রাফি হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা

  বদরুদ্দীন উমর ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিহত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।
নিহত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে সামাজিক নৈরাজ্য কত গভীর দেশ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে, প্রতিদিন ধর্ষণের ঘটনা তার এক বড় প্রমাণ। এমন দিন নেই যখন সংবাদপত্রে ধর্ষণের একাধিক ঘটনার রিপোর্ট থাকে না।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সারা দেশে ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে তার একশ’ ভাগের এক ভাগও সংবাদপত্রে রিপোর্ট হয় কিনা সন্দেহ। শুধু ধর্ষণই নয়, ধর্ষণের ক্ষেত্রে যেসব লোমহর্ষক ব্যাপার ঘটে তার সব থেকে সাম্প্রতিক উদাহরণ হল নুসরাত জাহান রাফির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। এর থেকে শুধু ধর্ষণের ঘটনার ব্যাপারই নয়, মানুষের নিষ্ঠুরতার প্রবণতা কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে তারও প্রমাণ এর মধ্যে আছে।

ধর্ষণের ঘটনা যে কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়, এটা যে-কোনো স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের কাছেই পরিষ্কার। দেশে মিথ্যা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ধাপ্পাবাজি ও স্বার্থপরতা আজ যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে তো বটেই, এমনকি বিশ শতক পর্যন্ত এদেশেও অভাবিত ছিল। কিন্তু এখন এটাই হল বাংলাদেশের সাধারণ পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতি থেকে নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডকে আলাদাভাবে বা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। আগে শিক্ষকদের দ্বারা ছাত্রী ধর্ষণের কোনো কথা শোনাই যেত না। সাধারণ স্কুল-কলেজ তো বটেই, মাদ্রাসায় যে এটা ঘটতে পারে এটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য ছিল।

কিন্তু এই অপরাধের ব্যাপক বিস্তৃতি এখন এক স্তম্ভিত হওয়ার মতো। বলাই বাহুল্য, সামাজিক ক্ষেত্রে যেভাবে এসব ঘটছে, এটা দেশের সাধারণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে যে অবিচ্ছিন্ন এটাও এক বাস্তব সত্য। দেশে যদি সুস্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকত, দেশে যদি সমাজতান্ত্রিক তো নয়ই, এমনকি যদি কোনো কল্যাণমূলক ও জনগণের স্বার্থের পক্ষের কোনো সরকার থাকত, তাহলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব কিছুতেই সম্ভব হতো না।

কাজেই এখন নুসরাত হত্যাকাণ্ড এবং ব্যাপক ধর্ষণের ঘটনাবলী যেভাবে ঘটছে, তাকে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ব্যাপার মনে না করে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবেই দেখতে হবে। সেটা না হলে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু হৈচৈ হলেও এর থেকে বের হয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা ঘটতেই থাকবে এবং এর ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি রোধ করার চিন্তা এক চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।

১০ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত জাহান রাফির শোচনীয় মৃত্যু হয়। ফেনী জেলার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী ছিলেন তিনি। সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা দীর্ঘদিন ধরেই নিজের মাদ্রাসার ছাত্রীদের ধর্ষণ করে আসার অভিযোগ আছে। মাদ্রাসার মতো একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হলেও সে একটি নিকৃষ্ট ক্রিমিনাল। তার সম্পর্কে নানা রিপোর্ট থাকলেও পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

শুধু তাই নয়, নুসরাত তাকে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে গেলে সে নুসরাতের সঙ্গে জঘন্য এবং অপমানজনক ও অসভ্য ব্যবহার করে। তাকে উল্টো গালাগালিও দেয়। এর থেকে স্পষ্ট যে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং সে সরকারসমর্থক লোক। সিরাজ উদ্দৌলা যে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত লোক তার অন্য বড় প্রমাণ একাধিক আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা কর্তৃক আদালতের সামনে এ ব্যাপারে অভিযোগ স্বীকার করে বক্তব্য প্রদান।

‘হাত-পা বেঁধেছে মণি, আগুন দেয় জাবেদ’- এই শিরোনামে নুসরাত হত্যার এক দীর্ঘ রিপোর্ট ২১ এপ্রিলের যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। তার বিস্তারিত বিবরণের কোনো প্রয়োজন এখানে নেই। তবে এই রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে যে, পরীক্ষার দিন পরীক্ষা দিতে নসুরাত মাদ্রাসা গেলে তাকে ভুলিয়েভালিয়ে মণি নামে এক ছাত্রী মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত ছিল আরও বেশ কয়েকজন।

মণি নামে ছাত্রীটি নুসরাতকে দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধে, অবশ্যই অন্যদের সহায়তায় এবং তার পর জাবেদ নামে একজন নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। তাদের মধ্যে নিজেদের পরিচয় গোপন করার জন্য দু’-তিনজন ছেলে বোরকা পরে ছিল। এরপর তারা বোরকা একটা পুকুরে ফেলে দেয়। পরে এদের পরিচয় ধরা পড়ার পর পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকেও পুলিশ গ্রেফতার করে। সে আদালতের সামনে ধর্ষণের ঘটনা স্বীকার করেছে।

যেভাবে এ ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, তার থেকে বিপজ্জনক ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা নুসরাতকে ধর্ষণ বা ধর্ষণ চেষ্টা যেভাবে করেছে এবং ধর্ষণ প্রতিরোধ করার জন্য নুসরাত যে চেষ্টা করেছে তার জন্য তাকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করে অধ্যক্ষ। এর জন্য সে মাদ্রাসারই অন্য ছাত্রছাত্রীদেরকেও তার অপরাধমূলক কাজ- ধর্ষণের মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এবং সাধারণভাবে সমাজে কী ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে এবং বিরাজ করছে, এর থেকে তার প্রামাণ্য উদাহরণ আর কী হতে পারে?

সারা দেশে কী অবস্থা তৈরি হয়েছে তার ওপর গত কয়েকদিনে প্রথম আলোয় যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি শিরোনাম হল- ছাত্রীকে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি প্রধান শিক্ষকের (১২ এপ্রিল), স্কুল ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে মামলা (১১ এপ্রিল), ধর্ষণের পর ছাত্রীকে বাড়ির পাশে ফেলে গেল তারা (১০ এপ্রিল), ফরিদপুরে আড়াই বছরের শিশুকে ধর্ষণ (৯ এপ্রিল), দরজা ভেঙে ঘর ঢুকে ধর্ষণ (৯ এপ্রিল), ধর্ষণ ধামাচাপা দিতে ধর্ষকের সঙ্গে বাল্যবিবাহের চেষ্টা (৮ এপ্রিল), দুর্গাপুরে কিশোরীকে ধর্ষণ (৭ এপ্রিল), নোয়াখালীতে শিশু ধর্ষণ (৬ এপ্রিল), ধর্ষণের শিকার হয়ে সহায়তা চাইতে গিয়ে ফের ধর্ষণ (৬ এপ্রিল), পিরোজপুরে স্কুল ছাত্রী ধর্ষণ, শিশু কন্যা অন্তঃসত্ত্বা, অসহায় মা (১ এপ্রিল), সুবর্ণচরে আবার গণধর্ষণ (১ এপ্রিল)।

এসব রিপোর্ট কি এদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখে। এর থেকে কি বোঝা যায় না, সমাজের সর্বস্তরে ধর্ষণ কিভাবে ব্যাপকতা লাভ করেছে। আরও যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয় তাতে দেখা যায় অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সংস্থায় ধর্ষণ এখন পরিণত হয়েছে এক নিয়মিত ব্যাপারে। সবাই জানে প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ধর্ষণের রিপোর্ট থাকবেই, যেভাবে থাকে সড়ক দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য অপরাধমূলক রিপোর্ট। অবস্থা দেখে মনে হয়, সব কিছুই এখন এ দেশের জনগণের গা-সহা হয়ে গেছে।

এবার আসা যেতে পারে এসব ঘটনার সঙ্গে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, ঔদাসীন্যই শুধু নয়, অনেক সরকারি সংস্থার যোগসাজশের বিষয়। একটি সরকার দেশ পরিচালনা ও শাসন করে। এটাই তার কাজ। এক্ষেত্রে তার দায়িত্ব হল শুধু কল্যাণমূলক কাজ নয়, অপরাধমূলক কাজের বিরোধিতা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীকে উপযুক্ত ও দ্রুত শাস্তি প্রদান। বাংলাদেশে কি এসব আছে? শ্রেণীগতভাবে এখন বাংলাদেশ শাসন করছে ফড়িয়া চরিত্র সম্পন্ন লুটপাটকারী ব্যবসায়ীরা, লুণ্ঠনজীবী ব্যাংকাররা এবং অর্থনীতি ক্ষেত্রের নানা দুষ্টচক্র।

এদের স্বার্থের সঙ্গে জনগণের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। উপরন্তু জনগণের স্বার্থ সম্পূর্ণ অবহেলা ও উপেক্ষা করেই এরা অভূতপূর্ব দ্রুততার সঙ্গে দেশে নিজেদের লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং বৃদ্ধি করছে। এই উদ্দেশ্যে সরকারের সমগ্র প্রশাসনযন্ত্র, পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদির মতো সব সশস্ত্র বাহিনী এদের অনুগত। এটা যদি না হতো তাহলে নুসরাতের ধর্ষক ও হত্যাকারী অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ করতে গেলে নুসরাতকে যেভাবে হেনস্তা ও অপমান করা হয়েছিল সেটা সম্ভব হতো না।

দেশে যত ধরনের অপরাধী আছে তাদের এখন বেশ সুশৃঙ্খলভাবে একই সূত্রে গাঁথা হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারি সংস্থাগুলো। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া সারা দেশে বড় আকারে হয়েছে। বেশকিছু প্রতিবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে। বিক্ষোভ হচ্ছে। কিন্তু একেকটি অপরাধের ঘটনার পর শুধু বিক্ষোভ, তা যত বড়ই হোক, তাতে কোনো প্রতিকার যে হয় না এটা প্রমাণিত। বিক্ষোভ অবশ্যই দরকার, তবে এর প্রতিকারের জন্য শুধু বিক্ষোভ নয়, প্রয়োজন সাংগঠনিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এর বিরুদ্ধে একটানা আন্দোলন, আজকের বাংলাদেশে যা অনুপস্থিত।

২১.০৪.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×