নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

সর্বত্রই হতাশা, আশা তাহলে কোথায়?

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. আর এম দেবনাথ

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাস চলছে। চারদিকে একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রয়েছে মানুষ। এদিকে নতুন ফসল কাটা শুরু হয়েছে দেশের কোথাও কোথাও। কৃষকের মনে সন্দেহ, তাদের আশঙ্কা- এবারও তারা ধানের উচিত মূল্য পাবে না।

শ্রীহট্টের কৃষকের আশঙ্কা, অকাল বন্যায় তাদের ফসল নষ্ট হয় কি না। বাজার যথারীতি গরম। প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের দাম কিছু না কিছু বেড়েছে। দেশি মুরগি বাজারে বিরল। শাকসবজির দাম উঁচুতে।

মাছ-মাংসের দাম আকাশচুম্বী। খবর হয়েছে দুধ, মাংস, শাকসবজি যা আমরা খাচ্ছি, তা নানা রোগশোকের জন্ম দিচ্ছে। দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ নাকি কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এসব খবরের মধ্যেই খবর হচ্ছে- বাজেট আসছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট। এটা মে মাস। পবিত্র রমজানের শেষেই নতুন বাজেট সংসদে উত্থাপিত হবে। এ উপলক্ষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রতিদিন অর্থনীতির, ব্যবসা-বাণিজ্যের ও ব্যাংকের ওপর কথা বলছেন। কী করবেন, কী করবেন না সে সম্পর্কে মাঝেমধ্যে ইঙ্গিতও দিচ্ছেন। তিনি নানা পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন। এর মধ্যে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিই প্রধান।

সামান্য কিছু ক্ষেত্রে অন্য পেশার লোকজন আছে। তা-ও ভালো। কারণ আমার মনে পড়ে স্বাধীনতার পরপর আমাদের অর্থমন্ত্রী ব্রিফকেসভর্তি কাগজ নিয়ে যেতেন প্যারিসে- ফ্রান্সের রাজধানীতে। সঙ্গে থাকত আমলারা। উদ্দেশ্য? সাহায্যপ্রাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। সাহায্যদাতা (ডোনার) দেশগুলোর প্রতিনিধিরা, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের লোকরা অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করত। তারপর যে সাহায্য দিত তার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হতো আমাদের জাতীয় বাজেট।

আর আজ? গর্বের কথা, আমাদের আর সাহায্যের জন্য বিদেশে গিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় না। এখন অর্থমন্ত্রীরা কথা বলেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সঙ্গে। কথা হয় বিনিয়োগ নিয়ে, জিডিপি নিয়ে, ব্যাংক ঋণ নিয়ে, ঋণের ওপর সুদের হার নিয়ে। কথা হয় শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্রের বাজার নিয়ে। কথা হয় ভবিষ্যৎ নিয়ে, আমদানি-রফতানি নিয়ে।

খবরের কাগজ পাঠ করলে প্রতিদিন এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বোঝা যায়, অর্থমন্ত্রী মোটাদাগে কথা বলছেন। তার সামনে বড় বড় সমস্যা, রাজস্ব আহরণের সমস্যা, রাজস্ব ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্মাণের সমস্যা। বলাই বাহুল্য, এসব খবর পড়ে সাধারণ পাঠকের পোষায় না। কারণ এতে তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা নেই। দুঃখ লাঘবের কোনো ইঙ্গিত নেই। মানুষের, লাখ লাখ মানুষের রয়েছে অনেক ছোট ছোট দুঃখ।

এসব বিলিয়ন ডলারের ইকোনমিক জোনের আলোচনার সঙ্গে যায় না। যেমন মানুষ চিন্তিত আবার দ্রব্যমূল্য নিয়ে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে কি জিনিসপত্রের দাম বাড়বে? ভ্যাট আইন কার্যকর, আয়কর ফান্ডকরণের ফলে কি মধ্যবিত্তের, সাধারণ মানুষের করভার বাড়বে, জিনিসপত্রের দাম বাড়বে? বাজারে দেখা যাচ্ছে, আমাদের ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ পবিত্র রমজান মাসেও মানুষকে মূল্যবৃদ্ধি থেকে রেহাই দেয় না।

অভিজ্ঞতা বলে, বাজেট ঘোষণার পর কিছু না কিছু পণ্যের দাম বাড়েই। সরকার কর বসালেও বাড়ে, না বসালেও বাড়ে। এরই মধ্যে বাজার চড়েছে। এর প্রমাণ পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি মূল্যস্ফীতির যে তথ্য দিচ্ছেন তাতে দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। এ ছোট একটা দুঃখ যা মানুষকে প্রতিবছর অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার কি কোনো সুরাহা আগামী বাজেটে পাওয়া যাবে? এর সঙ্গেই আরেকটি দুঃখ জড়িত।

একে বড় দুঃখই বলা যায়। মূল্যস্ফীতির বাজারে মানুষের আয় কমছে। হাজার হাজার লোকের চাকরি যাচ্ছে। পাওয়া চাকরি চলে যাচ্ছে। পোশাক খাতে যাচ্ছে, মোবাইল কোম্পানিগুলোতে যাচ্ছে, আইটি খাতে যাচ্ছে। ব্যাংক-বীমায় যাচ্ছে। আবাসন শিল্পে যাচ্ছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশনেও যাচ্ছে। অর্থাৎ যার আয় ছিল তিনি এখন পথে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে মধ্যবয়সে রাস্তায়। এদিকে নতুন চাকরি নেই। সব তথ্য বলছে বেকারত্ব বাড়ছে।

মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে কাজের সন্ধানে। বৃদ্ধ, অবসরপ্রাপ্ত, বিধবা, মুক্তিযোদ্ধা, রেমিটেন্স প্রাপক এবং পেশাজীবীদের আয় কমছে। কমার হুমকি আসছে। প্রথম হুমকি সঞ্চয়ের সুদের ব্যাপারে। এটা নাকি কমানো হবে। বলা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্রের সুদ সর্বনাশ করছে। অথচ কেউ বলছে না, সরকারি চাকরিজীবীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর সরকার কী হারে সুদ দেয়?

কেউ বলছে না যে, সরকার বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা কররেয়াত দেয় নানা শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের। এসব প্রশ্ন আলোচনায় নেই। আলোচনায় নেই, মেয়াদি আমানতের ওপর সুদ নিয়ে। পঞ্চাশ লাখ টাকা সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখলে ব্যাংক সুদ দেয় তিন সাড়ে তিন শতাংশ হারে। তার থেকে ১০-১৫ শতাংশ কেটে নেয়া হয় অগ্রিম আয়কর হিসাবে। অথচ মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক কোনো সুদই দেয় না। সরকারি নয়-ছয় নীতির ফলে আমানতকারী ভীষণভাবে বঞ্চিত। অথচ ব্যবসায়ীদের কোনো লাভ হচ্ছে না। তারা সস্তায় ঋণ পাচ্ছেন না। টাকা যাচ্ছে কোথায়? ব্যাংক তো তাদের মুনাফা বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা- ব্যাংকে কোনো আমানত নেই। ব্যাংকগুলো কিছুদিন আগ পর্যন্ত সমানে ঋণ দিয়েছে। বড় বড় সরকারি ঋণপত্র খুলেছে। অথচ সেভাবে ব্যাংকে আমানত বাড়েনি।

দশ-এগারো শতাংশ ঋণবৃদ্ধির বিপরীতে আমানত বাড়ছে ৬-৭ শতাংশ হারে। বড় ধরনের ‘মিসম্যাচ’, বিপজ্জনক একটা পরিস্থিতি। ওই ঝামেলায় পড়ে মার খাচ্ছে আমানতকারীরা। তাদের আয় কমেছে এক তৃতীয়াংশে। এটা আমি ছোট দুঃখ বলব না। জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা। বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা খরচ, যাতায়াত খরচের ঊর্ধ্বমুখি প্রবণতার মধ্যে সুদ-আয় হ্রাস পাওয়া খুবই খারাপ সংবাদ।

অর্থমন্ত্রী কিন্তু আমানতের ব্যাপারে কিছুই বলছেন না। তিনি বলছেন ঋণখেলাপিদের ‘দুঃখ’ দেখবেন। নানা ব্যবস্থার কথা বলছেন। ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়া বাজারে ভালো হয়নি। যারা ভালো গ্রাহক তারাও এখন টাকা দেয়া বন্ধ করে ফেলেছেন।

দেখা যাক সরকার কী করে? খারাপদের সুবিধা দিলে আমাদের দেবে না কেন? এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো। তারা তারল্য সংকটে আছে। এর মধ্যে গ্রাহকদের এই অবস্থান ব্যাংকের ক্ষতি করছে।

এদিকে শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে নানামুখী তৎপরতা। এই বাজার এখন আছে তো তখন নেই। অর্থমন্ত্রী এই সম্পর্কে একেকদিন একেক কথা বলছেন আর বাজারে উত্থানপতন ঘটছে। অথচ এটা কাম্য নয়। শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্রের বাজার, আমানতের বাজার- একই সূত্রে গাঁথা।

এগুলো সঞ্চয়ের ফসল, সঞ্চয়ের মাধ্যম। এসব ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে অর্থনীতির ক্ষতি ছাড়া ভালো হবে না। ধরা যাক, আমানত বৃদ্ধি বর্তমানের মতো স্থবির হয়ে আছে। তাহলে ঋণ কোত্থেকে আসবে? ঋণবৃদ্ধি কোত্থেকে হবে? যদি না হয় তাহলে প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট কোত্থেকে বাড়বে? বর্তমানে সরকারের বিনিয়োগই দৃশ্যমান। বেসরকারি বিনিয়োগে কোনো নড়নচরণ নেই। তাহলে কী দাঁড়াল?

জিডিপি প্রবৃদ্ধি কীভাবে হবে? অর্থমন্ত্রী একবার বলেছেন দক্ষতা বৃদ্ধি করে ‘ইনপুট-আউটপুট’ অনুপাতে উন্নতি ঘটিয়ে জিডিপি বৃদ্ধি ঘটানো যায়। কিন্তু বিষয়টি কত জটিল নিশ্চয়ই তিনি জানেন। মানুষের ছোট ছোট দুঃখ বাড়ে, কষ্ট বাড়ে আরেকটা বাজেটের কারণে।

আমাদের বাজেটে এক টাকার কাজ করতে দুই টাকা-তিন টাকা লাগে। এতে মানুষের ঘাড়ে বোঝা বাড়ে। বাজেটের এই অদক্ষতা অথবা সরকারি খরচে দুর্নীতি-অপচয় সাধারণ মানুষকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। বস্তুতপক্ষে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যয়ের বাজেট না করে বাজেট বাস্তবায়নে গুণগত মান বৃদ্ধি করে অনেক কম ব্যয়ের বাজেট করা যায় এবং এতে সমান ফলই আসবে। কিন্তু তা হচ্ছে না।

ব্যাংকের আমানতকারীদের আরেকটা দুঃখ, ব্যবসায়ীরা শুধু ঋণের ওপরই নির্ভরশীল। তারা শেয়ারবাজারে যায় না। দেশে তিন লাখেরও বেশি কোম্পানি। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। এদের মধ্যে বড় সংখ্যক কোম্পানি দেশে চুটিয়ে ব্যবসা করছে।

অনেকেই বিদেশে পর্যন্ত কোম্পানি করছে। অথচ তারা তাদের কোম্পানিকে ‘পাবলিক লিমিটেড’ কোম্পানি করতে রাজি নয়। অর্থমন্ত্রী বিষয়টি ধরেছেন।

কিন্তু ‘ব্যাংক-ফিন্যান্স লেড’ উন্নয়নের মডেল থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারবেন? এ ব্যাপারে কি কোনো ঘোষণা বাজেটে আমরা পাব? জানি না ছোট-বড় দুঃখের কতটুকু ‘হিল্লা’ হবে। অর্থমন্ত্রী তার বর্তমান কাজে নতুন।

তবে একটা জিনিস তার শক্তি। তিনি নিজে ব্যবসায়ী, শিল্পমন্ত্রী বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ী, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীও ব্যবসায়ী, উপদেষ্টা ব্যবসায়ী; বাজেট প্রণয়নে নিশ্চয়ই তারাও অবদান রাখবেন। তবে তাদেরকে দেখতে হবে, বাজেট যাতে অতিরিক্তভাবে ব্যবসায়ীবান্ধব না হয়। শত হোক বাজেটে সাধারণ মানুষেরও ‘হক’ আছে।

ড. আরএম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক