শ্রীলংকায় দরকার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নেতৃত্ব

  দিলরুকশি হ্যান্ডুনেত্তি ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীলংকায় দরকার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নেতৃত্ব

হোটেলে পর্যটক এবং গির্জায় ইস্টার সানডের প্রার্থনারত খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে বোমা হামলার ঘটনাটি এক দশক আগে যন্ত্রণাদায়ক গৃহযুদ্ধের অবসানের পর শ্রীলংকাকে হাতুড়িপেটা করার মতো। তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর সর্বক্ষেত্রে শান্তিপ্রেমী শ্রীলংকানদের জন্য মেরুদণ্ড ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার মতো, যা তাদের ওই সময়ের সহিংস অতীতস্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যখন সন্ত্রাসী হামলা জাতীয় এজেন্ডাগুলোকে নিয়মিত প্রভাবান্বিত করত।

প্রায় তিন দশকের মতো সময় আমরা পরিচিত ছিলাম এমন একটি স্থান হিসেবে, যা কিনা নির্মম গেরিলা সংগঠন লিবারেশন টাইগার অব তামিল ইলামের (এলটিটিই) জন্ম দিয়েছিল। কৌশল হিসেবে সংগঠনটির শিউরে ওঠা আত্মঘাতী বোমা হামলার সঙ্গে হুবহু মিল দেখা গেছে রোববারের গণহত্যার অপরাধীদের বেলায়ও।

কিন্তু সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে অপরিচিত না হলেও এককভাবে একদিনে এই মাত্রার এবং এই পর্যায়ের সংঘবদ্ধ হামলার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীলংকা এর আগে কখনও হয়নি। আমাদের স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফেরা, ১০ বছর ধরে তূলনামূলক শান্তির লালনপালন প্রকৃতপক্ষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

যদিও দ্বীপ দেশটি বিক্ষিপ্ত জাতিগত সহিংসতার ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছে অতীতে, রোববারের বিস্ফোরণগুলো বড় ধরনের একটি পরিবর্তন তৈরি করেছে। বস্তুত, এ হামলাগুলো দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর সবচেয়ে বড় হামলা। এটি এমন একটি অঞ্চল যা বহু বিশ্বাসকে ধারণ করে। পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক পরিচিতির রাজনীতি, বিভেদ সৃষ্টিকারী জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থী সহিংসতাও এ অঞ্চলে কম নয়।

জনসাধারণের প্রতি দেয়া এক আবেদনে শ্রীলংকার ক্যাথলিক চার্চের প্রধান কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত যিশুর উদাহরণ অনুসরণ করার জন্য সব খ্রিস্টানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, যিশু তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং তাদের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। তার প্রার্থনা ছিল, পরিবারের সদস্যদের হারানোর তীব্র মনঃকষ্ট এবং আকস্মিক আঘাত সত্ত্বেও বিভিন্ন বিষয় (হামলা-প্রতিশোধ) খ্রিস্টানদের নিজেদের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করা যাবে না।

দ্বীপদেশ শ্রীলংকায় খ্রিস্টানদের নিজেদের ধৈর্যের পরীক্ষা অনেকবার দিতে হয়েছে। দুশ’র বেশি চার্চের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ন্যাশনাল ক্রিস্টিয়ান ইভাঞ্জেলিক্যাল অ্যালায়েন্স অব শ্রীলংকার তথ্যমতে, চলতি বছর দেশটিতে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ২৬টির বেশি বৈষম্য, হুমকি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ৮৬টি। কিন্তু তাদের ওপর পুনঃপুন হামলার ঘটনা সত্ত্বেও খ্রিস্টান জনগণ স্বভাবগতভাবে একই ধরনের জবাব দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

সোমবার মন্ত্রিসভার মুখপাত্র রাজিথা সেনারত্নে স্বল্পপরিচিত উগ্র ইসলামপন্থী গ্রুপ ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াতকে হামলার পেছনের শক্তি হিসেবে দাবি করে প্রথমবারের মতো সরকারি বিবৃতি দিয়েছেন।

কলম্বোয় তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, এটা ছিল একটা বিস্ময় যে, অতি ক্ষুদ্র একটি দলের একই সময়ে একাধিক স্থানে এমন বড় ধরনের সিরিজ হামলা চালানোর সক্ষমতা ছিল। তিনি আরও দাবি করেছেন, শ্রীলংকা সরকারের কিছু সূত্র কিছুটা সময় হামলার হুমকির বিষয়ে অবগত ছিল। ‘এসব ঘটনা ঘটার ১৪ দিন আগে তাদের (ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত) সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি’- বলেছেন সেনারত্নে। যদিও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি।

হামলা রোধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। কিন্তু যেসব মানুষ নিজেদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তারা এতে খুব কমই সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন। কার্ডিনাল রঞ্জিত এবং অন্যরা দ্রুত একটি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইতিমধ্যে ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কিন্তু ইসলামী একটি সংস্থাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন একটি হুমকিকে হাইলাইট করা হল- এটি এমন একটি বিষয় যা এতদিন শ্রীলংকার জানাশোনার বাইরে ছিল। সরকার ইসলামপন্থী গ্রুপটির বৈশ্বিক সংযোগ তদন্ত করে দেখার শপথ করেছে, যেমনটি করা উচিত।

একইসঙ্গে দেশের ভেতরে যারা দায়ী তাদেরও শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। তবে এটাও উপলব্ধি করতে হবে যে, চরমপন্থার লাগাম টেনে ধরার প্রচেষ্টায় সুনির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায় বা ধর্মীয় বিশ্বাসের গ্রুপকে ভিকটিম বা ঘটনার শিকারে পরিণত করার মধ্য দিয়ে যেন উপসংহার টানা না হয়।

জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের পদক্ষেপ পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে এবং সম্ভবত সন্ত্রাসবাদকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নতুন পদক্ষেপ, নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা সোমবার মধ্যরাত থেকে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানাই।

কিন্তু আমরা যেন কোনোভাবেই ভুলে না যাই যে, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে ভবিষ্যৎ সহিংসতা প্রতিরোধ এবং আইন মান্যকারী শ্রীলংকান নাগরিকদের নাগরিক স্বাধীনতাগুলো রক্ষা- এ দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা।

মনে হয় কলম্বোয় আমাদের নেতারা নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থতার দায়ভার আংশিকভাবে সরকারের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের আচরণ দেশের জন্য সহায়ক হবে না এবং নিশ্চিতভাবে পরিস্থিতির শিকার পরিবারগুলোরও কোনো উপকারে আসবে না।

আমাদের ছোট্ট দ্বীপদেশটি যথেষ্ট ভোগান্তির শিকার হয়েছে। আমাদের এমন রাজনৈতিক নেতাদের দরকার নেই, যারা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মৌখিক বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে, এমনকি এমন একটি জাতীয় বিপর্যয়ের সময়ও।

বর্তমান পরিস্থিতি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নেতৃত্বের দাবি করে। এটাই একমাত্র বিষয় যা আমাদের দরকার- ব্যক্তি বা জাতিগত-ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না করে সন্ত্রাসকে পরাজিত করার সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে। এই দুঃখের সময় আমাদের সরকারকে অবশ্যই হতে হবে জবাবদিহিমূলক এবং একইসঙ্গে দায়িত্বশীল।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

দিলরুকশি হ্যান্ডুনেত্তি : শ্রীলংকার সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংয়ের নির্বাহী পরিচালক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×