ভারতের লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

মোদি সরকারের আরেক মেয়াদ সইতে পারবে ভারত?

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  অতিশ তাসীর

প্রবাদতুল্য গণতন্ত্রগুলো জনতুষ্টিবাদে পরিণত হচ্ছে, ভারত এ ক্ষেত্রে প্রথম।

দীর্ঘসময় ধরে পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা নরেন্দ্র মোদি ভারতে ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসেন। ওই সময় পর্যন্ত ভারত মূলত কংগ্রেস দলের হাতে শাসিত হচ্ছিল। ইন্দিরা গান্ধী ও নেহেরুর দলটি স্বাধীন ভারতের ৬৭ বছরের মধ্যে ৫৪ বছরই শাসনক্ষমতায় ছিল।

ভারতের ভাগ্য মোদি ও বিজেপির নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিনা, তা ঠিক করতে দেশটিতে বর্তমানে ভোট গ্রহণ চলছে। এটি একটি সাড়ে পাঁচ সপ্তাহব্যাপী সাত ধাপের ভোটযজ্ঞ, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ৯০ কোটির বেশি মানুষ ভোট দিচ্ছেন।

দেশটির নানা বিষয়াবলীর গভীর দিক, আলোচনা-প্রচারণা ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে হলে কেবল রাজনীতি নয়, সাংস্কৃতিক বিভক্তিগুলোও বুঝতে হবে। এছাড়া মোদির প্রথম মেয়াদের ঘটনাবলির দিকেও আমাদের ফিরে তাকাতে হবে। তখনই কেবল আমরা বুঝতে পারব মোদির আবির্ভাব কেন এক সময় অপরিহার্য ছিল এবং কেন তার আবির্ভাব ভারতের জন্য দুর্দশার কারণও বটে। ভারত জনতুষ্টির বৈধতা ও ফ্যান্টাসির প্রতি নজর দিয়ে থাকে। আমাদের হিসাব করতে হবে যে, এটি কীভাবে তুরস্ক ও ব্রাজিল এবং ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সমাজগুলো থেকে ভিন্ন।

ঘটনার শুরু দেশটির স্বাধীনতা থেকে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ-ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়। ভারতীয় মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ভারত তার ক্যামব্রিজ-শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে নিরেট হিন্দু হওয়ার পথ বেছে নেয়নি। দেশটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমান রয়েছে (তখন ছিল সাড়ে ৩ কোটি, বর্তমানে ১৭ কোটি ২০ লাখের বেশি) এবং যে আদর্শটি নেহেরু রেখে গিয়েছিলেন নতুন স্বাধীন দেশটিতে, তা হল সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা। এ ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল নিছক ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা করার চেয়ে বেশিকিছু; ভারতের ক্ষেত্রে এর অর্থ ছিল সব ধর্মকে সমান বিবেচনা করা। ভারতের মুসলমানদের শরিয়াভিত্তিক পারিবারিক আইন অনুসরণের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, যেখানে হিন্দুদের জন্য ছিল দেশের আইন। যেমন- মুসলমান পুরুষদের জন্য নারীকে তিন তালাক দেয়ার অনুমোদন ছিল; কিন্তু হিন্দুদের জন্য ছিল সংস্কারকৃত পারিবারিক আইন (২০১৮ সালে অবশ্য তথাকথিত তিন তালাককে নির্বাহী আদেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করেন মোদি)।

নেহেরুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, যারা স্বাধীনতার পর বেশিরভাগ সময় ভারত শাসন করেছে, তারা সামন্তবাদী একটি পরিবারতন্ত্র কায়েম করে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে গণতন্ত্রের মূলনীতির কথা ঘোষণা করছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এ ধারা ভেঙে যায় যখন মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ৫৪৩ আসনের পার্লামেন্টে ২৮২টিতে জয়লাভ করে এবং কংগ্রেসের আসন কমে হয় মাত্র ৪৪টি। এটি ছিল এতই ক্ষুদ্রসংখ্যক আসন যে ভারতের সবচেয়ে পুরনো দলটি বিরোধী দল হওয়ার যোগ্যতাও হারায়।

দু’ভাবে জনতুষ্টিবাদীদের আগমন : ওইসব মানুষের দ্বারা, যাদেরকে তারা প্রতিনিধিত্ব করে (তুরস্কে এরদোয়ানের এবং ব্রাজিলে বলসোনারোর মতো) এবং তাদের দ্বারা, নিছক যাদের অনুভূতিগুলোকে ব্যবহার করা হয় (নব্য নাৎসিবাদী প্রচারণা : ব্রেক্সিটপন্থী, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পাকিস্তানের ইমরান খান)। নরেন্দ্র মোদি অবশ্যই প্রথম শ্রেণীর প্রতি দায়বদ্ধ। তিনি ছিলেন একজন চা বিক্রেতার ছেলে এবং তার নির্বাচন কোনো ব্যালট বাক্সে শ্রেণীবিপ্লব ছিল না। রাজনৈতিক মতদ্বৈততা আগে থেকে ছিল না তা নয়; কিন্তু মোদির নির্বাচনী চমক যা প্রকাশ করে দিয়েছে তা হল গভীর সাংস্কৃতিক ফাটল। এটি কোনো বামপন্থী-ডানপন্থী বিষয় ছিল না; ছিল মৌলবাদ থেকে বেশি কিছু।

ভারতীয় সমাজে বিভক্তি, অবিশ্বাসের বীজ অঙ্কুরিত ছিল। আর মোদির বিজয় ছিল সেই অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। তিনি এক সময় অভিযোগের ঊর্ধ্বে থাকা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের আক্রমণ করেন। যেমন : নেহেরু। তারপর নেহেরুর ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে আক্রমণ করেন। কংগ্রেসমুক্ত দেশ গড়ার বিষয়ে বক্তব্য দেন। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বমূলক বন্ধন লালনের কোনো অভিপ্রায় তিনি দেখাননি। তার বক্তব্য থেকে উদার প্রথাবিরোধী সংস্কৃতির আড়ালে হিন্দু এলিটদের বিশ্বাস, মুসলিমবিরোধী মানসিকতা এবং গভীর জাতপ্রথার ধর্মান্ধতা বেরিয়ে এসেছে। দেশটির রাজনৈতিক উসকানিমূলক জাতিগত দাঙ্গার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ২৭৩৩ জন শিখকে দিল্লির রাস্তায় হত্যা করা হয়। মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে দাঙ্গায় ১ হাজারের বেশি মানুষকে, যাদের বেশিরভাগ মুসলমান, হত্যার বিষয়ে তার নীবরতা প্রমাণ করে তিনি দাঙ্গাবান্ধব।

২০১৯ সালে মোদির টুইট ‘তাদের জন্য আমার অপরাধ কী, আপনি জানেন? একজন ব্যক্তি যদি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সে তাদের সালতানাতকে চ্যালেঞ্জ করছে’- এসব বক্তব্য দিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনী স্পিরিটের পুনরুত্থান করতে চাচ্ছেন তিনি। ‘দেম’ বলে ভারতের ইংলিশভাষী এলিটদের বোঝানো হচ্ছে, যারা কংগ্রেসকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। সালতানাত বলে ১৮৫৮ সালে ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের আগে মুসলিম শাসনকে বুঝিয়েছেন। এভাবে গর্বিত হিন্দু জাতি গঠনে তিনি কাজ করছেন।

২০১৪ সালে সাংস্কৃতিক ক্ষোভকে অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তর করেন মোদি। তিনি তখন চাকরি ও উন্নয়নের কথা বলেছেন। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি একহাত নিয়ে খ্যাতি অর্জনের জন্য তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যবসায় সরকারে কোনো কাজ নেই।’ ওই নির্বাচন কোনো আশার নির্বাচন ছিল কিনা তা বিশ্বাস করা কঠিন হলেও মোদির স্লোগান ছিল- ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ (সবাইকে নিয়ে সবার উন্নয়ন।

এখন যখন ভারতে আবার নির্বাচন হচ্ছে তখনও সেসব কথা বন্ধ হয়নি। মোদির অর্থনৈতিক মিরাকল বাস্তবায়নের বিষয়টি কেবল ব্যর্থই হয়নি; তিনি ভারতে বিষাক্ত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী পরিবেশ তৈরিতে সহায়তাও করেছেন। তার দলের তরুণ নেতা তেজস্বী সুরিয়া এ বছরের মার্চ মাসে এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘যদি আপনি মোদির সঙ্গে থাকেন তবে আপনি ভারতের সঙ্গে আছেন। আর যদি আপনি মোদির পক্ষে না থাকেন তবে আপনি ভারতবিরোধী শক্তিকে শক্তিশালী করছেন।’ ভারতের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ মুসলমানকে একের পর এক সহিংস উপাখ্যানের বিষয়বস্তু বানানো হচ্ছে। উত্তেজিত হিন্দু জনতা প্রায় সময় রাজ্যের কৌশলী সমর্থন নিয়ে গরু রক্ষার নামে মুসলমানদের গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করছে। মোদির শাসনাধীনে এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটেছে। ২০১৭ সালে মোহাম্মদ নাঈম নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যার আগে তার চোখকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। খোদ মোদির রাজ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিুবর্ণের চার হিন্দুকে গরুর চামড়া ছাড়ানোর দায়ে লোহার রড দিয়ে পিটিয়েছেন এবং রাস্তায় প্যারেড করিয়েছেন।

নারী ইস্যুতেও মোদির রেকর্ড দাগযুক্ত। একদিকে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে নিজের নির্বাচনের অন্যতম ইস্যু নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, অন্যদিকে তিনি ও তার দলের লোকদের অবস্থান হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক (২০১৮ সালে ভারত পৃথিবীতে নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে)। ২০১৫ সালে রাগের সঙ্গে মোদি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ নারীর শাসনাধীনে থাকার পরও সন্ত্রাসের রেকর্ড গড়েছে। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহসহ অন্যদেরও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একই ধরনের। যদিও মোদি একজন নারীকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মোদির শাসনাধীনে মুসলমান, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সবার উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি এমন একটি ভারত অর্জন করেছেন, যেখানে ক্রমবর্ধমান বিভক্তি নিয়ে অবশ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। আশা জাগানোর জন্য যদি মোদি ২০১৪ সালে বিভক্তি দূরীকরণের বিষয়ে সক্ষম হয়েও থাকেন, ২০১৯ সালে মানুষের কাছে তার আবেদন কেবল বিভক্তি নিয়ে বাঁচার জন্য বেপরোয়া হোন। বর্তমান শাসক দল বিজেপি আবারও জয়ী হতে পারে এবং রাহুলের নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হতে পারে; কিন্তু মোদি ২০১৪ সালের মতো আবার বিপুল স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন না।

২০১৪ সালে আমি পবিত্র নগরী বারানসি থেকে নির্বাচন কভার করেছিলাম, জেরুজালেম, রোম বা মক্কার মতো হিন্দু ভাবমূর্তির শক্তিকে কাজে লাগাতে যাকে নিজের নির্বাচনী এলাকা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মোদি। ওই নির্বাচন আমাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে- একদিকে আমি জানি মুসলিম বংশ পরিচয় (আমার পিতা ছিলেন পাকিস্তানি মুসলিম এবং ভারতের ইংরেজিভাষী এলিটদের একজন, যাদের মোদির রাজত্বে কোনো স্থান নেই)। অন্যদিকে আমি মোদির সাংস্কৃতিক রোগ নির্ণয়ে সহানুভূতিশীল ছিলাম, যাকে ভারতে শক্তি হিসেবে দেখা ও মনে করা হচ্ছিল। সাংস্কৃতিক বিভক্তি ভারতে এখন তীব্র হয়েছে।

মোদির ভারত এমন একটি স্থানের মতো, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যমান শৃঙ্খলা নতুন ও বিশ্বাসযোগ্য আরেকটি শৃঙ্খলা আসার আগে মারা গেছে। মোদি জয়ী হয়েছেন এবং আবারও জয়ী হতে পারেন; কিন্তু শেষ পর্যায়ে কী আছে? তার জনতুষ্টিবাদের ব্র্যান্ডিং নিশ্চিতভাবে ভারতীয় সমাজের জোরালো সমালোচক তৈরি করেছে, যার ভালো প্রতীক কংগ্রেস দল ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। তারা বংশানুক্রমিক মূলনীতি, এমনকি নেহেরু-গান্ধী পরিবারের আরেকজন সদস্য ছাড়া আর তেমন কিছু অফার করতে পারে না। ভারতের সবচেয়ে পুরনো দলটির হাতে প্রিয়াংকাকে (রাহুলের বোন) তার ভাইয়ের পাশে পাঠানো ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নেই। এটি হতে পারে ২০২০ সালে ডেমোক্রেটদের (যুক্তরাষ্ট্রে) আবারও হিলারিকে মাঠে নামানো ও তার মেয়ে চেলসিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করার মতো ব্যাপার।

মোদি ভাগ্যবান যে তার সঙ্গে আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে অনেক দুর্বল বিরোধী দল- আজেবাজে দলগুলোর একটি জোট, যার নেতৃত্বে রয়েছে কংগ্রেস, যার হাতে মোদিকে হারানোর মতো কোনো এজেন্ডা নেই। এমনকি তার মধ্যে প্রবল সন্দেহ রয়েছে (বিরোধীদের বিষয়ে) যে, তিনি ২০১৪ সালের মতো প্রতিশ্রুতিও দেননি। এটি হয়েছে কারণ তিনি শত্রুদের ভেতর থেকে অবলোকন করেছেন। অন্য জনতুষ্টিবাদীদের মতো তিনি তার ক্ষমতাকেন্দ্রে বসে নিজের বিরক্তি টুইট করছেন, ‘তাদের’ সালতানাতের বিরুদ্ধে। আর যেহেতু নিজের প্রবাদপ্রতিম সীমাবদ্ধতা নিয়ে স্বেচ্ছায় সংকীর্ণ দৃষ্টি দেয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে ভারত, সেহেতু তার দ্বিতীয় মেয়াদের ব্যাপারে কেউ শিউরে উঠলেও এড়িয়ে যেতে পারে না, যার মাধ্যমে তিনি নিজের ব্যর্থতার কারণে বিশ্বকে শাস্তি দিতে পারেন।

টাইম ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

অতিশ তাসীর : ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক