নরেন্দ্র মোদির যত অদ্ভুত দাবি

  পি চি দ ম্ব র ম ০৯ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোদি

আমার সামনে ১ মে তারিখের দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি কপি রয়েছে এবং আমি চলতি নির্বাচন সংক্রান্ত নানা ধরনের খবর পড়ছি।

নজরকাড়া শিরোনামের একটি ‘স্টোরি’ পড়লাম : ‘লোকসভায় বিরোধী দলনেতা নেই, সেই দল প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার স্বপ্ন দেখে : মোদি’। নরেন্দ্র মোদি লক্ষেèৗ ও মজফ্ফরপুরে যে ভাষণ দিয়েছেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিস্তারিত বিবরণ ওই রিপোর্টে রয়েছে।

উত্তরপ্রদেশ হল ভারতের বৃহত্তম রাজ্য, সব রাজনৈতিক দলের জন্য প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। ২০১৯ সালে বিজেপির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০১৪ সালের ভোটে তারা এ রাজ্য থেকে যে ৭১টি (৮০টির মধ্যে) আসন জিতেছিল সেগুলো ধরে রাখার লড়াইয়ে তারা নেমেছে।

লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনে মূল শক্তি জুগিয়েছিল এই ৭১টি আসন। বিজেপি এ আসনগুলোর অর্ধেকও যদি খুইয়ে বসে, তাহলে তারা একক ক্ষমতায় সরকার গঠনে অপারগ হবে। এ কারণেই, অবাক হচ্ছি না যে, মোদিজি তার প্রচারের বেশিরভাগ সময়টা উত্তরপ্রদেশেই ব্যয় করছেন।

এর মধ্যে ভুল কিছু দেখছি না, সমস্যা প্রতিটি নতুন ভাষণ, যেগুলোতে মোদিজি আরও অদ্ভুত দাবি করে বসছেন এবং সহজ বিশ্বাস বাড়াচ্ছেন। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোনো সাধারণ ভোটারদের বুদ্ধিসুদ্ধি চ্যালেঞ্জ করে বসছেন। একজন ব্যক্তি সততার সঙ্গে যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করেন, তিনি তার সীমা পরীক্ষা করে দেখছেন।

মোদিজির দাবিগুলোর দিকে তাকানো যাক :

কোনো বোমা বিস্ফোরণ ঘটেনি? : সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস এবং অন্য সব দলের লড়াই করার অক্ষমতার অভিযোগ এনে মোদিজি বলেন, ‘মন্দির, বাজার, রেল অথবা বাস স্টেশনে বিস্ফোরণের কথা আর কানে আসে আপনাদের? এসব জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা থেমেছে কিনা? মোদির ভয়েই এসব বন্ধ হয়ে গেছে।’

তার আগে তিনি বারবার দাবি করে বসেন যে তার পাঁচ বছরের জমানায় ‘কোনো’ বোমা বিস্ফোরণের বিপদ ঘটেনি!

দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবটা একেবারে অন্যরকম। গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে (মোদিজি মিথ্যা দাবি যেদিন করেছিলেন, নির্দিষ্ট সেই দিনেরও একটি ঘটনা এর মধ্যে রয়েছে)।

ইতিহাসের শিক্ষা প্রয়োজন : মোদিজির আরেকটি প্রিয় বিষয় হল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ ঘটানোর সাহস দেখিয়েছেন এবং আগের কোনো সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে ঢুকে লড়াই করার অনুমতি দেয়নি।

১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনা কী করেছিল, মোদিজি যদি সেসব না শুনে (বা পড়ে) থাকেন, তবে আমি অবাকই হব! পাকিস্তানের টেরিটরিতে প্রবেশ না করেই কি ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনী ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল? পাশাপাশি, মোদিজির এই ভুল বক্তব্যের প্রতি আর্মি জেনারেলদেরও দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে এবং তারা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘এটাই প্রথম ঘটনা নয় এবং এখানেই থেমে থাকার বিষয়ও নয় এটা।’

নরেন্দ্র মোদি একটি রাজনৈতিক দলের নিছক একজন নেতা ও প্রচারক নন। তিনি হলেন ভারত রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। মানুষ অবাক হয়ে যাচ্ছে এটা দেখে যে, কেন দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি অসত্য বারবার আউড়ে যাচ্ছেন।

এটা স্মৃতিলোপ পাওয়ার ব্যাপার মোটেই নয়, কারণ মোদিজিকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে বোমা বিস্ফোরণ এবং সার্জিকাল স্ট্রাইকের বিষয়ে তার দাবিগুলো প্রমাণিতভাবেই ভুল।

এটা কখনও চতুর নির্বাচনী কৌশল হতেই পারে না, কারণ একটি অসত্যকে বারবার আউড়ে গেলে মানুষ তো রেগে কাঁই হবে। আমি মনে করি, এই রহস্যের জবাবটা মোদিজির ব্যক্তিত্বের গভীরে নিহিত।

দরকারি বিষয়গুলো সম্পর্কে নীরব : সম্প্রতি মোদিজি দাবি করে বসেন যে, তিনি তার করুণ অতীত (চা-ওয়ালা) এবং জাতিগত বর্ণের (ওবিসি) বিষয়টি কখনও উত্থাপন করেননি। এটা শুনে তো আমি থ, এবং বিস্তারিত ঘাঁটাঘাঁটি করলাম।

বিভিন্ন দিনে মোদিজির কিছু উক্তি খুঁজে পেলাম। নিজেকে ‘চা-ওয়ালা’ বলে দাবি করছেন এরকম সবচেয়ে পুরনো যে উক্তিটি নজরে এলো, সেটি মোদিজি করেছিলেন ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। এবং ওই একই উক্তি তিনি করেছেন তারপর আরও অনেক দিন।

একইভাবে, তার অনগ্রসর জাতি পরিচয় নিয়েও মোদিজি বহুবার বিবৃতি দিয়েছেন : সাম্প্রতিক দুটি দৃষ্টান্ত পেলাম- সে দুটি ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ এবং ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিলের। তার এ বিষয়ক উক্তি এখানে হুবহু উদ্ধৃত করাটা আমার পক্ষে সত্যিই অস্বস্তিকর, কারণ তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ওই পদটিকে আমি মর্যাদা দিই।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের সত্যাসত্য মানুষ যেভাবে যাচাই করে নিত, মোদিজির খুশি হওয়া উচিত যে, তার বক্তব্য যাচাই করে নেয়ার কেউই নেই।

দুঃখের বিষয় এই যে, যার ওপরে প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন এরকম অনেক দরকারি বিষয় রয়েছে এবং সেসব নিয়ে তার কথা মানুষ শুনতেও চায়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে মোদিজি তার দলীয় ইশতেহার নিয়ে টুঁ শব্দটি করবেন না; বেকার সমস্যা এবং চাকরি নিয়ে তিনি কিছু বলবেন না; কৃষকদের দুর্দশা এবং ঋণ নিয়ে তিনি কিছু বলবেন না; কৃষিপণ্যের দামের ক্রমহ্রাস অথবা শস্যবীমা কর্মসূচির চূড়ান্ত ব্যর্থতা নিয়ে তিনি কিছু বলবেন না; মহিলা, দলিত, তফসিলি জনজাতি (এসটি), শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগণ, সাংবাদিক, এনজিও ইত্যাদির উদ্বেগ-আশঙ্কা নিয়েও তিনি কিছু বলবেন না।

নরেন্দ্র মোদি এমন ভান করেন যে, তিনি যে ‘আচ্ছে দিন’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা সত্যি সত্যিই চলে এসেছে! এর থেকে ডাহা মিথ্যা কিছু হতে পারে না। মানুষ মিথ্যা শুনে শুনে ক্লান্ত ও রুষ্ট এবং তাদের মনে এখন কেবল সামান্য সত্যের আকুল আকাক্সক্ষা।

দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনূদিত

পি চিদম্বরম : ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×