটিকতক মানুষকে নিয়ে পহেলা বৈশাখ বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। শহরে যে কারণে উৎসবটি বেঁচে আছে তা হল কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠনের অস্তিত্ব। তাছাড়া শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুটা নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যও সবাই সাময়িক হলেও আনন্দ খোঁজে।

পরিবারে বাবা-মা দু’জনেই সারা বছর কর্মের পেছনে ছোটেন, তাই এ দিনটিতে তারা একটু প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিতে চান। কিন্তু পহেলা বৈশাখের সঙ্গে যে আমাদের অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে সে বোধ আমাদের ক’জনারই বা আছে। বেশিরভাগ অভিভাবকই মনে করেন, তাদের সন্তানের যেন আমেরিকা-ইংল্যান্ডে বসবাস করার সুযোগ মেলে। সংস্কৃতি এমন জিনিস যা দীর্ঘদিন অবহেলিত হলে, দীর্ঘদিন চর্চা না হলে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলে। সংস্কৃতি বড় অভিমানী, অবহেলা সইতে পারে না। খুব দূরদর্র্শী মানুষ ছাড়া সংস্কৃতির মাহাত্ম্য বুঝতে পারা দায়, সেটা শুধু নামকাওয়াস্তে উল্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

শহরের সংস্কৃতিবান মানুষ এখনও ঘুমিয়ে আছে। গ্রামের অবস্থা ঘুরে দেখে আসুন। গ্রামের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করা না-জায়েজ- এটা হিন্দুদের উৎসব এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রামের সহজ-সরল মানুষ তা আমলে নিয়েছে। গত এক বছর ধরে ধর্ম ব্যবসায়ীরা এ কাজটি করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু গ্রামই বা বলব কেন, শহরের অনেক মসজিদেই গত শুক্রবারের জুমায় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনকে হারাম বলে প্রচারণা চালানো হয়েছে। ধর্মের কথা বলে এ দেশকে পাকিস্তান বানানো হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধর্ম পাকিস্তানকে টেকাতে পারেনি।

অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। আজ আবার সেই বাংলাদেশকে, সেই বাঙালিকে, সেই বাঙালির উৎসবকে ‘হিন্দু’র তকমা দেয়ার অপচেষ্টা চলছে। আমাদের উদাসীনতা-আত্মতৃপ্তির সুযোগে এ প্রচারণা একদিন ‘বিষবৃক্ষ’ হয়ে দেখা দেবে। পহেলা বৈশাখের পরের দিন কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে এ বিষয়ে গ্রামের নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে।

ভাবাই যায় না, ধর্ম ব্যবসায়ীরা কতদূর এগিয়েছে! গ্রামের মানুষ অবলীলায় বলছেন, আমরা মূর্খ মানুষ অতশত জানি না, মওলানা সাহেব বলল পহেলা বৈশাখ নাকি হিন্দুদের ব্যাপার। এ থেকে সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে কি?

অথচ এ গ্রামের মানুষ একযুগ আগেও বাংলা নববর্ষে পিঠে বানিয়ে উৎসব পালন করত। কখনও এর সঙ্গে ধর্মকে জড়ায়নি, হিন্দু-মুসলমানে ফারাক করেনি। সেই বাংলার মানুষের কানে বিষ ঢালছে কারা, কোন প্রক্রিয়ায়- তার হিসাব তো আমরা কেউ রাখছি না। ১০ বছরে উন্নয়নের অনেক গল্প শুনেছি; কিন্তু সংস্কৃতির যে বেহাল অবস্থা হয়েছে তার দিকে আমাদের খেয়াল নেই। পকেটে টাকা এলো কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে সমাজ ভেঙে খান খান হয়ে গেল- এতে লাভের লাভ কিছু হবে কি? আমরা ‘হেরিটেজ’কে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়ন করতে চাই।

আজকের বাংলাদেশের মূল সমস্যা হল রাজনীতির তিরোধান। রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বিএনপি, আওয়ামী লীগ কারোর প্রতি মানুষের ন্যূনতম আস্থা নেই। মানুষ সরলীকরণ করে ফেলেছে যে, রাজনীতি মানে হল ক্ষমতায় থাকলে অবৈধ টাকা উপার্জন আর বিরোধী হলে জেলখানায় বসবাস। কেউ টাকা কামানোর পিছে ছুটছে আর কেউ জেল ঠেকাতে ব্যস্ত।

দু’পক্ষের টানাটানিতে সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও চর্চার কাজ ঘুচে গেছে। যেহেতু সাংস্কৃতিক চর্চা নেই, তাই দিন দিন মানসিক সুস্থতাও হারিয়ে যাচ্ছে, ধৈর্যের সীমা অধিকতর সীমিত হয়ে আসছে। মানুষ এখন নিজের ওপর নিজেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। এর পরিণতি ভালো নয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১০ বছর ধরে সরকারের দায়িত্বে আছে। জিডিপিতে বলার মতো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বছরে ২২ লাখ কোটি টাকার উৎপাদন করে। বাজেটের পরিমাণ সাড়ে চার লাখ কোটি টাকারও বেশি। এমন একটি অর্থনীতিকে সামাল দিতে গেলে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের প্রয়োজন আছে। আওয়ামী লীগ যদি বিরোধী দলের আসনেও বসে, সেখানেও কোনো দল যাচ্ছেতাই করতে পারবে না, সেটা প্রতিহত করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগ রাখে বলেই বিশ্বাস করি।

কিন্তু সমস্যাটা হল দলটি ক্ষমতায় থাকাটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে আদর্শের অনেকখানিই খুইয়ে বসেছে। জামায়াত একটি যুদ্ধাপরাধী দল, কোনো সন্দেহ নেই। জামায়াত গণহত্যার পাপকে সঙ্গে নিয়ে এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার রাখে না। সেদিক বিবেচনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা আওয়ামী লীগের একটি সাহসী ও প্রশংসনীয় সাফল্য; কিন্তু আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব- অসাম্প্রদায়িক চেতনা।

সেদিক বিবেচনায় আমরা দেখব বাংলাদেশে এমন অনেক সংগঠন আছে যারা ধর্মান্ধতায় জামায়াতের চেয়েও কয়েক ধাপ উপরে। তারা হয়তো একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল না; কিন্তু একাত্তরের চেতনার বিপরীত দর্শন অনুসরণ করে। সেই গোষ্ঠীকে আওয়ামী লীগ শুধু ভোটের রাজনীতির স্বার্থে আদর-আহ্লাদ করেছে, অনাকাক্সিক্ষত সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নির্ভীক ও আপসহীন রাজনীতির সঙ্গে এহেন আচরণ সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি অতিশয় পুরনো এবং ১০০ শতাংশ অকার্যকর। বাঙালি সত্তার কাছে তা চূড়ান্তভাবে পরিত্যাজ্য এবং তা টেবিলে বসে মীমাংসা হয়নি, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এ ফয়সালা হয়েছে। আজকে যারা স্বাধীনতা দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করে এবং তা পালনে অস্বস্তি বোধ করে তাদের স্থান এ দেশে হবে কেন? মাত্র ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে চলে যেতে পারে ইয়াহিয়া-ভুট্টো-ইমরান খানের পাকিস্তানে। আর আওয়ামী লীগেরই কী দায় পড়েছে তাদের তোষামোদ করার।

এ কথা মানতেই হবে, ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে দিতে। সেটা করতে হলে বাংলাদেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলা দরকার। তাই তো পাকিস্তানের আদলে ‘বাংলাদেশ বেতারের’ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ‘রেডিও বাংলাদেশ’। আমরা সেসব কথা ভুলে যাইনি। কিন্তু ইতিহাস তো দীর্ঘ মেয়াদে ‘ইথিক্যালি নিউট্রাল’! তাই তো বাংলার মানুষ আজকে বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান একটি যমজ শব্দ।

একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। ‘শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। এ সত্য যারা অস্বীকার করবে, তাদের সঙ্গে কোনো রকমের বিতর্ক, বাদ-প্রতিবাদ করতেও আমরা রাজি হব না’ (আহমদ ছফা, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’; পৃষ্ঠা : ২৮)। বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করার পর আমাদের দায়িত্ব নয় কি তার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে চিরস্থায়ী করা?

রেহমান সোবহান, কাজী খলীকুজ্জমান, মইনুল ইসলাম, জায়েদ বখত, আবুল বারকাত, আতিউর রহমানের মতো টপঅর্ডার অর্থনীতিবিদ আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ৭৫ শতাংশ আওয়ামী ঘরানার। এ দলটিকে কেন ‘লেঠেল’ কিংবা পশ্চাৎপদ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের ওপর ভর করতে হবে?

দেশের রাজনীতি চর্চায় মেধা ও যুক্তির চেয়ে পেশিশক্তি অধিকতর ক্রিয়াশীল। যে সমাজে ভালো ও খোলামেলা রাজনীতির সুযোগ থাকে না সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও অনুপস্থিত থাকে। আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতিতে অপসংস্কৃতি, কুসংস্কৃতি অবলীলায় পাখা মেলে বেড়ায়।

যদি বর্তমান সরকারি সংগঠন গ্রামপর্যায় থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত, তাহলে ধর্মান্ধদের কথা কেউ কানে তুলত না। কিন্তু সরকারি দলের নেতাকর্মীরা তো সব ধরনের অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব নিয়ে মহা ব্যস্ত। এ সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে মৌলবাদীরা। সরকার এ ব্যাপারে সজাগ না হলে আগামীতে পহেলা বৈশাখ সর্বজনীনতা হারিয়ে শুধুই শহুরে কিছু মানুষের পান্তা-ইলিশের অতি ক্ষুদ্র উৎসবে পরিণত হবে।

সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়