লোকসভা নির্বাচন-২০১৯: সেক্যুলারিজম ধারণার পুনরুদ্ধার

  ইয়ামিনি আইয়ার ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাতায়ন

বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ, বিষাক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি একটি নির্বাচনী প্রচারণার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে ভারত। সবার দৃষ্টি এখন ২৩ মে’র দিকে এবং নির্বাচনের ফলাফল ভারতের ভবিষ্যতের জন্য কী অশনিসংকেত নিয়ে আসে, সেদিকে।

বিজেপিকে নিয়ে বা বিজেপি ছাড়া একটি জোট গঠন নির্বাচনী প্রকল্পকে গতিহীন করে ফেলা, এমনকি এতে স্থবিরতা নিয়ে আসতে পারে। যা হোক, ২৩ মে সম্ভবত হতে যাচ্ছে ভারতের গণতন্ত্রের বক্রপথে চূড়ান্ত একটি মুহূর্ত।

কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল এবং এটি যেসব পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে তা পেরিয়ে নির্বাচনী এসব পয়েন্ট থেকে যে রাজনৈতিক গতিপথের উত্থান হতে পারে, তা হল আমাদের জনমানসের ভূগোলকে একটি গভীর এবং আরও বেশি মৌলবাদী পরিবর্তন উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

আর এ প্রাবন্ধিকের যুক্তি হচ্ছে, নির্বাচনী ফলাফলের বিষয়াবলি বিবেচনায় না নিয়েই সেক্যুলার গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কীভাবে এসব পরিবর্তনকে মধ্যস্থতা করা হচ্ছে এবং আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক ঐকমত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারছি কিনা তার ওপর, যে নতুন রাজনৈতিক ঐকমত্যে মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোকে ধারণ করা হবে এবং যাতে বর্তমানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাঁকে একটি কার্যকর আদর্শিক পাল্টা পয়েন্ট লালন করা হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুহাস পলশিখর বিতর্ক করছেন যে, ২০১৪ সাল থেকে ভারত একটি নতুন পদ্ধতির উত্থান প্রত্যক্ষ করছে, যাতে নতুন এক সেট আদর্শ ও স্পর্শকাতরতা নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জনজীবনের একটি আকৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে। পলশিখরের মতে, নির্বাচনে পরাজয় বিজেপির এ নতুন আদর্শিক প্রভুত্বের খসড়ার পথের আন্দোলনকে ছিদ্র করে দিতে পারে। কিন্তু আমার মন্তব্য হচ্ছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনী প্রচারণার গতিপথের সুস্পষ্ট নির্দেশক হল এ নতুন দল পদ্ধতি, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে যে আদর্শিক প্রভুত্ব অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করা হয়েছে, তার ধীরে ধীরে শিকড় গজাচ্ছে এবং এটিকে ঠেকিয়ে রাখতে হলে একটি নির্বাচনী পরাজয়ের চেয়ে আরও বেশি কিছু প্রয়োজন হবে।

এখানে সুনির্দিষ্ট দুটি পথ আছে যাতে বোঝা যাবে নতুন এ আদর্শিক কর্তৃত্ব নিজেকে সুস্পষ্ট করে যেভাবে উল্লেখ করছে তা হাইলাইট করার দাবি রাখে।

প্রথমত, নির্বাচনী বিতর্কের নিকৃষ্টতা। ‘চৌকিদার চোর’ থেকে ‘এক নম্বর দুর্নীতিবাজ’, এ নির্বাচন সব রঙের ও বর্ণের রাজনীতিবিদদের এ ধরনের বাজে নামে ডাকার চর্চা চরিতার্থ করতে দেখেছে। কিন্তু বিজেপি সম্ভবত নার্ভাসনেসের কারণে সভ্যতার সব মাপকাঠি দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়ার আসনে ছিল এ নির্বাচনে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে বিজেপি নেতারা ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য অশালীনভাবে সাম্প্রদায়িক ও বিভক্তিমূলক ভাষা ব্যবহার করে গেছেন। দলটির আদর্শিক বিশ্বাস এবং বাগাড়ম্বরপূর্ণ কৌশলের বাইরে দলটি এর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুনিপুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। বাজে বিতর্কের এ প্রবণতা সম্ভবত প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা নেয়ার ব্যর্থতা এবং অবিরাম ও ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক জনসভা ও নির্বাচনী বক্তব্যগুলোতে অনুসৃত নির্বাচনী আচরণের অশালীন লঙ্ঘন, আমাদের জনসংস্কৃতিতে বাজে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝুঁকি কমিয়ে আনার ব্যর্থতা ছিল নজিরবিহীন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কৃতিত্ব ও কার্য সম্পাদনের জন্য রাজনৈতিক স্বচ্ছতার অনিশ্চিত গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি যে কোনো মূল্যে উপলব্ধি করতে ও নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ হিসেবে কাজ করার সম্ভাব্যতাকে এটি ক্ষয়িত করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় এ বাজে বিতর্কের নজির ভারতে জনসাধারণের মধ্যে বিতর্কের একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ হয়ে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান দলকানা আদর্শের প্রশ্রয় গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা নতুন যোগাযোগ পদ্ধতি যে ক্ষুদ্র পদক্ষেপ অনুমোদন করে না, তাতে যত্নশীল ও যৌক্তিক বিতর্ক সংকুচিত হয়েছে। আদর্শগত প্রভাব বিস্তারের এ অনুসন্ধান পথে বিজেপি ও এর সহযোগীরা এ সংকুচিত গতিতে সফলভাবে প্রাণসঞ্চার করেছেন সেক্যুলারিজম ও জাতীয়তাবাদের নতুন অর্থারোপ করার জন্য, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের গণতান্ত্রিক প্রকল্প ভিত্তি পেয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হল সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরেপেক্ষতা। সাধারণ মানুষের যুক্তিতর্কের গতি সংকুচিত করার জন্য সবচেয়ে বড় হতাহত হল ধর্মনিরপেক্ষতা। সেক্যুলারিজম আন্ডার সেইজ শিরোনামের এক প্রবন্ধে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নীরা চান্ডহক বিতর্ক করেছেন যে, এ সংকট হল সেক্যুলারিজমের সামাজিক প্রক্রিয়াকে এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা নিহিত আছে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার নতুন সংস্কারের সামর্থ্যরে মধ্যে। আর এ নির্বাচনে তেমন কোনো পরিস্থিতি তৈরির একেবারে সম্ভানা নেই।

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

ইয়ামিনি আইয়ার : সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের প্রেসিডেন্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×