আসুন বইকে জনপ্রিয় করি

  রাজীব সরকার ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসুন বইকে জনপ্রিয় করি
বইমেলা। ফাইল ফটো

বিখ্যাত ‘বইকেনা’ প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলী এক ড্রয়িংরুম-বিহারিণীর গল্প বলেছিলেন। তাকে কোনো উপলক্ষে বইকেনার উপদেশ দেয়া হলে তিনি বলেছিলেন, এটিও একটি তার বাসায় আছে। একটি বই থাকাকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেছিলেন।

এত বছরেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে বলে মনে হয় না। এ যুগের একটি গল্প শুনলেই সেটি স্পষ্ট হবে। এক ধনী ঠিকাদার একটি সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণের পর বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেছেন। সবাই বাড়ির স্থাপত্য ও আসবাবপত্রের প্রশংসা করছেন। এক বন্ধু বললেন, এতকিছুর মধ্যে বইয়ের অভাব ভালো লাগছে না।

বাড়িতে একটি লাইব্রেরি থাকলে ভালো হতো। করিৎকর্মা ঠিকাদারের জবাব- ‘কোনো ব্যাপার নয়। আজই আমি ১০ টন বইয়ের অর্ডার দিচ্ছি।’ ইট, সিমেন্ট, রডে বুঁদ হয়ে থাকা সেই ভদ্রলোকের মাথায় বইয়ের হিসাবও টন দিয়েই।

ফেব্রুয়ারি মাস এলে বইয়ের প্রতি আমাদের মৌসুমি ভালোবাসার জয়জয়কার শুরু হয়। সেই ভালোবাসার আয়ু মাত্র এক মাস। মার্চ মাসের শুরুতেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা নির্বাপিত হয় এবং ভালোবাসার পুনরুত্থানের জন্য অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য। পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলা হয় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা হল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। কালসীমার বিচারে আমাদের অমর একুশে বইমেলা এ গ্রহের দীর্ঘতম বইমেলা।

কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। পাঠক, লেখক, প্রকাশক- প্রত্যেকের জন্যই অনাবিল আনন্দের উৎস বইমেলা। এরপরও প্রশ্ন- বইয়ের পাঠক কি কমে যাচ্ছে? তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের অভাবনীয় যুগে এবং ফেসবুকের দাপটে বই কি গুরুত্ব হারাচ্ছে?

বই নিয়ে রথী-মহারথীদের অমর উক্তির অভাব নেই। আমরাও কারণে-অকারণে তা উদ্ধৃত করতে ভুল করি না; কিন্তু বইকে অন্তর থেকে ভালোবাসি ক’জন? একটি বিয়ের অনুষ্ঠান কল্পনা করা যাক। বিপুল অর্থব্যয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অতিথিরা দামি উপহার নিয়ে আসছেন। টিভি, ফ্রিজ, ডিনারসেট থেকে শুরু করে প্রাইজবন্ড অর্থাৎ নগদ টাকাও কেউ কেউ উপহার দেন। যদি কোনো অতিথি মহামূল্যবান উপহার বই নিয়ে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, সবাই বাঁকা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাবেন। উপহারদাতা বিব্রত হবেন, গ্রহীতা অসন্তুষ্ট হবেন। এভাবেই ‘মহামূল্যবান উপহার’ বই অনাদরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

পুরস্কার পেতে সবাই ভালোবাসি। বিভিন্ন উপলক্ষে প্রতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পুরস্কার পায়। এসব পুরস্কারের সিংহভাগজুড়ে আছে ক্রেস্ট আর ক্রোকারিজ। খুব দ্রুত এসব ক্রেস্ট ধূলির স্তূপে মলিন হয়ে যায়। আর ক্রোকারিজ?

বাংলাদেশে এমন একটি শিক্ষিত পরিবার পাওয়া যাবে, যে পরিবারে ডিনারসেট, স্যুপসেট, কাপ, প্লেট, চামচ নেই? কিন্তু এমন পরিবার পাওয়া কঠিন হবে না, যে পরিবারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত পাঠ্যসূচির বাইরে অন্য বইয়ের পাঠাভ্যাস নেই, কদর নেই। ক্রোকারিজের বদলে শিক্ষার্থীদের হাতে যদি পুরস্কার হিসেবে বই তুলে দেয়া হয় তাতে লাভ ছাড়া কোনো ক্ষতি নেই। যদি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরস্কার হিসেবে বইকে অগ্রাধিকার দেয় তবে প্রতিটি পরিবারে ধীরে ধীরে একটি লাইব্রেরি গড়ে উঠবে এবং বইয়ের বিপণন বাড়বে।

বইয়ের পাঠক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতিকে দায়ী করেন অনেকে। কিন্তু এ অগ্রগতির পীঠস্থান ইউরোপ-আমেরিকায় কি বইয়ের পাঠক কমেছে? একেবারেই না। এক বছর ইউরোপে থাকার সুবাদে দেখেছি বাসে, ট্রামে, ট্রেনে, প্লেনে অধিকাংশ যাত্রী বই বা কোনো ম্যাগাজিন নিয়ে মগ্ন।

সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ, আড্ডা, চিৎকার বা বাকবিতণ্ডা অনুপস্থিত উন্নত দেশগুলোর গণপরিবহনে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির নির্যাসটুকু রাজহাঁসের মতো জল থেকে দুধ ছেঁকে নেয়ার পদ্ধতিতে আহরণ করছে তারা। এজন্য পাঠাভ্যাসকে বিসর্জন দিতে হয়নি। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বর্বরোচিত ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে। সমাজবিশ্লেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, সহনশীল, উদার ও মানবিক সমাজ গঠন ছাড়া এ ধরনের হিংস্র ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত মূল্যবান। সঠিক পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে এ বোধ তৈরি করা সম্ভব যে শুধু ধর্ম, রক্ত, বর্ণ, শ্রেণীর কারণে কেউ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে না। সভ্যতা ও মূল্যবোধ বিকাশে বইয়ের গুরুত্ব অপরিহার্য।

বৈষয়িক স্বার্থসিদ্ধিকে লক্ষ্য করেই আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম সাজানো হয়। এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মত্ত নতুন প্রজন্ম। ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’র মতো দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতে থাকা শিক্ষার্থীদের যদি মানবিক মূল্যবোধ ও পরস্পরের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাবের মধ্য দিয়ে বড় করতে হয় তবে তাদের পাঠাভ্যাসকে অবারিত করতে হবে। বাংলাসাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মননশীল ও সৃজনশীল বইয়ের আনন্দ ধারায় অবগাহনের সুযোগ করে দিতে হবে তাদের। এজন্য প্রয়োজন বইকে জনপ্রিয় করা।

একসময় আজিজ সুপার মার্কেট বিখ্যাত ছিল বই বিপণন কেন্দ্র হিসেবে। এখন এর পরিচিতি ফ্যাশন হাউসের শোরুম হিসেবে। বইয়ের দোকান সেখানে কমে যাচ্ছে। এ রকম উদাহরণ অন্য জেলাগুলোতেও। তাই বইকে জনপ্রিয় ও সহজলভ্য করা জরুরি।

শেখ সাদী বলেছিলেন, মদ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটে শুঁড়িখানায় যায় মদ খাওয়ার জন্য। আর দুধ মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। সেই দুধ গোয়ালা কাঁধে বয়ে বাড়িতে এসে দিয়ে যায়। বইকেও এভাবে পাঠকের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। বইকে জনপ্রিয় ও আদরণীয় করে তুলতে হবে। শুধু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দিকে না তাকিয়ে প্রকাশক, বিক্রেতা, প্রতিষ্ঠানপ্রধান, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী- সবাই মিলেই এ কাজ করা প্রয়োজন।

পাঠাভ্যাসকে আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যাসের অন্তর্গত করতে হবে। এ কাজটি করা কেন জরুরি সেজন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথের ‘লাইব্রেরি’ প্রবন্ধের সূচনাটুকু মনে রাখলে বইয়ের অতুলনীয় ভূমিকা সম্পর্কে কোনো দ্বিধা থাকে না- ‘মহাসমুদ্রের শত বছরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত।

এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ... বিদ্যুৎকে মানুষ লোহার তার দিয়া বাঁধিয়াছে, কিন্তু কে জানিত মানুষ শব্দকে নিঃশব্দের মধ্যে বাঁধিতে পারিবে। কে জানিত সংগীতকে, হৃদয়ের আশাকে, জাগ্রত আত্মার আনন্দধ্বনিকে, আকাশের দৈববাণীকে সে কাগজে মুড়িয়া রাখিবে! কে জানিত মানুষ অতীতকে বর্তমানে বন্দি করিবে! অতলস্পর্শ কালসমুদ্রের ওপর কেবল এক-একখানি বই দিয়া সাঁকো বাঁধিয়া দিবে!’

রাজীব সরকার : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×