আসুন থ্যালাসেমিয়ামুক্ত দেশ গড়ি

  ডা. মো হা ম্ম দ কা ম রু জ্জা মা ন ০৯ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

থ্যালাসেমিয়া

গতকাল ছিল বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। রক্তের ক্যান্সারও নয়।

থ্যালাসেমিয়ার অনেক প্রকারভেদ আছে, যেমন- বিটা থ্যালাসেমিয়া, ই বিটা থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিন ই ডিজিজ, আলফা থ্যালাসেমিয়া, এস বিটা থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিন এস ডিজিজ, হিমোগ্লোবিন ডি পাঞ্জাব, হিমোগ্লোবিন ডি আরব ইত্যাদি।

ক্লিনিক্যালি থ্যালাসেমিয়াকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে, যেমন- থ্যালাসেমিয়া মেজর, মাইনর ও ইন্টারমিডিয়েট।

বাবা ও মা দু’জনই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার রোগী হওয়ার ঝুঁকি থাকে। থ্যালাসেমিয়ার বাহক আর থ্যালাসেমিয়ার রোগী এক কথা নয়। থ্যালাসেমিয়ার বাহক স্বাভাবিক মানুষরূপে বেড়ে ওঠে।

তাই কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা, তা বাহ্যিকভাবে বোঝার কোনো উপায় নেই। আর থ্যালাসেমিয়ার রোগী জন্মের ছয় মাস বয়স থেকে ফ্যাকাসে হয়ে যায়, জন্ডিস দেখা দেয়। পেটের প্লীহা ও লিভার বড় হয়ে যায়। ঠিকমতো শরীরের বৃদ্ধি ঘটে না।

রক্তস্বল্পতার জন্য প্রতি মাসে এক থেকে দুই ব্যাগ রক্ত শরীরে নিতে হয়। ঘনঘন রক্ত নেয়ায় এবং পরিপাক নালী থেকে আয়রনের শোষণ ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় শরীরে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যায়।

ফলে লিভার, হৃৎপিণ্ডসহ অন্যান্য অঙ্গের নানা রকম মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত রক্ত না নিলে থ্যালাসেমিয়া রোগী মারা যায়।

প্রতিবার রক্ত নেয়া এবং আয়রন কমানোর ওষুধ ও অন্যান্য খরচসহ একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসায় প্রতি মাসে হাজার টাকার বেশি খরচ হয়।

নিয়মিত রক্ত দিয়ে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সঠিক চিকিৎসা করালে থ্যালাসেমিয়া রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হলেও এর সঠিক চিকিৎসা বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই সবার পক্ষে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় না।

থ্যালাসেমিয়ার বাহক আর থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবারের উপদেশ এক নয়। থ্যালাসেমিয়ার বাহকের খাবার স্বাভাবিক মানুষের মতো। আয়রনজাতীয় খাবারে নিষেধ নেই বরং আয়রনের ঘাটতি হলে বেশি করে আয়রনজাতীয় খাবার খেতে দিতে হয়।

আর থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য আয়রনজাতীয় খাবার নিষেধ এবং প্রয়োজনে শরীর থেকে আয়রন কমানোর ওষুধ দিতে হয়, যা ব্যয়বহুল। তবে কোনো কারণে আয়রনের ঘাটতি থাকলে অবশ্যই আয়রন দিতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়

লোহিত রক্ত কণিকার মধ্যে হিমোগ্লোবিন (হিম+গ্লোবিন) থাকে বিধায় রক্ত লাল দেখায়। স্বাভাবিক মানুষের লোহিত রক্ত কণিকার গড় আয়ু ১২০ দিন হলেও থ্যালাসেমিয়া রোগীর ত্রুটিপূর্ণ গ্লোবিনের কারণে লোহিত রক্ত কণিকার গড় আয়ু মাত্র ২০ থেকে ৬০ দিন। অপরিপক্ক অবস্থায় লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙে যায় বা মারা যায়, তাই রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

মানবদেহে ১৬ নং ক্রোমোজোমে থাকে আলফা জিন আর ১১ নং ক্রোমোজোমে থাকে বিটা জিন। আলফা ও বিটা জিনদ্বয় আলফা ও বিটা গ্লোবিন নামক প্রোটিন তৈরি করে, যা অনেকগুলো এমাইনো এসিডের সমষ্টি।

জন্মগতভাবে ১৬ অথবা ১১ নং ক্রোমোজোমের আলফা অথবা বিটা জিন সঠিকভাবে এমাইনো এসিড তৈরি করতে পারে না। ফলে আলফা অথবা বিটা গ্লোবিন নামক প্রোটিন ত্রুটিপূর্ণ হয়। আলফা অথবা বিটা গ্লোবিন চেইন ত্রুটিপূর্ণ থাকায় হিমোগ্লোবিন ত্রুটিপূর্ণ হয় বিধায় লোহিত রক্ত কণিকা দ্রুত ভেঙে যায় বা মারা যায় এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

বাংলাদেশে সমস্যা কোথায়

থ্যালাসেমিয়া স্ক্রেনিং প্রোগ্রাম না থাকায় অনেকেই জানে না তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। তাই অজান্তেই থ্যালাসেমিয়া বাহকদের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

বাবা-মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ২৫ ভাগ, বাহক হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৫০ ভাগ আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২৫ ভাগ। মা-বাবার যে কোনো একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের বাহক হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৫০ ভাগ, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ, তবে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হলে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

কিভাবে জানা যাবে আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা

হেমাটোলজি অটো এনালাইজার মেশিনে রক্তের সিবিসি পরীক্ষায় থ্যালাসেমিয়া বাহকের ধারণা পাওয়া যায়। এরপর হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ডিএনএ এনালাইসিস পরীক্ষা করা লাগে।

যেহেতু স্বামী-স্ত্রী দু’জনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সন্তান পেটে আসার আট থেকে চৌদ্দ সপ্তাহের মধ্যে ক্রওনিক ভিলাস স্যাম্পল বা এমনিওসেন্টেসিস করে সন্তানের অবস্থা জানা যায়।

পেটের সন্তান থ্যালাসেমিয়ার রোগী হলে কাউন্সেলিং করতে হবে, যাতে নতুন থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্ম না হয়। তবে থ্যালাসেমিয়া বাহক হলে সন্তানের স্বাভাবিক জন্মদানে অসুবিধা নেই। তাই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রত্যেককে জানতে হবে সে থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা।

একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহককে একজন নন থ্যালাসেমিয়া মানুষ (নারী/পুরুষ) নিশ্চিন্তে বিয়ে করতে পারবে; কারণ তাদের সন্তানের রোগী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহকের আরেকজন বাহক বা রোগীকে বিয়ে করা যাবে না। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাদের সন্তান রোগী হতে পারে।

দু’জন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে নিরুৎসাহিত করতে হবে, যাতে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়। দু’জন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গেলেই থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আসুন, বাধ্যতামূলক থ্যালাসেমিয়া স্ক্রেনিং চালু করি, বাহকদের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করি। পোলিওর মতো থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।

ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : সহকারী অধ্যাপক (হেমাটোলজি), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×