যে কারণে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

  অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন

আজ শুরু হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের যুগান্তকারী নির্বাচন। ২৩ থেকে ২৬ মে’র এ ব্যালট যুদ্ধকে মনে করা হচ্ছে এ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা বস্তুত হতে যাচ্ছে ব্রাসেলসভিত্তিক অর্থনৈতিক জোটটির ছয় দশকের সংহতিকরণ প্রকল্পের ওপর একটি গণভোট।

এ নির্বাচনটি কেবল ইউরোপ মহাদেশের ভবিষ্যতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, একইসঙ্গে বাকি বিশ্বের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সামগ্রিক জিডিপির আকারের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবেই থেকে যাচ্ছে, যার জিডিপির আকার যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির আকারের সমান এবং চীনের জিডিপির আকার থেকে বেশি।

এই জোট একইসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রফতানিকারকও। এ কারণে অনেক দেশেরই প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ইইউ। সেসব দেশের মধ্যে আছে এশিয়ার চীন থেকে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের মতো দেশ।

এ বছরের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচন বাড়তি আগ্রহ যোগ করেছে এ কারণে যে, ব্রেক্সিট ছয় মাসের জন্য বিলম্বিত হওয়ায় ব্রিটেনও এ নির্বাচনে অংশ নেবে। ব্রেক্সিট ইস্যু ঘিরে চলমান অচলাবস্থার একমাত্র কারণ হল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো কর্তৃক নির্বাচনটিকে ইউরোপের পক্ষে বা বিপক্ষের প্রতিযোগিতা হিসেবে দাঁড় করানো।

অখণ্ড ইউরোপের বিরোধিতার মাঝে ইউরোপজুড়ে ইউরো নিয়ে সংশয় পোষণকারী দলগুলো (ইউরো-স্কেপটিক) ভালো ফলাফল অর্জনের আশা করছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট চাচ্ছেন লিবারেল ও আন্তর্জাতিকতাবাদী শক্তিগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে, যে আশা স্পেনের নির্বাচনের ফল থেকে জিইয়ে আছে। ওই নির্বাচনে দেখা গেছে ব্রাসেলসপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টির ভাগ্যের পুনরুত্থান ঘটেছে।

যদিও ম্যাঁক্রো ও তার সমগোত্রের অন্যদের চ্যালেঞ্জ হল, নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে এমন সব স্থানে যেখানকার বেশিরভাগ ভোটারই অতৃপ্ত ও উদাসীন। এভাবে চালিত হওয়ার বাস্তবভিত্তিক রসদ জুগিয়েছে যে বিষয়টি তা হল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সাধারণভাবে মহাদেশটির বেশিরভাগ মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

কারণ ব্রাসেলস তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে অনেক বেশি দূরে অবস্থিত। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অনেক কমেছে।

১৯৭৯ সালে যেখানে এ নির্বাচনে ভোট দানের হার ছিল ৬২ শতাংশ, ২০১৪ সালে এসে তা রেকর্ড সর্বনিু ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছু কিছু দেশে তো ভোটদানের হার ডাবল ডিজিটে গেছে একেবারে ভোটের শেষ সময়ে গিয়ে।

ধীরে ধীরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ক্ষমতা বাড়া সত্ত্বেও এই উদাসীনতা ঘটছে। মূলত ১৯৫০-এর দশকে গঠিত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ১৯৭৯ সালে এসে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে সরাসরি নির্বাচিত চেম্বার হওয়ার পর। তারপর থেকে আইনসভাটি প্রায় ১৪০ কোটি ইউরোর উপরে ইইউ’র বার্ষিক বাজেটে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা পেয়েছে এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের (ইসি) তৈরিকৃত বিস্তৃত পর্যায়ের খসড়া আইন আটকে দেয়ার বা সংশোধনের শক্তিও পেয়েছে নিজেদের অনুকূলে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নতুন সদস্যদের আরও তাৎপর্যপূর্ণ সুযোগ থাকবে ইউরোপীয় কমিশনের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বাছাই করার বিষয়টিকে প্রভাবান্বিত করার, যে পদটিকে ব্রাসেলসের মূল অফিসকর্তা হিসেবে দেখা হয়।

এটি হওয়ার কারণ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পার্লামেন্টে মূল গ্রুপগুলো প্রথমবারের মতো এমন একটি চুক্তি করেছে যে, হোসে মানুয়েল বারোসোর উত্তরসূরি নির্বাচনের জন্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বাছাই করার ক্ষেত্রে প্রার্থীকে অবশ্যই বেশিরভাগ আসনের ভোটার গোষ্ঠীর মনোনয়ন পেতে হবে। যেখানে প্রেসিডেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় সরকারগুলোর চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে, সেখানে গত দেড় দশক ধরে প্রেসিডেন্টের পদধারী জাঁ ক্লদ জাঙ্কারের বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রথমবারের মতো আইনসভার দাবি জোরালো হয়েছিল।

ইউরো-সংশয়বাদী (ইউরো-স্কেপটিক) দলগুলোর সুযোগ গ্রহণে মনোযোগ : যদিও পরিস্থিতি সবার জন্যই এক, তারপরও ইউরো-স্কেপটিক- এ বছরের নির্বাচনের রাজনীতিবিরোধী পক্ষটি- সবচেয়ে বেশি মনোযোগ টানতে পারে এবং প্রচারণার এ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে যে, ইইউবিরোধী দলগুলোর পালে তাৎপর্যপূর্ণ হাওয়া লাগছে।

মনে হচ্ছে, তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনের ওপর ভরসা করতে চাচ্ছে, যাতে উগ্র ডানপন্থী থেকে কট্টর বামপন্থী অখণ্ড ইউরোপবিরোধী দলগুলোর বড় ধরনের অর্জন দেখা গেছে। গত পাঁচ বছরজুড়ে এসব দলের উত্থান এরই মধ্যে ব্রাসেলসে অর্থনৈতিক নীতির আওতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জটিল করে ফেলেছে।

কারণ হল, ইউরো-স্কেপটিক দলগুলো সাধারণত মুক্ত বাণিজ্যবিরোধী এবং ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের রয়েছে অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা।

বর্তমান নির্বাচনে অখণ্ড ইউরোপবিরোধী দলগুলো ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে পর্যাপ্তসংখ্যক আসনে জয়ী হতে পারে, যা দিয়ে সম্ভাব্য পার্লামেন্টকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে অচল করে দেয়া যায়। বাগাড়ম্বরের বিপরীতে এমনটিই এখন বাস্তবতা মনে হচ্ছে। ইউরো-স্কেপটিক দলগুলোর এ বছরের নির্বাচনে হাইপ্রোফাইলে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক সহযোগী স্টিভ ব্যানন।

তিনি বার্লিনে উগ্র ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি আয়োজিত একটি জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন। ব্যানন ইতালিতেও সুপরিচিত এবং দেশটির নির্বাচনের পর উগ্র ডানপন্থী দ্য লিগ ও জনতুষ্টিবাদী ফাইভ স্টার দলকে একসুতোয় গেঁথে জোট সরকার গঠনের বাহবার দাবিদার তিনি।

এসব সত্ত্বেও সর্বশেষ জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, পার্লামেন্টে ক্ষমতার ভারসাম্য খুব সম্ভবত এখনও ইউরোপের অখণ্ডতাপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতেই যাবে। তবে যেখানে ইউরোপ মহাদেশজুড়ে ও বাইরের অনেকেই এখনও বিষয়টির পুনঃনিশ্চয়তা দিচ্ছেন, সেখানে ব্রাসেলসের বর্তমান পরিস্থিতির বিপরীতে লাখ লাখ মানুষের মোহমুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ইউরো-স্কেপটিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অনেক কারণই রয়েছে, কেবল ইউরোপের সংহতির কারণে বাড়তে থাকা অসন্তোষ নয়। বড় ইস্যুগুলোর মধ্যে আছে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রাজনৈতিক দল ও পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ, অভিবাসন নিয়ে উৎকণ্ঠা এবং ২০০৮ সালের আগের অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে অসন্তোষ ও তার কারণে নেয়া ব্যয় হ্রাসের নানা পদক্ষেপ।

এ সবকিছু বিবেচনায় নিলে আসন্ন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন এ যাবৎকালের সবচেয়ে ঘটনাবহুল ব্যাপার হতে যাচ্ছে। ইউরো-স্কেপটিক দলগুলো চাচ্ছে ভালো একটি ফল অর্জন করতে। ফলাফল কী হবে তা নির্ভর করছে ভোটার উপস্থিতির ওপর এবং ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে ভোটাররা বড় সংখ্যক সদস্য বের করে আনে কিনা, তার ওপর- যাতে করে উদারপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার মাধ্যমে পার্লামেন্টে ক্ষমতার প্রাধান্য ধরে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড : লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের এলএসই আইডিয়াসের একজন সহযোগী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×