মমতাকে ঠেকাতে বামের ভোট রামের বাক্সে?

  মে রু নী ল দা শ গু প্ত ১০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মমতাকে ঠেকাতে বামের ভোট রামের বাক্সে?

ভোট মহাযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা চূড়ান্ত হবে ২৩ মে।

আগামী পাঁচ বছরের জন্য কার হাতে যাবে দেশের শাসনভার, সংসদ মহাসভার নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার জিম্মায়, কার কপালে আকাশ ভেঙে পড়বে আর কার মুখ আলোয় ভরে দেবে সাফল্যের জাদু- সবকিছুই অপেক্ষা করে আছে সাত দফার চলতি মহারণ শেষের সেই প্রথম বৃহস্পতিবারের জন্য!

বৃহস্পতিবার ২৩ মে। কিন্তু, সে তো এখনও পাক্কা দু’সপ্তাহ মানে ১৪ দিন দূর! কিন্তু তার আগে এই মাঝের সময়টায় কী হতে পারে, তা নিয়ে কল্পনা-জল্পনার ডানা মেলে দিতে অসুবিধে কী!

এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে আর পাঁচটা ক্ষেত্রের মতো দেশের বাকি রাজ্যগুলোর চেয়ে এগিয়ে বাংলা সন্দেহ নেই। হবে নাই বা কেন? আজও পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে অন্যতম রাজনীতিসচেতন রাজ্য বলে, দেশ রাজনীতির অন্যতম পীঠস্থান বলে স্বীকৃত।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংখ্যার হিসাবে এ রাজ্যেই সর্বাধিক নির্বাচনী সভা করছেন- ১৯টি, গড়ে প্রতি দফায় আড়াইটিরও বেশি!

ফলে সবাই বুঝেছেন- এবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জন্য জাতীয় রাজনীতিতে যেমন, তেমনি মোদিজির এই অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপের জন্য দেশের ভোটযুদ্ধের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান বিশেষ মাত্রা পাচ্ছে। তার ওপর মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে বাঙালি হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে দেখার স্বপ্ন তো আছেই।

সব মিলিয়ে এবার দেশের ভোটের পাশাপাশি বাংলার ভোটও তাই জনতার আগ্রহ-কৌতূহলের কেন্দ্রে। আর সেই সূত্রেই ২৩-এর অপেক্ষায় না থেকে বাংলার জনমন জল্পনা-কল্পনার জমজমাট উৎসবে পুরোপুরি মজে গেছে। কী হতে পারে তার একটা পাকাপোক্ত হিসাব এখন আমবাঙালির মুখে মুখে। এবং সাত দফার মহাযুক্ত যত অন্তিম পর্বের দিকে এগোচ্ছে তত যেন রাজনৈতিক মহলের বড়-মেজ-ছোট কর্তা থেকে কর্মচারী মহাজনদের মধ্যেও এই কল্পনার উৎসবে শামিল হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

জনগণের অনেকেই মনে করছেন- সিপিএমের সমর্থক কর্মীদের একটা বড় অংশ এবার বিজেপির দিকে ভোট করবে। কারণ, তারা নাকি ভাবছেন সামনে মমতা থাকলে পার্টির পক্ষে অদূর ভবিষ্যতে ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ মুশকিল। মমতার নজিরবিহীন ভাবমূর্তি, উন্নয়ন এবং সর্বোপরি তার অবিসংবাদী প্রভাব অতিক্রম করে বামদের পক্ষে রাজ্যের ক্ষমতা দখল কখনোই সহজ হবে না।

মমতা প্রতিপক্ষ হলেই নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, নেতাই, কেশপুর, জঙ্গলমহল সব উঠে আসে, আসবে। উঠে আসবে ২১ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত কলকাতা, পার্টির ডাণ্ডায় মাথা ফেটে মরণাপন্ন মমতার ছবি!

পাশাপাশি আজকের বিশ্ববাংলা পশ্চিমবঙ্গ ও তার সর্বাত্মক উন্নয়নের দৃষ্টান্তগুলোও মমতা ব্যানার্জির জয়ধ্বজা হয়ে রাজ্যবাসীর সামনে এসে দাঁড়াবে, দাঁড়াচ্ছে।

রাজ্যের বাম শিবিরে এসব কঠিন বাধা অতিক্রম করার মতো জোরালো নেতৃত্ব থাকলেও তাদের অধিকাংশই আজ বয়সের ভারে অনেকটাই স্তিমিত।

বিমান বসু সূর্যকান্ত মিশ্রের মতো প্রবীণ নেতাকে তাই উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম শারীরিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ছুটে বেড়াতে হয়।

কিন্তু নন্দিনী মুখোপাধ্যায়, কনীনিকা ঘোষ, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা শতরূপের মতো সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে তাদের জায়গা নেয়ার মতো যোগ্য উত্তরসূরির দেখা নেই আজও।

কবে দেখা মিলবে তাও অজানা। এ পরিস্থিতিতে ‘দক্ষিণপন্থী’ গেরুয়া শিবিরকে যদি ভবিষ্যতে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে খাড়া করা যায়, তবে একটা ভালো সুযোগ থাকবে।

দক্ষিণ-বামে লড়াই হলে মাইনাস পয়েন্টের বিচারটা হয়তো জনতার আদালতে পাল্টে যাবে। কারণ, বাংলা সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে অনেক সহিষ্ণু ও ধর্মীয় সংহতিতে অনেক বেশি উৎসাহী।

সে ক্ষেত্রে পদ্মশিবিরের চেয়ে তখন তাদের কাছে বামরা মূল্য পাবে বেশি। তার ওপর ইউপি, ত্রিপুরার মতো বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর পরিস্থিতি তুলে ধরে জনতার সহানুভূতি আদায়েও বাড়তি সুবিধা মিলতে পারে।

সেদিক বিচারেই নাকি এবার বামের ভোটে রামের ঝুলি ভরবে! এটা জনতার জল্পনা। একটু কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। অর্জুন সিং, লকেট চ্যাটার্জিদের মতো অনেকের ভাগ্যই নাকি এই জল্পনায় জড়িত!

এই জল্পনায় শামিল হয়ে শেষ লোকসভা ভোটের প্রায় ৩০ শতাংশ বাম ভোটের (২০১৬ বিধানসভায় যা নেমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি) একটা অংশ যদি পদ্মদলের বাক্সে পড়ে, তবে বেশকিছু আসনে যে তৃণমূল চাপে পড়বে তাতে সন্দেহ কী? আরেকটি অভিমতও ঘুরছে- যাদের জেতার সম্ভাবনা কম তাদের দিয়ে ভোট ‘নষ্ট’ করতেও এবার নাকি অনীহা অনেকের। নোটার চেয়ে এবার জয়ের সম্ভাবনাযুক্ত পক্ষে-প্রতিপক্ষেই আগ্রহ বেশি জনগণের!

এই মানসিকতার হদিসও মিলছে। লোকে বলছেন এমন কথা। এতে লাভের ভাঁড়ার সেই তৃণমূল-বিজেপিতেই ভাগাভাগি হচ্ছে। জনতার মতে এ রাজ্যে লড়াইটা ওই দুই দলেই। বাকিরা সামান্য দু-একটি আসন ছাড়া ভোট মহাযুদ্ধের ময়দানে বাজনদার মাত্র।

সারা দেশে আসন সংখ্যার নিরিখে বিজেপি কতটা শক্তি হারাবে তা সময় বলবে, তবে এ রাজ্যে তৃণমূলবিরোধীদের মধ্যে ‘জয়ের সম্ভাবনাযুক্ত’ প্রার্থী তালিকায় তাদের অগ্রাধিকার যে সর্বাধিক মান্যতা পাবে, তা রাজনৈতিক মহলের অনেকেই বলছেন।

এ ক্ষেত্রেও বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো এক-আধজন ব্যতিক্রম হতে পারেন- এই যা। সব মিলিয়ে রাজ্যের আমজনতার এই জল্পনা-কল্পনা বুঝিয়ে দিচ্ছে- এবার ২৩ মে বিজেপির পক্ষে ভালো দিন হতে যাচ্ছে। কেউ কেউ তো এক ধাপ চড়িয়ে ২০০৯ সালের ভোটফল টেনে আনছেন।

বোঝাই যাচ্ছে, এতক্ষণ যাদের মন্তব্য হিসাব-নিকাশ নিয়ে কথা হল, তারা সবাই মন-মানসিকতায় মমতাবিরোধী শিবিরের প্রতিনিধি। তাতে যে বর্তমান শাসক দলের কেউ নেই- এমন অবশ্য হলফ করে বলা যায় না। ধান্দাবাজ সবসময় ছিল আজও আছে, তৃণমূলেও আছে। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় এরা ‘গদ্দার’।

তথ্যাভিজ্ঞদের মতে, এই ‘গদ্দার’দের ভূমিকাও এবারের ভোটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। কিন্তু এসব জল্পনায় শেষ পর্যন্ত বাংলার ভোটদেবতা কতটা বিচলিত হবেন, তার প্রসন্নতা কার প্রতি অধিক বর্ষিত হবে- সত্যি বলতে কী কেউ জানে না।

তবে বিজেপি যে দেশের অন্যত্র শক্তিক্ষয়ের ক্ষত পশ্চিমবঙ্গ সমেত পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো থেকে ভরিয়ে নিতে চাইছে সেটা পরিষ্কার। সে জন্যই এবার মোদিজি-অমিতজির এত সভা বাংলায়, পদ্মদলের পাখির চোখ হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ। তবে মজাটা হল এই যে, দেশে বিজেপির সামগ্রিক শক্তি হারানোর অনেক অঙ্ক পাওয়া যাচ্ছে বটে; কিন্তু বাংলার ভোটে শক্তিবৃদ্ধির তেমন নিশ্চিত অঙ্ক এখনও মিলছে না। মোদিজি অমিত শাহ থেকে আম পাবলিক- সবার সব হিসাব-নিকাশ ৮/১০ থেকে ২২/২৩ যেন সেই একজনের সামনে এসে কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে ফেলছে খেই!

বলা বাহুল্য, তিনি মমতা! তার সামনে তাই যেন যাবতীয় জল্পনা-কল্পনার স্রোত-প্রতিস্রোত উহ্য করে ৪২-এ ৪২-ও অসম্ভবের সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। লোকেই বলছে, হতেই পারে। নামে ৪২ ক্যান্ডিডেট, কিন্তু প্রার্থী তো একজনই- মমতা ব্যানার্জি। সুতরাং, হতেই পারে। দেখুন কল্পনার বাহাদুরি না বাস্তবের রসায়ন- বাংলার ভোট-রাজনীতির মহারণাঙ্গনে ২৩ মে শেষে বিজয় শঙ্খ কে বাজায়। দেখা যাক।

বিদেশি পত্রিকা থেকে সংক্ষেপিত

মেরুনীল দাশগুপ্ত : ভারতীয় রাজনীতি বিশ্লেষক

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×