বি ম ল স র কা র

শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্যের প্রাধান্য

  বিমল সরকার ১০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্যের প্রাধান্য

স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি-বেসরকারি। আকার-আয়তন, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গর্বের দিক দিয়ে ছোট অথবা বড়।

হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক’টিকে আলাদা রাখা যাবে? বলতে গেলে সর্বত্রই এক অবস্থা। প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, ভিসি, প্রক্টর-রেক্টর, ডিন, কন্ট্রোলার-রেজিস্ট্রার-ট্রেজারার, সভাপতি (রাজনীতিক ও আমলা)- ব্যতিক্রম ক’জনকে পাওয়া যাবে?

বাণিজ্য আর বাণিজ্য। নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, ফরম পূরণ বাণিজ্য, জরিমানা বাণিজ্য, কোচিং-ক্লাস বাণিজ্য, পরীক্ষা বাণিজ্য, ক্লাস বণ্টন বাণিজ্য, কেনাকাটা বাণিজ্য, বিল-ভাউচার বাণিজ্য, পরীক্ষক নিয়োগ ও খাতা বণ্টন বাণিজ্য, ব্যবহারিক পরীক্ষা বাণিজ্য, টুর বাণিজ্য, ভর্তি পরীক্ষার সম্মানী-বণ্টন বাণিজ্য, বই পাঠ্যকরণ বাণিজ্য- বাণিজ্যের কি আর শেষ আছে?

তথাকথিত বন্দোবস্ত, নয়ছয়, লুটপাট, ভাগাভাগি, কানাকানি, লুকোচুরি, গোপন দেনদরবার, ক্ষোভ, হতাশা-নিরাশা, হুমকি-ধমকি, আরও কত কী।

আবারও বলি- স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়- বলতে গেলে সর্বত্র এক অবস্থা। টাকা, টাকা আর টাকা। এ যেন কেবল টাকারই খেলা!

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতায়, প্রধান শিক্ষকতায়, অধ্যক্ষতায়, এমনকি শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারণ কাজেও আমার সমসাময়িক বা জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ অনেকে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে চাকরি থেকে অবসরও গ্রহণ করেছেন। অনেকের সঙ্গেই ব্যক্তিগতভাবে আমার যোগাযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে সময় সময় অনেক কিছুই জানার সুযোগ হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়- মোটামুটি সব পর্যায়েই।

ব্যাঙের ছাতার মতো হঠাৎ যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়। কয়েক মাস আগের কথা (২০১৮)। সরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ বিভাগে চেয়ারম্যান রদবদল হয়েছে যথারীতি; তিন বছর পরপর সাধারণত যা হয়ে থাকে।

দায়িত্বভার গ্রহণের পর ঐতিহ্য অনুযায়ী নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মহোদয় অডিট করিয়ে নিতে চাইলে সাবেক চেয়ারম্যান মহোদয় ও তার অনুসারী কতিপয় সহকর্মী এতে অনীহা প্রকাশ করতে থাকেন।

অসহযোগিতা ও বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েও নতুন চেয়ারম্যান শেষপর্যন্ত অডিট কাজটি সম্পন্ন করে নেন। অডিট করার সময় এমন একটি বিষয় প্রকাশ্যে চলে আসে, যা শুনে সবার পিলে চমকে যাওয়ার অবস্থা! রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

ওই বিভাগের একটি শ্রেণীকক্ষে লাগানো একমাত্র হোয়াইট-বোর্ডের দাম ধরা আছে সাড়ে ২৯ হাজার টাকা! একই শহরের দোকান থেকে ২৫ হাজার টাকায় বোর্ডটি কিনে আরও সাড়ে ৪ হাজার টাকা ভাড়ার ঠেলাগাড়ি দিয়ে তা বিভাগ পর্যন্ত আনা হয়।

এ সাড়ে ২৯ হাজার টাকার বিল-ভাউচার দেখতে পেয়ে সংশ্লিষ্টরা তো হতবাক। এ কী করে সম্ভব! ভাবনা-দুর্ভাবনা ও কানাঘুষার একপর্যায়ে যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়- দ্রব্যটির দাম আসলে ২৫ হাজার টাকা নয়, বড়জোর ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়েই এমন বা এর চেয়েও ভালো একটি বোর্ড বাজার থেকে কেনা যায়।

আর পরিবহন খরচ? সাড়ে ৪ হাজার টাকা! সাধারণের আন্দাজ বা কল্পনার বাইরে। ওই শহর থেকে যে কোনো ধরনের পরিবহন দিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের যে কোনো প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হলেও কোনো অবস্থাতেই এত টাকা খরচ দেখানো সুস্থ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

কয়েক বছর আগে ‘চা-নাস্তার বিল ৩০ হাজার টাকা’ শিরোনামে পত্রিকায় একটি খবর ছাপা হয়। খবরটিতে বলা হয়, প্রথমবর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তির মৌসুম। পুরনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ১৪ শিক্ষক ভর্তি-পরীক্ষার খাতা দেখার সময় এক সপ্তাহে ৩০ হাজার টাকারও বেশি চা-নাস্তার বিল করেছেন।’

দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার নামে অভিভাবকদের হরহামেশা ‘পকেট কাটার’ কাহিনীর কথা এখানে না হয় বাদই দেয়া গেল।

ভর্তি পরীক্ষার সময় একেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরম বিক্রি থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা টাকার ভাগ-বিতরণ ও বন্দোবস্ত নিয়ে কী হয়, তা এখন আর বোধকরি কারও অজানা নয়।

এ নিয়ে কত কাহিনী, কত দেনদরবার। অবাঞ্ছিত-অনভিপ্রেত সব ঘটনা। মানুষের লোভ-লালসা যে কী পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছতে পারে তা অনুমান করা আসলেই কঠিন।

কয়েক বছর আগের কথা। এটিও পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমবর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি ফরমের দাম বাড়ানো হল। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা দেয় ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

সাংবাদিকরা এ বিষয়ে ভিসি মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি যা বলেছিলেন তা একটি জাতীয় দৈনিকে ঠিক এভাবে ছাপা হয়- ‘শিক্ষকরা সামান্য বেতন পান।

তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন এ সময়টার জন্য। ভর্তি পরীক্ষার সময় প্রাপ্ত বাড়তি অর্থ দিয়ে অনেক শিক্ষক রেফ্রিজারেটর কেনা, পছন্দের জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, এমনকি পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করার স্বপ্নও দেখেন।’

যে যেখানে যেভাবে পারেন বা পারছেন, চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ। কোথাও প্রতিষ্ঠান, বিভাগ বা দফতর-প্রধান; কোথাও বা সভাপতি অথবা কমিটি। এ নিয়ে চমৎকার সব ‘বন্দোবস্ত’ ও সৃষ্ট বিপত্তির কথা প্রায়ই প্রচার মাধ্যমে শিরোনাম হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়।

এ সবকিছুকে বিচ্ছিন্ন বিষয় বা ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়ার জো নেই। সাদা পোশাকে পড়া দাগটি ভাসে বেশি। এতে সবারই সহজে নজর পড়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধর্মীয় উপাসনালয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সময় সময় যেসব অবাঞ্ছিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা সংঘটিত হয় ও হচ্ছে, তা খুবই দুঃখজনক।

সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন যে কারও জন্যই দুর্দশা, বিড়ম্বনা ও দুর্ভাবনার কারণ। এ সবকিছু থেকে পরিত্রাণের জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে কারোরই উদাসীন বা নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই।

বিমল সরকার : কলেজশিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×