জিতে হেরে যাওয়া ও হেরে জিতে যাওয়ার উপাখ্যান

  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম ১৯ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন,

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নির্বাচন একরকম জীবন-মরণ খেলা; জিতে যাওয়ার নানা কৌশল রপ্ত করা- যেন এ যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলে সব শেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোয় নির্বাচন হল দেশ পরিচালনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ। সেখানে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন নির্বিকার। কে এলো, কে গেল- তাতে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই; যেন সবার সমান সুযোগ বজায় থাকে, এটা দেখার পাশপাশি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এদিক দিয়ে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বে অনন্য। বর্তমানে সেখানে ৭ ধাপে মাসব্যাপী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর ভোটিং মেশিন সিলগালা করে প্রশাসনের জিম্মায় রাখা হয়। বিজয়ী অথবা পরাজিত কেউ বড় কোনো প্রশ্ন করেন না গণনা অথবা ফলাফল প্রদানের ক্ষেত্রে। তবে এবার ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় নির্বাচন কমিশন অবশ্য তার জবাব দিয়েছে। এতে আপাতদৃষ্টিতে দলগুলো সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে।

গত মাসে তুরস্কের স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন হল। এতে সরকার দল একেপি বড় ৩টি শহরে হেরে গিয়েও অন্যান্য অঞ্চলে ভালো করেছে। তবে রাজধানী আঙ্কারা, ব্যবসায়িক রাজধানী ইস্তাম্বুল আর তৃতীয় বড় শহর ইজমি তাদের হাতছাড়া হয়েছে। যে শহরে এরদোগান বড় হয়েছেন, রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিয়েছেন, যে শহরে তিনি মেয়র হয়ে চমকে দেয়ার মতো কাজ করেছেন, যে শহরের মেয়র থাকা অবস্থায় ‘গোঁড়া ধর্মীয় কবিতা’ আবৃত্তি করার অপরাধে জেলে গেছেন, সর্বোপরি যে শহর থেকে তিনি পরবর্তীকালে তুরস্কের সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন; সে শহর তার হাতছাড়া! খোদ রাজধানী শহর আর ইস্তাম্বুল একেপি পার্টির হাতছাড়া।

পরবর্তী সময়ে ভোট পুনঃগণনা হওয়ার পরও একেপি প্রার্থী হেরেছেন। নির্বাচন কমিশন অবশ্য ইস্তাম্বুলে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ করে পুনঃভোটের আয়োজন করেছে। এতে বিরোধী দল সিএইচপি আরও বেশি ভোটে জেতার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি তদন্ত আশা করেছেন।

সিএইচপি তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল পাশার দল। ইমামওলু ছিলেন ইস্তাম্বুলের অজানা একটি ছোট জেলার মেয়র। নির্বাচনে জিতে তিনি সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এমনকি তিনি একেপি দলের সদস্যদেরও ভোট প্রার্থনা করেছেন। দলাদলির এমন তীব্র অবস্থা কাটিয়ে ওঠে ইস্তাম্বুলের উন্নয়নে অবদান রাখবেন বলেও তিনি কথা দিয়েছেন। বলে রাখা ভালো, তুরস্কের ৮১টি প্রদেশে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়ে গেল গত ৩১ মার্চ।

তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সংবিধানে প্রতি ৫ বছর অন্তর মার্চের শেষ রোববারের কথা বলা আছে। সেখানে এ নিয়ম মেনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তুরস্কে নির্বাচনের ফলাফল কখনও একতরফা হয় না। যেমন ২০১৪ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে তুরস্কের বড় ২টি শহর আঙ্কারা এবং ইস্তাম্বুল ছিল একেপি দলের কব্জায় আর শুধু ইজমির ছিল সিএইচপি দলের। এবার তিনটি বড় শহরই চলে গেছে বিরোধী শিবিরের দখলে। অবশ্য ইস্তাম্বুলে পুনঃনির্বাচনের আদেশ হয়েছে।

একেপি দল ২০০২ সাল থেকে তুরস্কে সরকার পরিচালনা করে আসছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি এরদোগানের মতে, তুরস্কে একেপি দলের নেতাদের ‘মানসিক কষ্ট’ দেখা দিচ্ছে। এজন্য তিনি পুরনো নেতাদের সরিয়ে দলে নতুন নেতৃত্ব এনেছেন; যারা নির্বাচনে জিতে তাদের শক্তি ও উদ্যম দেশের কাজে লাগাবেন। এর ফলে বেশকিছু নেতা দল পরিবর্তন ও নতুন দল সৃষ্টিতে উৎসাহিত হয়েছেন। একেপি দল জাতীয় নির্বাচনে ভালো করার পরও স্থানীয় নির্বাচনে ততটা ভালো করতে পারেনি।

বহু বছর ক্ষমতায় থাকার পর এরদোগান যাদের নির্বাচিত পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, তারা হচ্ছেন আঙ্কারা, ইস্তাম্বুল, নিদে, দূরজে, বুসরা, বালিকসাহির, ওরদু ইত্যাদি বড় শহরগুলোর মেয়র। এদের কেউ কেউ জনকল্যাণে নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করার পরও নির্বাচিত পদ থেকে পদত্যাগের সময় আবেগপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছেন। এতে পার্টির নতুন নেতৃত্ব ততটা ভালো করতে পারেনি। অনেকে বলেন, এরদোগানের মতো নেতা বলেই এতটা ঝুঁকি নিতে পেরেছেন। সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীদের বাদ দিয়ে দলে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন।

একটানা সরকার পরিচালনায় বা স্থানীয় সরকারে মেয়র থাকার সুবাদে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে; যাদের কীর্তিকলাপের জন্য দলের প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে প্রচুর। বস্তুত এ চিন্তা এবং ‘মেন্টাল ফেটিগ’ কাটানোর মানসে এরদোগান তার দলের দীর্ঘকাল ধরে নির্বাচিত মেয়রদের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দলে নতুন নেতৃত্ব আনতে বলেন। ফলে তার দল স্থানীয় নির্বাচনে ততটা ভালো করতে পারেননি, যতটা জাতীয় নির্বাচনে করতে পেরেছেন।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি শ্লথ হওয়ার কারণও রয়েছে। আমেরিকার কিছু কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে তুরস্কের লিরার দরপতন ঘটেছে। তবুও ন্যাটো সদস্য তুরস্ক রাশিয়া থেকে অস্ত্রসম্ভার ক্রয়ে অটল রয়েছে। এতে তুরস্ক আর আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে ইরান ও কাতারের পক্ষে কাজ করায় আমেরিকা, সৌদি আরব ও ইসরাইল তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এরদোগান খুব সাবধানে এগোচ্ছেন, তা বোঝাই যায়।

ভারতে এবারের নির্বাচনের প্রথম ধাপে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদির আমলে হওয়া উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করে। জরিপের ফলাফল ততটা সুখকর না হওয়ায় দ্বিতীয় ধাপে বিজেপি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও পরিষ্কার ভারত উপহার দেয়ার স্লোগান তোলে। তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে বিজেপি ধর্মীয় স্লোগান তুলে ভোট চাইছে। এর মধ্যে কাশ্মীরিদের ভারতের অন্যান্য শহরে ব্যবসা, পড়াশোনার ইত্যাদির ওপর বিচারবহির্ভূত অবস্থান গ্রহণ ও ‘কাশ্মীর বিশেষ এলাকা আইন’ পরিবর্তনের হুমকি অন্যতম।

ভারতে প্রায় ১৫ শতাংশ ভোটার মুসলিম আর দলিত ভোটার প্রায় ২০ শতাংশ। যে দল এই দুই শেণীর ভোটারদের সুরক্ষা, স্থিতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দেবে, সে দলই মূলত তাদের ভোট পাওয়ার কথা। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতে জাত প্রথা প্রবলভাবে কার্যকর এবং এতে সচরাচর ব্যতিক্রম হয় না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে ভোটারদের মধ্যে অগ্রসর উচ্চবংশ ৩০ শতাংশ, পিছিয়ে পড়া বংশ-শ্রেণী ৪১ শতাংশ, দলিত শ্রেণী ২০ শতাংশ, সিডিউল (নিু শ্রেণী) ৯ শতাংশ। মোদি নিজেও পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

ভারতে এখনও দলিত, অস্পৃর্শ শ্রেণী ও উপজাতি অধুষ্যিত এলাকাগুলো উন্নয়নের স্পর্শ ভালোভালে পায়নি। সব দলই জনগণের উন্নয়নের কথা বলে ভোট চেয়েছে বা চাচ্ছে। তবে ভোটের ফলাফলে কে কোথায় ছিটকে পড়বে, তা জানা যাবে আর অল্প কিছুদিন পরেই। ভারতে কাশ্মীর ইস্যুকে ঘিরে আবর্তিত হিন্দু-মুসলিম সমস্যা এখনও প্রকট। আগে যেমন শ্রীলংকায় তামিল হিন্দু ও সিংহলী বুদ্ধদের মধ্যে সমস্যা ছিল এবং যেটা দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলংকার উন্নয়নে বড় বাধা বা প্রতিবন্ধক হিসেবে বিরাজ করছিল, তা এখন বৌদ্ধ-খ্রিস্টান বনাম মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

সজ্জন ব্যক্তিমাত্রই চাইবেন না, নির্বাচনে জাতি ও ধর্মগত বিরোধ ট্রাম্পকার্ড হিসেবে বিবেচিত হোক। তবুও নির্মম সত্য এটাই যে, ক্ষমতায় আরোহণের জন্য রাজনীতিকরা সে কার্ডই ব্যবহার করছেন। ভারতে অন্যতম সমস্যা হল বেকারত্ব। বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে এবারই ভারতে বেকারত্ব সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ভারতে বর্তমানে ২৩ মিলিয়ন মানুষ বেকার। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জনই বেকার। ভারতে পুরুষ ভোটারের চেয়ে মহিলা ভোটারদের সমস্যা প্রকট।

ভারতীয় রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মহিলাদের অবদান অনেক। মোট ভোটারের মধ্যে ৪৮ শতাংশ হলেও লোকসভায় নারীর উপস্থিতি মাত্র ১১ শতাংশ। ভারতে বাল্যবিবাহ, জোর করে বিয়ে দেয়া, গণধর্ষণ, মহিলাদের জন্য অপর্যাপ্ত গণপরিবহন এবং চাকরি ক্ষেত্রে মহিলাদের নিরাপত্তা ইত্যাদি অসুবিধা প্রকট। এসব সমস্যার সমাধান কে কতটা দেবেন, তা ভারতীয় ভোটাররাই জানেন। ১৯ মে শেষ ধাপের নির্বাচন এবং ২৩ মে ভোট গণনা হবে। তখনই নির্ধারণ হবে, পরবর্তী ৫ বছরের জন্য কে বা কারা আসছেন ক্ষমতায়।

রাজনীতিতে গণমানুষের রায়ে কেউ হেরে যাওয়ার পর ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সহজ হলে মানুষ সাধারণত তাকে বলে থাকে হেরেও জিতে যাওয়া। এর বিপরীতে দুষ্টবুদ্ধি ও অন্যায়-অবিচারের মাধ্যমে নির্বাচনে জিতে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় জিতেও হেরে যাওয়া। অন্যান্য দেশে নির্বাচনে তথাকথিত জয় পেতে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত যেসব অপকৌশলের আশ্রয় নেয়, অন্তত ভারতে তা টিকবে না- এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম : তুরস্কে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক সামরিক অ্যাটাশে

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×