জুট মিল শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ২১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জুট মিল

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে খুলনা-যশোর এবং অন্যান্য অঞ্চলের জুট মিল শ্রমিকরা বকেয়া মজুরি এবং বর্ধিত মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন। কিন্তু এতদিন শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ-আন্দোলনের পরও আজ পর্যন্ত বিজেএমসি বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।

তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় দেশে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও আন্দোলন বলে কিছু নেই। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে। অথচ এতদিন ধরে শ্রমিকরা তাদের ধর্মঘট ধারাবাহিকভাবে করছেন এবং রাস্তা ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন।

সরকারের ধারণা, কয়েকদিন পর্যন্ত এই আন্দোলন চলে নিজে নিজেই থেমে যাবে। সরকারের নীরবতাই তাদের আন্দোলন ব্যর্থ করবে! তাছাড়া জুট মিলগুলো ধর্মঘট করার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হলে তারা বলতে পারবে সরকারি মালিকানা অকার্যকর।

খুলনা ও যশোর অঞ্চলের সরকারি জুট মিলের শ্রমিকরাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলন করছেন এবং তাদের মধ্যে আন্দোলন বন্ধ করার কোনো পরিস্থিতি এখনও দেখা যাচ্ছে না। তারা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট আহ্বান করে ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সরকার তাদের দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্ণপাত না করার কারণে আরও কঠোর আন্দোলনের কথা বলছেন। খুলনায় নয়টি সরকারি মালিকানাধীন জুট মিলের শ্রমিকরা ঢাকা-খুলনা রাজপথ ও রেলপথ অবরোধের কর্মসূচি পালন করছেন।

প্রতিদিন তারা কয়েক ঘণ্টা করে এভাবে রেলপথ-রাজপথ অবরোধ করে চলেছেন এবং এর ফলে যাত্রীদেরও যথেষ্ট দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এর দায়িত্ব জুট মিল শ্রমিকদের নয়, সম্পূর্ণভাবে সরকারের। কারণ সরকার যদি শ্রমিকদের দাবি-দাওয়াগুলোর ব্যাপারে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা আলাপ-আলোচনা করত, তাহলে এভাবে ধর্মঘটের কোনো প্রয়োজনই হতো না।

খুলনায় ৫ মে থেকে শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ-আন্দোলন শুরু হয়েছে। বিক্ষোভের সময় ১৫ মে তারিখে প্ল্যাটিনাম জুট মিলের শ্রমিকনেতা নূর ইসলাম বলেন যে, জুট মিলগুলো নিয়ে সরকার এক বড় চক্রান্ত করছে। তারা এগুলোকে সরকারি খাত থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত খাতে দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে (Daily Star, 16.05.2019). এর মধ্যে যে সত্যতা আছে তাতে সন্দেহ নেই।

কারণ সরকারি খাতে কারখানাগুলো ক্ষতিকর এটা তারা নিজেরাই নিজেদের কাজকর্মের মাধ্যমে ‘প্রমাণ’ করে শিল্পের ‘উন্নতির’ জন্যই কারখানা সরকারি খাত থেকে ব্যক্তিগত খাতে দেয়ার চক্রান্তে লিপ্ত আছে। এগুলো ব্যক্তিগত খাতে দেয়ার অর্থ সরকারের লোকজন এবং তাদের সমর্থক পুঁজি-মালিকদের কাছে এগুলো হস্তান্তর করা। দেশের চারদিকে লুটপাটের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এ পরিস্থিতিতেই এ ধরনের চিন্তা সরকারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে।

সরকার বলে আসছে যে, জুট মিলগুলো ক্ষতির মুখে আছে। এই ক্ষতির জন্য তারা শ্রমিকদেরকেই দায়ি করে এসেছে বরাবর। অথচ শ্রমিকরা নিয়মিতভাবেই তাদের কাজে হাজিরা দেন এবং নিয়মমাফিক শ্রম দান করেন। মিলগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন বা বিজেএমসির।

সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণে মিলগুলো থাকার কারণে এগুলোতে উৎপাদন থেকে নিয়ে সবকিছুর দায়দায়িত্ব তাদের। ম্যানেজমেন্টের দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণেই মিলগুলো ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। এজন্য তারা কেন্দ্রীয় অফিসে বসে নানা ধরনের কলকাঠি নাড়ছে। মিলগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য যদি ব্যক্তিগত খাতে দেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনার অপদার্থতা। ব্যক্তি মালিকানায় যদি কোনো মিল লাভজনক হয় এবং সরকারি মালিকানায় যদি ক্ষতির সম্মুখীন হয় তাহলে তার দায়িত্ব কি শ্রমিকদের?

ব্যক্তিমালিকানাই হোক বা সরকারি মালিকানায়ই হোক, শ্রমিকরা তো একইভাবে তাদের কাজের জায়গায় শ্রম দিয়ে থাকেন। ম্যানেজমেন্টের বা উৎপাদনের বিভিন্ন দিকের দায়িত্ব শ্রমিকদের নয়, সম্পূর্ণভাবে ম্যানেজমেন্ট ও সরকারের। কাজেই এ ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানাধীন কারখানায় ক্ষতির জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই দায়ী। সরকারের নীতি দায়ী।

১৫ মে এক শ্রমিক সমাবেশে ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিকনেতা সোহরাব হোসেন বলেন যে, ১৮ মে পর্যন্ত তারা দেখবেন। তারপরও সরকার যদি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে এবং নীরব থাকে তাহলে আরও কঠোর আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। অন্য বক্তারাও এই একই কথা বলেন।

তারা আরও বলেন যে, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ বন্ধের জন্য সরকারি দলের লোকজন তাদেরকে হুমকি দিচ্ছে। ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রতিনিধি খুলনা ও যশোর অঞ্চলে অন্তত ১০টি কারখানায় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব রিপোর্ট করেছেন (উধরষু ঝঃধৎ, ১৬.০৫.২০১৯). শ্রমিক নেতারা তাদের কাছে অভিযোগ করেন যে, সিবিএ (কালেকটিভ বারগেইনিং এজেন্ট) নেতারাও সরকারি দলের লোকজনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে যাতে তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।

২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা নতুন পে-স্কেল অনুমোদন করে এবং তা জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়। এর ফলে সব সরকারি কর্মচারী, সেই সঙ্গে বিজেএমসির কর্মচারী-কর্মকর্তারাও নতুন স্কেলে তাদের বেতন পেয়ে আসছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সরকারি জুট মিল শ্রমিকদের মজুরির ক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি।

এক টাকা মজুরিও বৃদ্ধি পায়নি তাদের। যেখানে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সব সরকারি অফিসের কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন, সেখানে শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রমের কারণ কী? এর থেকে কি সরকারের শ্রমিকবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় না? কাজেই এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া শ্রমিকদের সামনে আজ আর কোনো বিকল্প নেই। সারা দেশের ২২টি সরকারি মালিকানাধীন জুট মিলের ৬০,০০০ শ্রমিক এভাবেই নির্দয়ভাবে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কিন্তু শুধু এটাই নয়, এই ৬০,০০০ শ্রমিককে বিগত ৬ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত কোনো মজুরিই দেয়া হচ্ছে না। এই বকেয়া মজুরি পরিশোধ করে তাদেরকে নিয়মিত মজুরি দেয়াও তাদের এক দাবি। যেখানে বিজেএমসির কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন পেয়ে আসছেন, সেখানে শ্রমিকদের মজুরি প্রায়ই বকেয়া রাখা হয়।

বাংলাদেশে উন্নতির জোয়ার বইছে এবং এই জোয়ারে ভাসছে এদেশের ধনিক ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকরা, যাদের অধিকাংশই সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ‘উন্নয়নের’ ছিটেফোঁটাও কারখানা শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যে জুটছে না। উপরন্তু তাদের জীবনে বইছে দুঃখ-দুর্দশার জোয়ার।

এরা মোটেই ভালো নেই। উপরন্তু দেশে উন্নতির জোয়ার যত বইছে এদের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। বাংলাদেশে বড় বড় নানা প্রকল্প চালু হচ্ছে। তার জন্য হাজার হাজার, লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে। এই টাকার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে পড়ছে। সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজনের পকেটে পড়ছে আরও বেশি।

দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য একটানাভাবে বেড়ে চলেছে। কিন্তু মজুরি নিম্নপর্যায়েই বাধা আছে। এর ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ক্রমাগতভাবেই কমছে। অবস্থা ক্রমাগতই খারাপ হচ্ছে। তার ওপর সরকারি কলকারখানার শ্রমিকদেরকে যদি সামান্য নিয়মিত মজুরি না দিয়ে বকেয়া রাখা হয়, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় সেটা বোঝার অসুবিধা নেই।

বাংলাদেশে এখন নব্য ধণিক শ্রেণীর দুর্নীতি ও লোভ-লালসা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনে ভোগ-বিলাসিতার জোয়ার বইছে। শ্রমিকদের এবং সব ধরনের শ্রমজীবী মানুষের পেটে লাথি মেরেই এই জোয়ারের তোড় বাড়ছে। এই সাধারণ পরিস্থিতির মধ্যেই খুলনা-যশোর অঞ্চল থেকে নিয়ে ২২টি সরকারি জুট মিল শ্রমিকরা এখন তাদের বিক্ষোভ-আন্দোলন করছেন। শ্রমিকদের আন্দোলন এবং সরকারের নীরবতার মুখে দেশে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে, যা কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই সম্ভব নয়।

১৯.০৫.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×