চোখ আটকানো দুটি শিরোনাম

  এ কে এম শামসুদ্দিন ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণ খেলাপি

৬ মে ঢাকার দুটো জাতীয় দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম দেখে চোখ আটকে গেল। শিরোনাম দুটোর প্রথমটি হল, ‘চোরকে চোর বলতে হবে, মন্তব্য হাইকোর্টের,’ এবং অপরটি ‘যৌক্তিক ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা।’

হাইকোর্টে একটি দুর্নীতিসংক্রান্ত শুনানির ঘটনা এবং সরকার কর্তৃক সাম্প্রতিক সময়ের বহুল আলোচিত ঋণখেলাপিদের মাত্রাতিরিক্ত ছাড় দেয়া নিয়ে এ খবর দুটো ছাপা হয়েছে। সংবাদ দুটো পড়ার পর কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টাও করলাম।

প্রথমেই আলোচনা করা যাক হাইকোর্টের মন্তব্যটি নিয়ে। হাইকোর্টের মন্তব্যটি পড়ে প্রথমেই মনে হয়েছে বাঙালিদের বহুল পরিচিত শব্দ ‘চোর’-এর সংজ্ঞা পরিবর্তনের কোনো ঘটনা ঘটল কিনা! মনে হওয়ার কারণও আছে। ইদানীং দেশের সুবিধাভোগীগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় সরকারের নেয়া সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ মানুষের মনে এ ধরনের খটকার সৃষ্টি করেছে। অতি সম্প্রতি ঋণখেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন এর অন্যতম উদাহরণ।

এ কারণেই হাইকোর্টের মন্তব্য শুনে মনে হয়েছে সরকার আবার চোরের সংজ্ঞা পরিবর্তনেরও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করল কিনা। তা না হলে হাইকোর্টই বা এত জোর দিয়ে কেন বলবেন, ‘ চোরকে চোর বলতে হবে।’

৫ মে ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে নেয়া পদক্ষেপের অগ্রগতিবিষয়ক মামলার শুনানিতে বিচারপতি এফ আর নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছেন, ‘চোরকে চোর ও দুর্নীতিবাজকে দুর্নীতিবাজ বলতে হবে। তা না হলে দেশকে রক্ষা করা যাবে না।’ বায়ুদূষণ রোধের অগ্রগতিবিষয়ক মামলার শুনানিতে হাইকোর্ট এই মন্তব্যটি করলেও আমি মনে করি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা সর্বক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধ।

দুর্নীতির যে ভয়াবহ চিত্র আমরা নিত্যনৈমিত্তিক সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পাই, তাতে মানুষের মনে সংশয় জাগা স্বাভাবিক। দুর্নীতির বড় বড় ঘটনা যেভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে এবং এসব দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের যেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে তা দেখে মানুষ দিন দিন হতাশ হয়ে পড়ছে। ঋণখেলাপিদের ঋণ মওকুফ করে দেয়ার উদ্যোগও এই ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন।

‘যৌক্তিক ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা’ সংবাদটি পড়েও কিছুটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। বিভ্রান্তিটি হল ঋণখেলাপি তো ঋণখেলাপিই, এখানে ‘যৌক্তিক’ আর ‘অযৌক্তিকের’ কী আছে? বরং জনগণের আমানতের অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়ে তা সুধে-আসলে ফেরত দেয়াটাই তো অধিকতর যৌক্তিক বলে মনে হয়।

অর্থনীতির অধ্যাপক আমার এক বন্ধুকে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি অর্থনীতির কোনো সংজ্ঞায় বা পরিভাষায় ‘যৌক্তিক ঋণখেলাপি’ বলে কিছু নেই জানালেন। তবে পরিবেশ এবং পরিস্থিতির কারণে যারা ঋণখেলাপি হয়েছেন তাদের ব্যাপারে সরকার নতুনভাবে প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সরকার এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও একবার সুযোগ দিতে চায় যাতে এরা পুনরায় নতুন উদ্যোগে উৎপাদনে যেতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদেরই সরকার ‘যৌক্তিক ঋণখেলাপি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এর পক্ষে সরকার একটি যুক্তিও উপস্থাপন করেছে।

সরকার বলছে, দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উন্নতি হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক শিল্প-কারখানা পথে বসেছে। ফলস্বরূপ এসব শিল্প-প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি বলে ঋণখেলাপি হয়ে গেছে। এ জন্য সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এ দায় উদ্যোক্তাদের বহন করতে হচ্ছে।

অপরদিকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়ে একটি মহল ব্যাংকগুলোর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নানারকম সুবিধা ভোগ করে চলেছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘যৌক্তিক’ এবং ‘অযৌক্তিক’ ঋণখেলাপি’দের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ ব্যাংক খাতের পঙ্কিলতা সাফ করার প্রচেষ্টা মাত্র।

তবে ঋণখেলাপিদের ছাড় দেয়ার ব্যাপারে ইতিপূর্বে যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্ন জাগে, সরকারের এ উদ্যোগ কতটুকু সফলতার মুখ দেখবে? কারণ যুগ যুগ ধরে এসব ঋণখেলাপি সব সরকারের সঙ্গেই বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন।

এরশাদ আমলে যারা খেলাপি ঋণের শীর্ষে ছিলেন বর্তমান সরকারের আমলেও তারাই শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, এদের অনেকেই সরকারের অংশ হিসেবে ক্ষমতার অংশীদারিত্বও ভোগ করছেন। এ কারণেই মানুষের মনে সংশয়, সরকার যতই বলুক ‘যৌক্তিক ঋণখেলাপিদের’ প্রণোদনা দেয়া হবে, কিন্তু এর আড়ালে ওসব দাগি ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ নতুন উদ্যোগ নয় তো?

সরকারের এই ঘোষণায় খেলাপি ঋণ হিসাবায়নের তিনটি পর্যায়ে সময় বাড়ানো হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধে ঋণগ্রহীতারা আগের চেয়ে প্রায় ৬ মাস বাড়তি সময় পাচ্ছে। তারপরও মোট ঋণের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে একজন ঋণখেলাপি নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যেতে পারবেন। বাকি ঋণের সুদহারে ১০, ১২ বা ১৪ শতাংশ যাই থাকুক না কেন, তিনি ৯ শতাংশ সরল সুদ ধরে পরবর্তী ১২ বছরে সে ঋণ শোধ করতে পারবেন।

এর মধ্যে কতবার যে রিসিডিউল হবে তার উল্লেখ নেই। এ সুযোগ শুধু বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের জন্য প্রযোজ্য হবে, সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীদের জন্য নয়। পরিহাসের বিষয় হল, সাধারণ মানুষ কিংবা ব্যবসায়ীরা রিসিডিউল করতে গেলে তাদের ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হয় এবং এ ক্ষেত্রে তাদের একেকজনকে সুদ দিতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ করে।

এসব শীর্ষ ঋণখেলাপি দিনের পরদিন সাধারণ আমানতকারীর অর্থ দ্বারা বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে নিজেদের উদরপূর্তি করছে, এর কি কোনো প্রতিকার নেই? প্রতিকার নিশ্চয়ই আছে। এ বিষয়ে প্রচুর আলোচনা-পর্যালোচনা, বিভিন্ন গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামত বিভিন্ন মিডিয়ায় আমরা দেখেছি। কিন্তু এসব বিষয় বা পরামর্শ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খুব বেশি আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না।

এ প্রসঙ্গে গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্র না থাকলে রাজনৈতিক গণতন্ত্রও থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের কিছু মানুষ অর্থ ও বৈভবে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, তারা এ দেশে উন্নত বিশ্বের মানের জীবনযাপন করছেন। আর লাখ লাখ মানুষ বাস করছেন তৃতীয় বিশ্বের মানের। অতএব অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বাড়বে, রাজনৈতিক বৈষম্য ততই বাড়বে।

আমাদের দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যের অন্যতম কারণ হল, একশ্রেণীর সুবিধাভোগী মানুষ দেশের জনগণের অর্থ মেরে দিয়ে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে এই শ্রেণীর মানুষগুলো প্রশাসন ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে কব্জা করে নিয়েছে যে, এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের বিকল্প পথগুলোও বন্ধ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছে।

গত দশ বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল খাত হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এই সব প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এর জন্য দায়ী।’ বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাংক খাতের নৈরাজ্য আজ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, যার কারণে দেশের সাধারণ আমানতকারীর লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট হয়ে গেছে। এই লুটপাটে ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা জড়িত তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সুশাসন ও শৃঙ্খলার চরম অবনতির কারণে ব্যাংকগুলো আজ দেশের অর্থনীতির বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদনকৃত ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো নিয়ন্ত্রণ যে নেই তা বলাই বাহুল্য। এসব ব্যাংকের মালিক এবং পরিচালকরা সরকারের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে যে যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

সিঙ্গেল ডিজিটে শিল্পঋণ দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধও তারা উপেক্ষা করে চলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেয়ার দাবি করলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ গত ১০ মাসব্যাপী কার্যকর করা থেকে বিরত রয়েছে। প্রশ্ন হল, এসব ব্যাংক মালিক প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করার মতো সাহস পায় কী করে?

ব্যাংক খাতের এই নৈরাজ্য ও দৌরাত্ম্যের জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব এবং খবরদারি দায়ী বলে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ চিহ্নিত করেছেন। ব্যাংক খাতের নীতিমালা ও আইন-কানুন, আন্তর্জাতিক নীতিমালা ইত্যাদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নিম্নপর্যায়ে সুশাসনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগকৃত পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কাজে হস্তক্ষেপ করে। নীতিগত সিদ্ধান্ত দেয়ার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও তারা উৎসাহ দেখিয়ে থাকে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থাপকেরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সরকার যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তার একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দেয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পর এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্রের খসড়া পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে।

ঋণখেলাপিদের কোন কোন খাতে সুবিধা দিতে হবে সে নির্দেশটাও আছে সে খসড়ায়। এ ‘খসড়াপত্র’ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভেতর অস্বস্তি কাজ করছে বলে জানা গেছে। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ইস্যুতে সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এতদিন যাবৎ এই অনুশীলনই চলে আসছিল, কিন্তু এবার সরাসরি পরিপত্রের খসড়া প্রস্তুত করে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনা অন্য কিছুর ইঙ্গিত বহন করে বলে সবার ধারণা।

ঋণখেলাপিদের ঋণ মওকুফের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতি উৎসাহী মনোভাবই এতে স্পষ্ট প্রকাশ পায়। এখন প্রশ্ন হল, একশ্রেণীর লোক লুটপাট করে জনগণের অর্থ মেরে খাবে আর সরকার সে অর্থ আদায় করা তো দূরে থাক, উল্টো সেই লুটপাটকারীদেরই বিশেষ সুযোগ করে দেবে তা কী করে হয়? ভুক্তভোগী মানুষ কি লুণ্ঠনকারীদের এসব সুবিধা দেয়ার কোনো ম্যান্ডেট দিয়েছে এ সরকারকে?

ঋণখেলাপিদের ঋণ মাফ করে দেয়ার আগে সরকারকে অবশ্যই দেখতে হবে এসব ঋণখেলাপি ইতিপূর্বে কতবার রিসিডিউলের সুবিধা নিয়েছে এবং রিসিডিউলের সুযোগ নিয়ে ঋণ পরিশোধে তাদের রেকর্ড কী? এসব বিবেচনা না করে এ সংক্রান্ত সরকারের যে কোনো পদক্ষেপ হবে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

অবশ্য মন্দ লোকেরা বলে, এ সরকার যেহেতু জনগণনির্ভর সরকার নয়, কাজেই জনগণ কী ভাবল না ভাবল এতে সরকারের কিছু আসে যায় না।

এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে বিশিষ্ট গবেষক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের একটি জাতীয় দৈনিকে লেখা নিবন্ধের কথা মনে পড়ে গেল। নিবন্ধটির নাম ‘গণতন্ত্রের তুষারযুগ-আমলাতন্ত্রের স্বর্ণযুগ’।

তিনি ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি দলের পক্ষে প্রশাসনের ন্যক্কারজনক ভূমিকা ও অব্যবস্থাপনার পর এবারের উপজেলা নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোট প্রদানে অনীহার প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন, “বর্তমানে যে উপজেলা ব্যবস্থা তাতে উপজেলার ভোটাররা নন, সমস্ত উপজেলায় মাত্র একজন মানুষই উপকৃত হন, তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান।’

এখন থেকে যদি কোনো চেয়ারম্যান বলেন, ‘তোমাদের প্রতি আমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই, তোমাদের ভোটে আমি নির্বাচিত নই,’ তাকে দোষ দেয়া যাবে না।”

বছর বছর বাংলাদেশের জিডিপির হার যতই বাড়ুক না কেন, ধনী ও গরিবের অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়ছে একই হারে। অতি ধনী আর গরিবের অর্থের গড় করে যে জিডিপি’র হার দেখানো হয় তাতে এ দেশের দরিদ্র মানুষের কোনো উপকার হয় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

এ কথা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে অতি ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির হারও বেড়ে চলেছে সমান তালে। অর্থনৈতিক দুর্নীতির দৌরাত্ম্যে জনজীবন আজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতির ধারণাসূচকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশের পরের স্থানে আছে আফগানিস্তান। ভুটান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ।

গণতন্ত্র চর্চার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অদক্ষ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ইত্যাদি আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যখন দেখা যায়, উচ্চপর্যায়ের প্রচ্ছন্ন ছায়ায় এসব লাগামহীন দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে তখন এ দেশের নাগরিক হিসেবে অস্থির না হয়ে পারা যায় না।

খেলাপি ঋণ সমস্যা দীর্ঘদিনের হলেও বিগত দশ বছরে এর হার বেড়েছে কয়েকগুণ। শুধু ঋণখেলাপি নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে হারে অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে তা সত্যিই আতঙ্কজনক।

ঋণের নামে মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দেয়ার পরও যখন এসব দুর্নীতিগ্রস্ত মহলকে মাফ করে দেয়ার ঘোষণা আসে, তখন দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে এ দেশের মানুষের কষ্ট হয় না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×