ভারতের লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

ভারতের নির্বাচনে শব্দবাণ!

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সি. পি. সুরেন্দ্রন

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী

ভারত যখন তার সাত ধাপের ১৭তম সাধারণ নির্বাচনের শেষ ধাপে প্রবেশ করছে, তখন শাসক দল বিজেপির নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ মানুষের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে আর কোনো রাখঢাক করছেন না, কিছু সময়ের জন্য হলেও তারা দস্তানা খুলে ফেলেছেন। উন্মোচন করেছেন মুখোশ।

উদাহরণস্বরূপ, মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুরে সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে মোদিকে ‘চোর’ সম্বোধন করেছেন রাহুল গান্ধী। মোদির কথা বর্ণনায় তার প্রিয় বাক্য হল- ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। একটা সময় ছিল মোদি নিজের যোগ্যতা বোঝানোর জন্য নিজেকে এমন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেন, যিনি ভারতকে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত- সব ধরনের হুমকি থেকে সুরক্ষা দেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি ও তার দল এই শব্দ থেকে সুবিধা নিয়েছেন।

প্রায় এক বছর আগে শব্দটির এবং এর সঙ্গে মোদির জগতেরও মোড় ঘুরে যায়। সে সময় ফরাসি প্রতিরক্ষা ফার্ম দাসাল্টের সঙ্গে ৬০০ কোটি রুপির চুক্তি সংক্রান্ত রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেলেঙ্কারি সামনে চলে আসে। অভিযোগ ওঠে, বিজনেস টাইকুন অনিল আম্বানির পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ চুক্তিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

রাহুল গান্ধী দ্রুত এ সুযোগটির সদ্ব্যবহার করেন এবং মোদির ভাবমূর্তি বদলে দেন ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বলে।

শব্দমালাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। ‘চৌকিদার’ শব্দটি নিজেদের টুইটার অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করার জন্য মোদি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে যেমন অপবাদই আরোপ করা হোক, তার মতো করে বিষয়টি শেয়ার করা যায়।

ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের বিশ্লেষকদের মতে, রাহুল গান্ধী তার চন্দ্রপুর বক্তব্যে ৩৫ মিনিটের ভাষণে চোর শব্দটি ১৮ বার ব্যবহার করেছেন।

বিষয়টি অবশ্যই দুঃখজনক। মোদি সবসময়ই নিজের প্রচারের ক্ষেত্রে নিজেকে অত্যন্ত সৎ ও আত্মত্যাগী হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। মোদির উদ্দেশে রাহুল গান্ধীর আরেকটি প্রিয় শব্দ হল ‘জুমলা’- যার অর্থ মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। মোদি সবসময় সবার জন্য স্বর্গের নিশ্চয়তা দিতে উৎসাহী; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

অন্যদিকে মোদি তার ভাষণে ৫০ বছর বয়সী রাহুল গান্ধীকে অপরিপক্ব বালক ও অর্বাচীন বলে উল্লেখ করে থাকেন। এ ধরনের আরও একটি মর্যাদাহানিকর হিন্দি শব্দ হল ‘পাপ্পু’। মোদি রাহুলকে উদ্দেশ করে খেয়ালখুশি মতো শব্দটি ব্যবহার করেন, যেমনটি করে থাকেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবং মোদির অন্য সহযোগীরাও।

নেহেরু-গান্ধী পরিবারের প্রতি অমর্যাদাকর কোনো মন্তব্য ছাড়া মোদির বক্তব্য বিরল। তাদের তিনি ‘পারিওয়ার’ বলে অভিহিত করে থাকেন। প্রায় চিৎকার করে তিনি বলে থাকেন, ‘পারিওয়ার ভারতের সমৃদ্ধি সবকিছু লুটে নিয়েছে।’ তার ক্ষোভ বিশেষ করে রাহুলের প্রপিতামহ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর প্রতি।

রাহুলের মা সোনিয়া গান্ধী যে ইতালীয় বংশোদ্ভূত, এ বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে যান না। এমনকি খোদ রাহুল গান্ধীকেও ছেড়ে কথা বলেন না। রাহুলের শরীরে ইতালীয় রক্তকে এক ধরনের কলঙ্ক হিসেবে তুলে ধরেন মোদি।

সম্প্রতি বিজেপি নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামী রাহুলের ভারতীয় নাগরিকত্বকে চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলা করেছেন। রাহুলের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় এই যে, সুব্রামনিয়াম হলেন একজন মামলাবাজ ব্যক্তি।

উভয় নেতার বক্তব্যের ক্রমবর্ধমান তিক্ততা কেবল তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষতির মুখে ফেলার মধ্যেই সীমিত নেই। রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতাকে খাটো করার ক্ষেত্রে কিছু সফলতাও দেখিয়েছেন এমন একটি সময়, যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভোটারদের আস্থা সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে মোদি প্রায়ই বিভক্তিমূলক ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের প্রশংসার কার্ড খেলে থাকেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, রাহুল গান্ধী কেরালার ওয়াইয়ানাদের দিকে ছুটছেন, কারণ ওই জেলাটিতে হিন্দুর চেয়ে মুসলমান ও খ্রিস্টানের সংখ্যা বেশি।

উল্লেখ্য, রাহুল নিজের ঐতিহ্যবাহী আসন উত্তরপ্রদেশের আমেথির পাশাপাশি কেরালাতেও প্রার্থী হয়েছেন, যে এলাকাটি উত্তর ভারতের তুলনায় সেক্যুলার। গত সপ্তাহে অমিত শাহ বলেছেন, ‘ওয়াইয়ানাদকে পাকিস্তানের মতো মনে হয়।’ এর ইঙ্গিতটি হল- রাহুলের নির্বাচনী সম্ভাবনা একটি ‘শত্রু’ দেশেই বেশি।

বিদ্রূপের হাসির মাধ্যমে অমিত শাহ’র উসকানি দেয়ার কারণ হল, রাহুলের মনোনয়ন দাখিলের সময় সবুজ পতাকা (ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের প্রতীক) প্রদর্শিত হওয়া।

কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় দলের নেতারাই নির্বাচন কমিশনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘মডেল কোড অব কনডাক্ট’ বা আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন। গত সপ্তাহে উভয় নেতাকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে; কিন্তু বাস্তবতা হল- নির্বাচনে যারাই জয়ী হোক, তার পরোয়া না করে বিজেপি দাবি করছে তাদের জোট লোকসভার ৫৪৫ আসনের মধ্যে ৩০০-এর বেশি আসনে জয়ী হবে।

অন্যদিকে সরকার গঠনের স্পষ্ট সুযোগ দেখতে পাচ্ছে কংগ্রেস। মোদি ও রাহুলের মধ্যকার ব্যক্তিগত অপছন্দ যৌক্তিকতা ছাড়িয়ে আবেগনির্ভর হয়ে উঠেছে। তাদের উভয়েরই এটি ভুলে যাওয়া বা পরস্পরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে খুবই কঠিন।

ভোটের ফলাফল আসার পরও তাদের লড়াই শেষ হবে বলে মনে হয় না। আর এটি ভারতের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। কারণ, অন্তত বর্তমানে তারা দু’জনই দেশের গণমানুষের নেতা।

গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

সি. পি. সুরেন্দ্রন : ভারতীয় সাংবাদিক