পুষ্টির মানোন্নয়নও সমান জরুরি

প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবদুল লতিফ মন্ডল

প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলেও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা তলানিতে। বিশ্বখাদ্য নিরাপত্তা সূচক ২০১৭ অনুযায়ী বিশ্বের ১০৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৯তম।

এর আগে ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৮১, ৮১, ৮৮ ও ৮৯তম। এর অর্থ দাঁড়ায়, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে আমরা ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে পড়ছি।

খাদ্য নিরাপত্তার সংজ্ঞানুযায়ী তখনই খাদ্য নিরাপত্তা বিরাজমান, যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টি মানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণে তিনটি নিয়ামক হল- এক. খাবারের প্রাপ্যতা (availability), দুই. ক্রয়ক্ষমতা (affordability) এবং তিন. খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা (quality & safety)।

খাবারের প্রাপ্যতা নির্ধারণে ওইসব ফ্যাক্টর মূল্যায়ন করা হয়, যেগুলো খাবারের সরবরাহ ও সহজ লভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এগুলো হল- খাবার সরবরাহে প্রাচুর্য, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয়, কৃষি অবকাঠামো, খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক স্থিরতায় ঝুঁকি, দুর্নীতি এবং খাদ্য অপচয়

। ক্রয়ক্ষমতা পরিমাপে যে ৬টি অনুসূচক ব্যবহার করা হয় সেগুলো হল- একটি খানার (যড়ঁংবযড়ষফ) সার্বিক ব্যয়ে খাবারের ব্যয়ের পরিমাণ, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত, মাথাপিছু জিডিপি, কৃষিপণ্য আমদানিতে ট্যারিফের হার, খাদ্য নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি এবং কৃষকদের আর্থিক সহায়তা লাভের সুযোগ।

খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নির্দেশকে বিশ্লেষণ করা হয় খাদ্যের বহুমুখীকরণ, পুষ্টিমান ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের উপস্থিতি, প্রোটিনের মান এবং নিরাপদ খাদ্য।

এটা ঠিক, বর্তমানে চালের দাম, বিশেষ করে মোটা চালের দাম অনেকটা ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাল আমাদানির ওপর দুই ধাপে ২৮ শতাংশ কর আরোপ করায় ওই বছর শুধু বেসরকারি খাতে মাত্র ১ লাখ ৩৩ হাজার টন চাল আমদানি হওয়ায় এবং সিলেটের হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যায় বোরোর উৎপাদন ১০ লাখ টন হ্রাস পাওয়ায় দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায় পৌঁছে।

চালের নজিরবিহীন দামের ফলে নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে এত উচ্চদামে প্রয়োজনীয় চাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে বিশ্বের দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যা কম-বেশি ৮০ কোটি। দরিদ্র জনসংখ্যার বসবাসের দিক দিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারত। অর্থাৎ বিশ্বের মোট দরিদ্র জনসংখ্যার কমবেশি ৩৫ শতাংশ ভারতে বাস করে। দরিদ্র জনসংখ্যার বসবাসের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

এ দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এদের মধ্যে অতি দরিদ্রের সংখ্যা কম-বেশি দেড় কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে।

তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ছিল ১ হাজার ৭৯১ টাকা।

খাদ্যের সহজ লভ্যতা অতি দরিদ্রদের খাদ্য ক্রয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। ক্রয়ক্ষমতার অভাবে এরা প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে পারছে না। এরা অসহায় ও দুস্থ। এদের একটি অংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল।

বৃহত্তর অংশটি ক্রয়ক্ষমতার অভাবে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। তারা অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। তারা খাদ্য নিরাপত্তার হুমকির সম্মুখীন।

বাজারে অনিরাপদ খাদ্যের প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন সরবরাহ বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অস্বস্তিকর অবস্থানের জন্য অনেকটা দায়ী। শাকসবজি থেকে শুরু করে খুব কম খাদ্যপণ্য আছে যা নিরাপদ।

চাল ও মুড়িতে ইউরিয়া, মাছ, দুধ, ফলমূলে নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক, শুঁটকিতে ডিডিটি, ভাজা খাবারে লুব্রিকেন্ট, বিস্কুট, আইসক্রিম ও নুডলসে টেক্সটাইল ও লেদার রং, গুঁড়া মসলায় ভুসি, ইটের গুঁড়া এসব সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাছাড়া, ভেজালের দৌরাত্ম্য রয়েছে মধু, মিষ্টি, দধি, আচার, ঘি, জুস, ডালডা, সেমাই, ভোজ্যতেল ও বেসনে। ‘স্বস্তিকর রমজানের চেকলিস্ট’ শিরোনামে ৬ মে যুগান্তরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইফতারের মেন্যুতে সবাই একটা না একটা ফল যেমন- কলা, আপেল, তরমুজ, আনারস, কমলা, পেঁপে রাখতে চায়।

এ ফলগুলো গাছ থেকে পেড়ে সুন্দর রং আনা, মিষ্টতা বাড়ানো, রক্ষা করা এবং সহজে যেন না পচে সে জন্য ফরমালিন মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হচ্ছে। তরমুজে সিরিঞ্জ দিয়ে কাপড়ে ব্যবহৃত লাল রং পুশ করা হচ্ছে।

আম, কাঁঠালসহ দেশি-বিদেশি এমন কোনো ফল পাওয়া যাবে না, যেটাতে প্রাণঘাতী পদার্থ মেশানো হচ্ছে না। ইদানীং সৌদি আরব থেকে আসা খেজুরেও ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে। প্যাকেটজাত ও খোলা অবস্থায় যেসব খেজুর বিক্রি হচ্ছে তার অধিকাংশ পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ।

মাছ, তরিতরকারি ও শাকসবজিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল দেয়া হচ্ছে। ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে স্বাদ বাড়ানোর জন্য বার্গার, স্যান্ডউইচ, চিকেন ফ্রাই, পিৎজাতে কাপড়ের রং, প্রিজারভেটিভ বিভিন্ন কেমিক্যাল এবং দই-মিষ্টিতে ক্ষতিকর পদার্থ ও দুধে টিস্যু পেপার মিশিয়ে ঘন করা হচ্ছে।

মুড়ি ধবধবে করতে ইউরিয়া দিয়ে ভাজা ও গুঁড়া হাইড্রোজ মিশিয়ে রং উজ্জ্বল করা হচ্ছে। মিনারেল ওয়াটারের নামে ট্যাপের পানি বোতলজাত করে ধুমসে বিক্রি হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য আইনসহ আরও অনেক আইন থাকলেও সেগুলোর তেমন প্রয়োগ নেই।

বিজ্ঞজনদের মতে, খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে যারা এর মূল হোতা তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশীল। এরা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের সদস্য। তাই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। কোনো আইন তাদের স্পর্শ করতে পারে না।

খাদ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের তলানিতে অবস্থানের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করেন পুষ্টি বিজ্ঞানীসহ সচেতন জনগণ। ২৩-২৯ মে সময়ে পালিত জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহে তারা এ মর্মে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।

তাই এবার জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল ‘খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন’। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) আর্থিক সহায়তায় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) যৌথ উদ্যোগে তৈরি ও প্রকাশিত বাংলাদেশ আন্ডারনিউট্রিশন ম্যাপ বা অপুষ্টি মানচিত্র ২০১৪-এর ফাইন্ডিংসের মধ্যে রয়েছে-

ক. গত দুই দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উন্নতি সাধন হলেও, দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে এলেও, প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রায় সক্ষম হলেও, জন্ম হার ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেলেও, শিক্ষার হার বেড়ে গেলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।

খ. দারিদ্র্য মানচিত্রে চট্টগ্রাম ও সিলেট সবচেয়ে সচ্ছল বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত হলেও অপুষ্টি মানচিত্রে ওই দুটি বিভাগে অপুষ্টিজনিত কারণে পাঁচ বছর বয়সের নিচে খর্বাকৃতি ও কম ওজনের শিশুর হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পাঁচ বছর বয়সের কম বয়সী খর্বাকৃতি শিশুর হার সিলেটে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৪ সালে প্রকাশিত দারিদ্র্য মানচিত্রে সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত রংপুর বিভাগে অপুষ্টির কারণে পাঁচ বছর বয়সের নিচে কম ওজনের শিশুর হার ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে পাঁচ বছর বয়সের নিচে খর্বাকৃতি শিশুর সর্বোচ্চ হার চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলায়, এ হার ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে একই বিভাগের কক্সবাজার জেলা। এখানে হার ৪৭ শতাংশ।

পাঁচ বছরের নিচে কম ওজনের শিশুর সর্বোচ্চ হার সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায়। এ হার ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। মানচিত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৯টি জেলায় খর্বাকৃতি শিশুর এবং ৫৫টি জেলায় কম ওজনের শিশুর হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি।

সার্বিকভাবে পুষ্টি স্বল্পতার জন্য একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এগুলো হল- ক. তাৎক্ষণিক কারণ, খ. খানা বা পরিবার পর্যায়ে অন্তর্নিহিত কারণ, গ. সামাজিক পর্যায়ে মৌলিক কারণ। অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ এবং ব্যাধি তাৎক্ষণিক কারণের অন্তর্ভুক্ত।

আর্থিক সামর্থ্যরে অভাবে প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহে অপারগতা, মা ও শিশুর পর্যাপ্ত যতেœর অভাব এবং দুর্বল পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা খানা বা পরিবার পর্যায়ে অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

সামাজিক পর্যায়ে মৌলিক কারণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে গুণগত মানসম্পন্ন মানব, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের পরিমাণ। শিশুকে মায়ের দুধ না খাওয়ানো, অসচেতনতা, দুর্গম এলাকা ও অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার কারণে আর্থিক দিক দিয়ে ভালো অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকারের যা করণীয় তা হল, যেসব অঞ্চল বা এলাকা সর্বাধিক বা তুলনামূলকভাবে অধিক পরিমাণে অপুষ্টিতে ভুগছে, সেসব অঞ্চল বা এলাকায় এরূপ পুষ্টির অভাবের কারণ নির্ণয়ে বিস্তারিত জরিপের ব্যবস্থা করা।

অতঃপর জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে ওই সব অঞ্চল বা এলাকায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ অন্যান্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুষ্টির অভাব হ্রাস করা। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব

[email protected]