সময় নিয়ে যত কথা

  তানভীর রানা মুস্তাফিজ ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘড়ি,

সে অনেককাল আগের কথা। রাজা-বাদশাহদের সময়। একদিন এক রাজা সকালে উঠে মন্ত্রীকে বলল, ‘মন্ত্রী কাল রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছি।’ মন্ত্রী বলল, ‘কী স্বপ্ন দেখেছেন রাজা সাহেব?’ ‘দেখলাম সাদা দাড়িওয়ালা এক দরবেশ। আমাকে বলছে একটা শিশুর ভেতর এমন এক সম্পদ আছে যেটা তোর ভেতর নেই।’ চতুর মন্ত্রী বলল, ‘রাজা সাহেব আপনি হলেন এ রাজ্যের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি। একটা শিশুর সঙ্গে কোন দিক দিয়ে আপনার তুলনা হয়?’

রাজা চিন্তিত গলায় বলল, ‘তাহলে এ স্বপ্নের অর্থ কী? একটা শিশুর ভেতর কী থাকতে পারে যা আমার নেই?’ মন্ত্রী ভাবল এ তো ভালো সমস্যায় পড়া গেল দেখি। ভালোই তো চলছিল সব। হঠাৎ করে একি যন্ত্রণা!’ রাজা গম্ভীর গলায় বলল, ‘মন্ত্রী তোমাকে আমি এক সপ্তাহের সময় দিলাম। এর ভেতরে তুমি আমাকে এ প্রশ্নের জবাব এনে দেবে। যদি এর ভেতর জবাব আমি না পাই তাহলে তোমার গর্দান যাবে।’

সেই সময় তো আর গুগল ছিল না যে মন্ত্রী চট করে গুগল সার্চ করে প্রশ্নের উত্তর বের করে ফেলবে। তাছাড়া গর্দান চলে যাওয়াটাও খুবই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। দেখা গেল মধ্যাহ্নভোজ রাজা সাহেবের মনমতো হয়নি। পরদিন সকালে হেড বাবুর্চির গর্দান চলে গেল। তাই মন্ত্রী সাহেব তাড়াহুড়ো করে সেই দরবেশের খোঁজে বের হয়ে পড়ল। দিন যায় রাত যায় মন্ত্রী এক দেশ থেকে আরেক দেশ, কত পাহাড়-পর্বত-জঙ্গল পার হলেন। অবশেষে অনেকদিন পর একদিন এক পাহাড়ের চূড়ায় সেই দরবেশের দেখা পাওয়া গেল।

দৃশ্যটা এরকম। পাহাড়ের ওপর একটা বিশাল বটগাছ। তার নিচে সাদা দাড়িওয়ালা জটাধারী সন্ন্যাসী। মন্ত্রী বলল, ‘হুজুর প্রশ্নের জবাব কী? না জানালে যে আমার গর্দান যাবে।’ দরবেশের চোখ বন্ধ। হঠাৎ একটা হাত উঠিয়ে গম্ভীর গলায়- ‘এ তো বড় সহজ বৎস। শিশুর কাছে যে সম্পদ আছে সেটা রাজার কাছে নেই সেটা হল সময়। শিশুর হাতে অফুরন্ত সময় সম্পদ আছে। রাজার বয়স এখন পঁচাশি। রাজার সঙ্গে সেই সময় নামের সম্পদটি এখন আর নেই।’

লালন বলেছেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, আর ইংরেজ কবি রালফ হডসন লিখেছেন ‘টাইম ইউ ওল্ড জিপসি ম্যান’। সময় যে কারও জন্য অপেক্ষা করে না, শুধু তার ঘোড়ার গাড়ি ছুটিয়ে সামনেই এগিয়ে চলে। সেই রাজা-বাদশাহদের সময় থেকে এখন চলে আসুন আজকের এ সময়ে। আপনি অফিসের বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন বলে সকাল থেকে তার রুমের বাইরে বসে আছেন। আপনার পাঁচ মিনিটের কাজ। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল অথচ বসের সময়ই হচ্ছে না কথা বলার।

মাথার ওপর দেয়াল ঘড়ি টিক টিক করে চলছে। আপনি টিক টিক শব্দ শুনছেন আর ভাবছেন বড় সাহেব বয়সে হয়তো আপনার সমানই হবে। অথচ বড় সাহেবের পাঁচ মিনিট সময়ের মূল্য আসলে আপনার সারা দিনের সময়ের সমান। আপনি ভাবলেন আশ্চর্য- এসময়ের পার্থক্যটা হল কখন? কখন আপনার সারা দিন বড় সাহেবের পাঁচ মিনিটের সমান হয়ে গেল? রহস্যটা কী?

সময় নিয়ে এ রহস্যভেদ করার জন্য আপনি ফেলে আসা সময়ের কথা ভাবতে শুরু করলেন। আপনার মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সেই শীতের সকাল। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আপনি চলেছেন স্কুলের পথে। ক্লাসে বসে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছেন। অজানাকে জানার চেষ্টা করছেন। রাতে পড়ার টেবিলে বানান করে কিছু লিখছেন। সেই সময় আপনি পেছনে লাঠির ঠক ঠক শব্দ শুনতে পান।

দেখেন দাদু কখন যেন আপনার পড়ার টেবিলে পেছনে দাঁড়িয়েছেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আপনার পড়া দেখছেন। আপনি ভাবছেন দাদুকে প্রশ্ন করবেন কেন এতসব কিছু জানার চেষ্টা করছেন। কী হবে এতকিছু জেনে? দাদু হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে দু’বার ঠক ঠক শব্দ করে নিজের মনেই বলে ওঠেন- ‘ভালো করে পড়। পৃথিবীর এ এক কঠিন সত্য বুঝলি। যে সময় চলে যায় সে আর ফিরে আসে না।’

বলতে বলতে তিনি উদাস দৃষ্টিতে রাতের আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হল যেন রাতের কালো অন্ধকারে তিনি নিজের জীবনের ফেলে আসা সময়কেই খুঁজে ফিরছেন। আপনি আবার বইয়ের পাতায় ডুবে যান। দাদুকে প্রশ্নটা আর করা হয়ে ওঠে না। আপনার ফুর্তিবাজ মামা আবার বলেন অন্য কথা- ‘সময় চলে গেলে ফিরে না কে বলল? শোন তাহলে ঘটনা। সেদিন সন্ধ্যা ছ’টায় জাদুকর পিসি সরকার সিনিয়র শহরের মিলনায়তনে ম্যাজিক দেখাবেন। এক মাস আগেই সেই শো-এর সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।

সময়ের আগেই সব মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ। সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছেন কখন আসবেন জাদুকর। কিন্তু সময় পেরিয়ে যায়; তার কোনো দেখা নেই। ছ’টা থেকে সাড়ে ছ’টা, সাড়ে ছ’টা থেকে সাতটা বাজতে চলল; কিন্তু জাদুকর পিসি সরকারের দেখা নেই। তখন দর্শকের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসে গুঞ্জন ম্যাজিক শো হবে তো আজ? ঘড়িতে যখন সাড়ে সাতটা বাজল তখন সবাই মোটামুটি ধরে নিল আজকের শো কোনো কারণে বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

অনেকে এর মধ্যেই নিজের আসন ছেড়ে উঠে পড়ল। ঠিক তখনই জাদুকর সিনিয়র পিসি সরকার হঠাৎ মঞ্চে এসে হাজির হলেন। এত দেরি করে আসায় অনেক দর্শকই তাদের উষ্মা প্রকাশ করে তার কাছে দেরির কারণ জানতে চাইল। জাদুকর সঙ্গে সঙ্গে খুবই অবাক হয়ে বললেন, ‘দেরি হল কোথায়? আমি তো কাঁটায় কাঁটায় সঠিক সময়ে এসেছি। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখুন ঠিক ছ’টা বাজে।

সবাই ভাবল জাদুকরের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ঘড়িতে রাত আটটা বাজে অথচ তিনি বলছেন সন্ধ্যা ছ’টা। তবুও আরেকবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য সবাই ঘড়ির দিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্য মিলনায়তনের সব গুঞ্জন থেমে গেল। কী অদ্ভুত ব্যাপার ঘড়িতে ঠিক সন্ধ্যা ছ’টা বাজে। কিন্তু এ কী করে সম্ভব! পিসি সরকার সাহেব সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী আমার কথা বিশ্বাস হল?’ মুহূর্তের হতবিহ্বলতা কাটিয়ে মিলনায়তন তালিতে ফেটে পড়ল। আসলে এটাই ছিল তার সেদিন সন্ধ্যার প্রথম জাদু।’

আপনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো মামার কথা শুনতে থাকেন- ‘কিন্তু এটা কী করে সম্ভব- সময় কী করে ঘুরে গেল?’ মামা বলেন- ‘জানি না। তবে আমার ধারণা এমন হতে পারে সেদিন মিলনায়তনের স্টেজের সামনে বড় একটি ঘড়ি রাখা হয়েছিল। সেই ঘড়িটি ইচ্ছাকৃতভাবে সবাইকে ভুল সময় দেখাচ্ছিল। পিসি সরকার স্টেজে আসার আগ মুহূর্তেই বিশাল সেই ঘড়ির সময় পরিবর্তন করে দেয়া হয়। তাই সবাই বোকা বনে যায়। এই যে সময়- এটা একটা ইলিউশন রে। আর কিছু না।’ কথাগুলো বলেই মামা শিষ বাজাতে বাজাতে চলে গেল।

অফিসে বসে থাকতে থাকতে এক সময় আপনার বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। বড় সাহেব আপনাকে বসতে বলেন না। গুনেগুনে তিন মিনিটে আপনার সঙ্গে কাজ শেষ করেন। রাতের খাবার শেষে আপনি খোলা ছাদে এসে দাঁড়ান। কখনও রাতের আকাশে টুপ করে একটা তারা ঝরে পড়ে। গ্রীষ্ম পেরিয়ে শীত আসে। বাতাসে গাছের পাতা ঝরে পড়ে। সময়ের সেই রহস্যটা তবুও রয়েই যায়।

তারপর একদিন আপনার জীবনেও সেই অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটে যায়। নদীর ধারে বিশাল বটগাছ। তার নিচে সাদা দাড়িওয়ালা সেই সন্ন্যাসী। তবে এখন সময় বদলে গেছে। সন্ন্যাসীর হাতে নতুন মডেলের ল্যাপটপ। দাড়িতেও হালকা কলপ দেয়া হয়েছে বলে আপনার সন্দেহ হচ্ছে। সন্ন্যাসী ল্যাপটপের দিকে বলল- ‘বাডি মানুষ হল সময়ের ফেরিওয়ালা।’ আধুনিক সন্ন্যাসী এখন আর বাংলায় বৎস বলে না, ইংরেজিতে বলে বাডি। আপনি অবাক হয়ে বললেন- ‘সময়ের ফেরিওয়ালা- বিষয়টা যদি একটু খুলে বলেন দরবেশ বাবা।’

সন্ন্যাসী বলল- ‘প্রতিটি মানুষ একটা অদৃশ্য সম্পদ নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নেয়। সেই সম্পদের নাম সময়। জন্মের পর থেকে যত সময় যায় সেই সম্পদের পরিমাণ কমতে থাকে। মনুষ্য জীবনে আমাদের কাজ হল নিজেদের এই সময়কে ঠিকঠাক কাজে লাগিয়ে একসময় অন্যদের কাছে এ সময়টাকে বেশি দামে বিক্রি করা। সেই অর্থে আমরা সবাই হলাম সময়ের ফেরিওয়ালা।’

আপনি কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকেন। সন্ন্যাসী বলে- ‘কত বেতন পাস? দশ হাজার? তার মানে হল তুই তোর জীবনের সময় অন্য একজনের কাছে বিক্রি করছিস দশ হাজার টাকায়। এই যে এতসব বড় বড় ডিগ্রি, এর কাজ হল অন্যদের কাছে আমাদের সময়ের মূল্যটাকে বাজারে বাড়িয়ে নেয়া। পড়াশোনা শেষে আমরা সবাই যার যার মতো নিজেদের সময় বিক্রি করার চেষ্টা করি। যাদের সময় কেউ কিনতে আগ্রহী হয় না তারা হয় বেকার। এজন্যই তোর বসের পাঁচ মিনিট সমান তোর সারাদিন, বুঝেছিস?’

এরপর চলে গেছে অনেকটা সময়। একদিন আপনি জানলেন টুইন প্যারাডক্স বা যমজ দুই ভাই বোনের ধাঁধার গল্পটা। গল্পটি বলেছেন আলবার্ট আইনস্টাইন সময়ের রহস্যময়তা বোঝানোর জন্য। জিম ও ক্যারেন যমজ দুই ভাই বোন। ত্রিশ বছর বয়সে একদিন জিম সুযোগ পেল মহাকাশ ভ্রমণের। জিমের এ অত্যাধুনিক মহাকাশযান চলতে পারে আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে। আইনস্টাইন তার থিওরি অফ রিলেটিভিটিতে বলেছেন কোনো কিছুর গতি যতটা আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছে যেতে থাকবে সময় তার জন্য তত দীর্ঘ বা স্থির হয়ে যেতে থাকে। কঠিন এ থিওরির আপনি কিছু বুঝলেন, কিছু বুঝলেন না।

তবে টুইন প্যারাডক্স কাহিনীর শেষটা আপনি ঠিক কল্পনা করতে পারেন। বিশ বছর পর জিম মহাকাশ ভ্রমণ শেষে ফিরে এসেছে পৃথিবীর মাটিতে তার যমজ বোনের সঙ্গে দেখা করার জন্য। মহাকাশযান থেকে নেমে সে দেখতে পায় অনেক দূর থেকে বৃদ্ধা এক মহিলা হুইলচেয়ারে তার দিকে এগিয়ে আসছে। জিম কাছে গিয়ে দেখে এ বৃদ্ধ মহিলাটি আর কেউ নয় তারই যমজ বোন ক্যারেন। সময়ের গতির কাছাকাছি চলার কারণে মহাকাশযানে জিমের জন্য সময় কেটেছে বিশ বছর; কিন্তু ওই একই সময় পৃথিবীতে ক্যারেনের জন্য সময় কেটে গেছে পঞ্চাশ বছর। জিমের বয়স এখন পঞ্চাশ হলেও ক্যারেনের বয়স এসময়ে বেড়ে হয়ে গেছে আশি বছর।

এটাই হল আইনস্টাইনের টুইন প্যারাডক্স। কাহিনীর শেষ দৃশ্যটা হয়তো বা এরকম। বিশাল মহাকাশযানের সামনে যমজ দুই ভাই বোন জিম ও ক্যারেন দেখা হয়েছে। পঞ্চাশ বছরের জিম হাঁটু গেড়ে হুইলচেয়ারের সামনে আশি বছরের অশতীপর বৃদ্ধা ক্যারেনের হাত ধরে বসে আছে। তারা দুজন দুজনের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর দুজনের চোখ দিয়েই গড়িয়ে পড়ছে পানি।

টরেন্টোর আকাশে আজ ঝকঝকে রোদ। বসন্তের আগমনে রাস্তার পাশের বরফগুলো গলতে শুরু করেছে। গাছের ডালে উঁকি দিচ্ছে নতুন পাতা। প্রকৃতি যেন প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে রহস্যময় করে তুলছে। মাথার ওপর টিক টিক দেয়াল ঘড়ি। আমরা যত বেশি সবকিছু জানতে চেষ্টা করি প্রকৃতি যেন নিজেকে তত বেশি আড়াল করে নেয়, সবকিছু আরও বেশি রহস্যময় করে তোলে আমাদের কাছে। প্রতিদিনের জীবন চলে যায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। দিন শেষে থেকে যায় শুধু একলা বারান্দার ওই কাঠের চেয়ারটা।

তানভীর রানা মুস্তাফিজ : টরেন্টো, কানাডা প্রবাসী লেখক ও নাট্যকার

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×