শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা

করুণাঘন ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য

  ড. সুকোমল বড়ুয়া ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহামানব গৌতম বুদ্ধ
মহামানব গৌতম বুদ্ধ

আজ শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা। ২৫৬৩ বুদ্ধবর্ষ শুরু হল। দিনটি মানব ইতিহাসে এক পরম পবিত্রতম তিথি। এ দিনেই মহামানব গৌতম বুদ্ধের জন্ম লুম্বিনী উদ্যানে খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে। দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে গয়ার বোধিধ্রুম মূলে।

দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধর্ম প্রচারের পর তিনি আশি বছর বয়সে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে কুশিনগরের মল্ল রাজারের শালবনে।

বুদ্ধ জীবনের এই তিনটি প্রধান ঘটনা মানব বিশ্বের ইতিহাসে ‘বুদ্ধপূর্ণিমা’ নামে অভিহিত। জাতিসংঘ এ দিবসটিকে ‘বৈশাখ ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এ ঐতিহাসিক শুভ তিথিটিকে তারা দেশ-বিদেশে মর্যাদার সঙ্গে পালন করছে।

আমরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বৌদ্ধরা এ শুভ দিনটিকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে এবং নানা আয়োজন ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করছি। আজ এ শুভ দিনে আমি বাংলাদেশের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষসহ বিশ্বের সব মানবগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

প্রতি বছর এ মহান বুদ্ধপূর্ণিমা উদযাপনের মধ্য দিয়েই আমরা মহামানব গৌতম বুদ্ধের মানবতাবাদী অমূল্য শিক্ষা এবং মানবজীবনে শীল সমাধি প্রজ্ঞাময় জীবন গঠনের এক অপূর্ব প্রেরণা লাভ করি, যা ইহজাগতিক এবং পারমার্থিক উভয় জীবনের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট।

বৌদ্ধমতে শীল সমাধি প্রজ্ঞাময় জীবনের মধ্য দিয়েই একজন মানুষের জীবন গড়ে ওঠে বহুমাত্রিক গুণে এবং উন্নত-সদ্জীবন হিসেবে। আমি কে? আমার করণীয় কী? ভালো-মন্দ কী কাজ আমার করা উচিত কিংবা অনুচিত? আমার কর্মে আমি নিজেই সন্তুষ্ট কিনা? সর্বোপরি আমার কর্মে মানবজাতি উপকৃত হচ্ছে কিনা- এসব বিষয় চিন্তা করাই হল বৌদ্ধ ভাবনা।

এসব চিন্তা করতে গেলেই একজন মানুষ তার জীবন সম্পর্কে, জীবনের করণীয় সম্পর্কে এবং কর্মের শুভাশুভ সম্পর্কে অনায়াসে ভাবতে পারবে। এতে আত্মজীবন যেমন বিশ্লেষণ করা যাবে, তেমনি জীবন সচেতনতাও বৃদ্ধি পাবে। তবে আমরা সহজে আত্মজীবন বিশ্লেষণ করতে চাই না।

চাই না আমি আমার সম্পর্কে জানতেও, চাই না উপলব্ধি করতে। চাই না বলেই বিশ্বের মানবতা আজ এত বিপন্ন এবং মানবজাতির আজ এত দুঃখ-দুর্দশা। এ জন্যই বুদ্ধ বলেছেন- উত্তিট্ঠ নপ্প মজ্জেয়্য, ধম্মং সুচরিতং চরে- তোমরা ওঠ! জাগ্রত হও, আত্মসচেতন হও। সুন্দররূপে ধর্মাচরণ কর। অন্তর্মুখী শীল সমাধি প্রজ্ঞা সাধনা কর।

বুদ্ধ আরও বলেছেন- এহিপস্সিকো সন্দিট্ঠিকো পচ্চত্তং বেদিতব্বং- অর্থাৎ তুমি তোমাকে দেখ, উপলব্ধি কর এবং সম্যকভাবে পর্যবেক্ষণ কর। আমরা আমাদেরকে সম্যকভাবে দেখি না বলেই আজ আমরা নানা মন্দকর্মে এবং লোভ, দ্বেষ, হিংসা মোহে, জিঘাংসাতে এত জর্জরিত। বিত্ত, বৈভব, ঐশ্বর্য, নাম, যশ, খ্যাতি এবং সিংহাসন ও ক্ষমতা লাভের জন্য আমরা এত ব্যাকুল।

ক্ষমতা ধরে রাখা, ক্ষমতা পাওয়ার জন্য চলছে নিরন্তর নীরব অথবা সরব প্রতিযোগিতা। চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। কে কাকে জয় করবে, কে কাকে ভূলুণ্ঠিত করবে, কে কার ক্ষমতা গ্রহণ করবে, রাজ্য বিস্তার করবে, কে কার ধন-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব কেড়ে নেবে, কে সমগ্র বিশ্বের শাসক হবে- এ চিন্তায় আমরা যেন অস্থির, বিভোর।

সুতরাং এসব অশুভ চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় আমাদের সুন্দর মনে নানা ধরনের অসৎ ভাবনা, কুমানসিকতা এবং সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য নামের নানা প্রবৃত্তি ও জিঘাংসা। এ থেকেই সমাজ ও বিশ্বের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের সংঘাত, যুদ্ধ ও সন্ত্রাসসহ নানা অরাজকতা।

এই তো সেদিন নিউজিল্যাণ্ডের খ্রাইস্ট চার্চের ঘটনায় আমরা কত মর্মাহত হলাম। বিশ্বের মানুষ হতবাক হল, কাঁদল অজস্র ধারায়। বলতে গেলে কত পৈশাচিক এবং কত মর্মন্তুদ এ ঘটনা। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটে গেল শ্রীলংকায় সিরিজ বোমা হামলা।

অনেক প্রাণ ঝরে গেল। শত শত লোক আহত হল, পঙ্গু হল। প্রশ্ন জাগে, এটাই কি ধর্মের শিক্ষা? মানবতার শিক্ষা? ভাবলে অবাক হই। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে নানা অপরাধ প্রবণতাও বেড়ে গেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখা যায় ধর্ষণসহ নানা অপরাধ। কত জঘন্য জঘন্য ঘটনা। অন্যদিকে শহর-বন্দর এবং রাজপথে চলছে নানা অধিকারবঞ্চিত মানুষের কান্না।

মূলত মানব জীবনকে সৎ, সুন্দর, নীতিবান এবং জ্ঞানমুখী করার জন্যই তো ধর্ম। এ জন্যই মানুষের নৈতিক ও পরামার্থ সাধনার বিষয়টিকে বৌদ্ধধর্ম বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ বুদ্ধ জানতেন, মানুষের জীবন যদি সৎ, সুন্দর, বিবেকবান ও শুদ্ধাচার না হয়; তাহলে সে যে কোনো অপরাধ ও হীন কাজ করতে পারবে। সে কখনও অসৎ ও মন্দ কাজে লজ্জাবোধ করবে না এবং উত্তম জীবন গঠনের জন্য সৎ প্রবৃত্তিবানও হতে পারবে না।

বৌদ্ধমতে, শীলময় জীবন, সমাধি এবং প্রজ্ঞাময় জীবনই মানুষকে সৎ পথে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সঠিক দিক-নির্দেশনা দেয়। বৌদ্ধশাস্ত্র বলে- যে মানুষ যত বেশি শীলাচারণসম্পন্ন, সমাধিপরায়ণ এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন হবেন; সে তত বেশি জীবনে সুখী ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানে বসবাস করতে পারবেন।

বৌদ্ধমতে তিনিই বুদ্ধিমান, যিনি প্রজ্ঞাসম্পন্ন সর্বোত্তম এবং আত্মসচেতন ও বিবেকবান। যিনি তার ভালো-মন্দ কর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে পরিজ্ঞাত হতে পারেন; তিনি জ্ঞানী, পুরুষোত্তম। ব্যক্তির বিবেক-সচেতন হলেই তার কর্মের ভালো-মন্দ সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন এবং যে কোনো মন্দ কর্ম থেকে সে নিজকে বিরত রাখতে পারেন।

তাই বৌদ্ধ জীবন পদ্ধতিতে প্রথমেই বৌদ্ধ মানস গঠনের লক্ষে পঞ্চশীল বা পঞ্চনীতির কথা বলা হয়েছে; যেখানে একজন ব্যক্তি তার শৈশব ও বাল্যজীবন থেকে এই সদ্গুণ চর্চার মাধ্যমে নিজকে তৈরি করতে পারেন। এতে শুধু যে আমি নীতিপরায়ণ হব তা নয়; অন্যকেও নীতিবান ও আদর্শবান করা যায়।

এ জন্যই বৌদ্ধ পঞ্চনীতির শিক্ষা ব্যবহারিক জীবনের সব পর্যায়ে সার্থকভাবে অনুশীলন করা উচিত। যেমন- আমি কোনোরকম জীব হত্যা করব না, চৌর্যবৃত্তি করব না, কোনো প্রকার মিথ্যা কামাচার কিংবা অবৈধ ব্যাভিচার করব না, অন্যকেও এ কাজে উৎসাহিত করব না। আমি কোনো ধরনের মিথ্যা বলব না, কোনো প্রকার নেশা বা মাদকদ্রব্য সেবন করব না, অন্যকেও উৎসাহিত করব না।

এখন আপনারাই চিন্তা করুন- এ নীতিগুলো যদি আমি কিংবা আমরা সবাই পালন করি, তাহলে কখনও কী আমরা অনৈতিক কাজ করতে পারি? শীল পালনের ওপর এ জন্যই বৌদ্ধধর্ম অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। বৌদ্ধ কার্য-কারণ তত্ত্বে বলা হয়েছে, একটি অনৈতিকতা আরেকটি অনৈতিকতার জন্ম দেয়, একটি সৎ চিন্তা আরেকটি সৎ চিন্তা সৃষ্টি করে।

অশুভ চিন্তা থেকে কখনও শুভ ফল পাওয়া যায় না; যেমনি পাওয়া যায় না, অন্ধকার থেকে আলোর শুভ্রতা। কর্ম যদি কৃষ্ণ হয়, ফলও হবে কৃষ্ণ। কৃষ্ণকর্ম থেকে কখনও শুক্লফল আশা করা যায় না। অশুভ চিন্তার ফল সব সময় অশুভই হয়। এটাই বৌদ্ধ সিদ্ধান্ত।

বৌদ্ধমতে অবিদ্যাই অজ্ঞানতার মূল কারণ। সব ধরনের অশুভ, দুর্বিনীত এবং অজ্ঞানপ্রসূত সব কাজের জন্য এই অবিদ্যাই দায়ী। আমাদের সব ধরনের কামনা, বাসনা, লোভ, দ্বেষ, মোহ, হিংসা, প্রতিহিংসা প্রভৃতি সব ধরনের অসৎ প্রবণতা এ অজ্ঞানতা থেকেই জন্ম নেয়। সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে, আমার নিজ বিপথগামী চিত্তই আমাকে সদা অশুভ বা অকুশল পথে নিয়ে যায়।

তাই বৌদ্ধশাস্ত্র বলছে- একজন শত্রু আর একজন শত্রুর যতটুকু ক্ষতি করতে পারে না, তার চেয়ে অধিক ক্ষতি করতে পারে তার নিজের কলুষিত চিত্ত। অন্যদিকে নিজের পিতা-মাতা নিজ সন্তান-সন্ততির যতটুকু উপকার করতে পারে না, তার চেয়ে অধিক উপকার করতে পারে নিজের সুসংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত চিত্ত। তাই তো বৌদ্ধধর্মে সৎ জীবন গঠন ও সৎ জীবন পরিচালনার জন্য আটটি বিশুদ্ধ পথ বা মার্গের কথা বলা হয়েছে, যাকে বৌদ্ধ পরিভাষায় বলা হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ।

এগুলো সৎ জীবন তৈরির জন্য এক একটি স্তম্ভ। যেমন- সদ্দৃষ্টি, সদ্বাক্য, সদ্কর্ম, সদ্জীবিকা, সদ্ সংকল্প, সদ্প্রচেষ্টা, সদ্স্মৃতি, সদ্সমাধি। এগুলো ব্যক্তিগত জীবনে এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ও অনিবার্যতা অপরিহার্য।

এর প্রত্যেকটি উপাদান দিয়ে যদি আমাদের জীবন গঠন করা যায়, আমরা যদি এর প্রত্যেকটিকে যথার্থরূপে ব্যবহার করি, তাহলে আমরা কী কোনোদিন কারও অশুভ, অকল্যাণ করতে পারি? আমরা কী পারি কোনোরকম সন্ত্রাস, নৈরাজ্য কিংবা জঙ্গিবাদের মতো নৃশংস কাজ করতে?

মানব জীবনকে প্রত্যেক ধর্মে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চতম সম্মান দেয়া হয়েছে। অতএব, মানুষ হিসেবে আমি যদি উত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ হই, তাহলে আমার কর্মও হবে উত্তম এবং সর্বোৎকৃষ্ট।

এ জন্যই বৌদ্ধধর্ম বলছে- হীনধম্ম ন সেবেয়্য, পমাদেন ন সংবসো। অর্থাৎ তোমরা হীনধর্ম আচরণ করবে না, কখনও প্রমাদের বশবর্তী হয়ো না। কারণ প্রমাদ মৃত্যুর পথ, আর অপ্রমাদ হল অমৃতের।

অতএব চলুন, আমরা আজ আমাদের মন থেকে সব ধরনের দুষ্কর্ম পরিহার করি। হিংসা, ক্রোধ, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য এবং নানা ধরনের অনৈতিক অপকর্ম থেকে নিজকে বিরত রাখি। চলুন, আমরা আজ কায়িক সংযত হই, বাচনিক সংযত হই এবং মানসিক সংযত হই।

কারণ কায়িক সংযম সাধুকর এবং বাচনিক সংযম সাধুকর, মানসিক সংযমও সাধুকর। ত্রিবিধ বিষয়ে যিনি সর্বোতভাবে সংযমী, তিনিই সর্বোত্তম সাধুকর।

অতএব চলুন, আমরা আজ বিশ্ববাসীর জন্য শান্তি কামনা করি। প্রার্থনা করি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্ত পুণ্য; করুণাঘন ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য।’ সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু- জগতের সব জীব সুখী হোক। ভবতু সব্ব মঙ্গলং- সবার মঙ্গল হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক। মহান বুদ্ধপূর্ণিমার জয় হোক।

প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

skbaruadu-gmail.com

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×