ভেনিজুয়েলায় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলছে

  ব দ রু দ্দী ন উ ম র ০৭ মে ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর অবরোধ চেষ্টা চালিয়ে সেখানে অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি সত্ত্বেও সেখানকার জনগণকে দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য মরিয়া হয়েছে।

কয়েকদিন আগে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন এজেন্ট জুয়ান গুয়াইদো এক সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এখন আরও বেশি মরিয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ অবস্থায় বারবার বলছেন, অবরোধ ছাড়াও তাদের হাতে আরও বিকল্প আছে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে তারা নিজেরাই ভেনিজুয়েলায় সামরিক আক্রমণ করে মাদুরো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন। এ কাজ তারা যতখানি সহজ মনে করছেন তত সহজ নয়।

এর প্রতিক্রিয়া যে শুধু ল্যাটিন আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে এমন নয়। সারা দুনিয়ায় এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হবে এবং মার্কিনের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে। তাছাড়া অবরোধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জনগণের একটা অংশের মধ্যে সরকারবিরোধিতা থাকলেও মাদুরো সরকারের পেছনে জনগণের সমর্থনের শক্তি কম নয়। এর কারণ দক্ষিণ ও ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের সঙ্গে তারা পরিচিত এবং ভেনিজুয়েলাকে নতুন করে মার্কিন কলোনিতে পরিণত করার তারা বিরোধী। রাজধানী কারাকাসে ১ মে সরকারের সমর্থনে এক বিশাল মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ট গুয়াইদো সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এখন চেষ্টা করছেন সৈন্যদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে নামিয়ে আনতে। এজন্য মাদুরো সামরিক বাহিনীর প্রতি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টাকে ব্যর্থ করার জন্য নতুন করে যে আহ্বান জানিয়েছেন, তারপর গুয়াইদোর অবস্থা এখন ক্ষিপ্তের মতো।

এই ক্ষিপ্ত অবস্থায় তিনি জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিটি সমরিক ঘাঁটির সামনে জমায়েত হয়ে সৈন্যদের কাছে আহ্বান জানাতে, যাতে তারা সেনাপ্রধানের নির্দেশ ছাড়াই নিজেরা অভ্যুত্থান ঘটাতে এগিয়ে আসেন। সামান্যসংখ্যক সৈন্য ছাড়া দৃশ্যত গুয়াইদোর এই আহ্বানে কেউ সাড়া দেয়নি। মাদুরো সরকার এই সামান্যসংখ্যক সৈন্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। সামরিক বাহিনী মাদুরো সরকারের প্রতি তাদের সবার সমর্থন ঘোষণা করেছে।

সামরিক হাইকমান্ডের সঙ্গে এক বৈঠকে মাদুরো বলেছেন, ‘আমাদের নৈতিক শক্তি সংহত রাখতে হবে এবং অভ্যুত্থানের সব চেষ্টা ব্যর্থ করতে হবে।’ ভেনিজুয়েলার টেলিভিশনে এই অনুষ্ঠানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। মাদুরো এই অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘কারও ভয়ের কারণ নেই। এটা হচ্ছে শান্তি বজায় রাখার সময়।’ সামরিক বাহিনীর হাইকমান্ডের সঙ্গে বৈঠকের অনুষ্ঠানে সাড়ে চার হাজার সামরিক অফিসার উপস্থিত ছিলেন।

দেশরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ­াদিমির পাদ্রিনো বলেছেন, ‘আমরা এখানে এসেছি সুপ্রিম কমান্ডার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি আমাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করতে। মাদুরোই হলেন আমাদের একমাত্র প্রেসিডেন্ট।’ বিরোধী নেতা গুয়াইদোর নিজেকে নিজেই ভেনিজুয়েলার আইনসম্মত প্রেসিডেন্ট ঘোষণাকে তিনি এভাবে নাকচ করেন।

গুয়াইদোর সমর্থক বিরোধী নেতা লিওপোলদো লোপেজকে তার অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার জন্য গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ৩০ এপ্রিল বিরোধীদের সহায়তায় তিনি ঘর থেকে বের হয়ে গুয়াইদোর এক জনসভায় বক্তৃতা করেন। এর জন্য ভেনিজুয়েলার সুপ্রিমকোর্ট পুনরায় তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু জনসভার পর লোপেজ স্পেনের দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন এবং স্পেন বলেছে, তারা তাকে সরকারের হাতে তুলে না দিয়ে আশ্রয় দেবে।

ভেনিজুয়েলার সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের যে চেষ্টা গুয়াইদো করছিলেন, তার ব্যর্থতার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট মাইক পম্পেও এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের অবস্থা একেবারেই ক্ষিপ্তের মতো। তারা এখন খোলাখুলিভাবেই বলছেন, যেহেতু অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করে এবং চক্রান্তমূলক তৎপরতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপসারণের জন্য সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বা আক্রমণ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

ট্রাম্প নিজে বেশ কিছুদিন থেকেই বলে আসছেন, তার টেবিলে সব রকম বিকল্পই আছে, অর্থাৎ তারা সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারেন। কিন্তু এ মুহূর্তে পম্পেও ও বোল্টন যেভাবে এই আক্রমণের জন্য ব্যস্ত হয়েছেন এবং ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন তাতে উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দেয়া ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথাবার্তার পর এ বিষয়ে তার দ্বিধা আপাতত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা এখন খুব স্পষ্ট যে, প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া অন্য পথ খোলা নেই। তবে সেটা এখনই সম্ভব কিনা তা বিবেচনার ব্যাপার এবং ট্রাম্প এ বিবেচনা করছেন।

অসামান্য প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট মাদুরো নিজেদের সরকারকে রক্ষা করছেন এবং বিরোধী শক্তিসমূহের মোকাবেলা করছেন; কিন্তু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট দূর করার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ অগ্রগতি নেই। এর মূল কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর অবরোধ জারি করে রেখেছে এবং কেউ সে অবরোধ মান্য না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছে। ভারত ভেনিজুয়েলা থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করত। সে কারণে তারা প্রথমত এই নিষেধাজ্ঞা মানার ব্যাপারে রাজি ছিল না। কিন্তু এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের হুমকি দেয়ায় তারা পিছিয়ে গেছে এবং ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানি বন্ধ করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ইরানের ক্ষেত্রেও এ কাজ করা সত্ত্বেও ইরানের তেল রফতানি বন্ধ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা সম্ভব হয়নি। ইরানের তেল রফতানি কমে এলেও সংকট সেখানে খুব বড় আকারে দেখা দেয়নি। তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো অবস্থায় আছে। এ কারণে ইরানের সরকার পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট হলেও তাদের বিশেষ কোনো সাফল্য সেখানে নেই। ইরান বেশ দাপটের সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার মোকাবেলা করছে।

ভেনিজুয়েলায় তেলের মজুদ বিশ্বে সব থেকে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও অসুবিধা আছে। ভেনিজুয়েলায় তেল তুলনায় ঘন ও ভারি এবং তা পরিশোধন করা অধিকতর ব্যয়সাপেক্ষ। এজন্য তারা সরাসরি অপরিশোধিত তেলই রফতানি করে, যা অন্য দেশ কিনে নিয়ে পরিশোধন করে। ভেনিজুয়েলায় এই তেল পরিশোধনের ব্যবস্থা সেভাবে না থাকায় তার রফতানি বাধাপ্রাপ্ত হয়।

তারা নিজেরা যদি বেশি খরচে তেল পরিশোধন করে রফতানি করে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যেভাবে পড়ে গেছে তাতে লাভের সম্ভাবনা নেই। শুধু তাই নয়, ভেনিজুয়েলায় তেল পরিশোধন ব্যবস্থা ছোট আকারে হওয়ায় দেশের চাহিদা পুরোপুরি মেটানো তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সেখানে বিদ্যুৎ ঘাটতি এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ সমস্যা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। প্রেসিডেন্ট শাভেজের সময় থেকে এদিকে দৃষ্টি দিয়ে পরিকল্পনা না করায় এবং অভ্যন্তরীণভাবে যথেষ্ট পরিমাণ তেল পরিশোধনের মতো অবস্থা না থাকায় বিদ্যুৎ সংকট দূর করা সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

কিউবা ভেনিজুয়েলাকে যথাসাধ্য সাহায্য করে এসেছে শাভেজের আমল থেকে। তারা তাদের প্রয়োজনীয় তেল ভেনিজুয়েলা থেকে নিয়ে ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রভূত সহায়তা করেছিল ওষুধপত্র, চিকিৎসক ইত্যাদি পাঠিয়ে। এ কারণে ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সব থেকে ভালো। কিন্তু কিউবা একটি ছোট দেশ এবং বিদেশি মুদ্রার পরিবর্তে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দায়িত্ব নিয়ে তারা তেল আমদানি করত এবং এখনও করে থাকে। এজন্য অবরোধ না মানার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকেও অহরহ হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু কিউবার তেল আমদানির পরিমাণ তুলনায় খুব সামান্য। চীনও ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানি করে। কিন্তু তাদের বিশাল প্রয়োজনের তুলনায় তাদের তেল কেনার পরিমাণ বেশি নয়।

সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ সালমানের চীন সফরের সময় চীন সৌদি আরবের সঙ্গে দশ বিলিয়ন ডলারের তেল আমদানি চুক্তি করেছে। এই সংকটজনক অবস্থায় ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানি বৃদ্ধি না করে সৌদি আরবের থেকে তেল নিচ্ছে। কারণ একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়োজন আছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতা সত্ত্বেও ভেনিজুয়েলার বিপুল অধিকাংশ তেল রফতানি হতো যুক্তরাষ্ট্রে। সেটা বন্ধ হওয়ায় চীনের আমদানি বৃদ্ধি পেলে ভেনিজুয়েলার সংকট অনেক কম হতো। কিন্তু চীন ভেনিজুয়েলা সরকারের সমর্থক হলেও তারা তা করছে না।

শাভেজের আমল থেকেই ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির একটা বড় দুর্বলতার দিক হল, তেল রফতানির ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকা। ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করে সেখানে উৎপাদনের ক্ষেত্র বৃদ্ধি ও সম্প্রসারিত করা হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে তাদের অর্থনৈতিক সংকট বড় আকারে দেখা দিয়েছে তেল রফতানির বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধের কারণে। খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য হওয়ায় এ ক্ষেত্রে এমন সংকট বড় আকারে দেখা দিয়েছে তেল রফতানি আগের তুলনায় অনেক কম হওয়ায়। খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস আমদানির মতো বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান ভেনিজুয়েলায় নেই।

কিন্তু এসব অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সংকটের মুখেও ভেনিজুয়েলা এখনও পর্যন্ত টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ভেনিজুয়েলা যেভাবে সংকটে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তাতে দেশটির অবস্থা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে, কিছুই বলা যায় না।

০৫.০৫.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত